গোল করে খুশিতে ছুটছেন উসমান দেম্বেলে, পেছনে তাঁর সতীর্থরা।
গোল করে খুশিতে ছুটছেন উসমান দেম্বেলে, পেছনে তাঁর সতীর্থরা।

চ্যাম্পিয়নস লিগ

৯ গোলের উৎসবের রাতে বায়ার্নকে হারিয়ে এগিয়ে পিএসজি

পিএসজি ৫ : ৪ বায়ার্ন মিউনিখ

ফুটবল কি আসলেই এমন হয়?

নাকি প্যারিসের পার্ক দে প্রিন্সেসে এই মায়াবী রাতে সবই ছিল এক বিভ্রম! আসলে রক্ত-মাংসের মানুষের কোনো খেলাই ছিল না?

চ্যাম্পিয়নস লিগ সেমিফাইনালের প্রথম লেগে পিএসজি ও বায়ার্ন মিউনিখ যা উপহার দিল, তাকে ফুটবল না বলে শিল্পের কোনো বিশেষ শাখা বলাই হয়তো শ্রেয়। ৯ গোলের এক অবিশ্বাস্য ‘পাগলামি’ দেখল ফুটবল বিশ্ব, যেখানে বায়ার্নকে ৫-৪ ব্যবধানে হারিয়ে আপাতত ফাইনালের পথে একটু এগিয়ে লুইস এনরিকের পিএসজি।

আগামী বুধবার মিউনিখে হবে ফিরতি লেগ।

চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালের ইতিহাসে এক ম্যাচে ৯ গোল আগে কখনোই দেখা যায়নি। এ রাতে যেন একসঙ্গে দুটি ম্যাচ দেখলেন দর্শকেরা। স্কোরলাইন দেখেও তো মনে হবে এটা বুঝি দুই লেগ মিলিয়ে অ্যাগ্রিগেট! বছরের পর বছর ধরে চলা সেই ‘পজেশন ফুটবল’ বা বল দখলে রাখার মন্ত্রকে এক ঝটকায় বিদায় জানিয়ে এদিন যেন প্রতিপক্ষকে গিলে খাওয়ার নেশায় পেয়েছিল দুই দলের ফুটবলারদের। আর তাতে ফুটবলও যেন তার খোলস ছেড়ে নতুন এক রূপে আবির্ভূত হলো।

ম্যাচ শুরুর আগেই গ্যালারিতে পিএসজি সমর্থকেরা এক বিশাল টিফো (ব্যানার) সাজিয়েছিলেন—যেখানে দেখা যাচ্ছিল ফরাসি সেনাবাহিনী পদদলিত করছে জার্মান বাহিনীকে। মাঠের লড়াইটাও শুরু হলো সেই ঝাঁজ নিয়েই।

হ্যারি কেইনের গোল উদযাপন।

বায়ার্ন শুরু থেকেই ছিল ক্ষুধার্ত। ম্যাচের ১৭ মিনিটেই লিডও পেয়ে গেল। লুইস দিয়াজকে বক্সে ফাউল করেন উইলিয়ান পাচো। পেনাল্টি নিতে গিয়ে ভুল করেননি হ্যারি কেইন। সাফোনোভকে ভুল দিকে পাঠিয়ে বল জড়ালেন জালে। চলতি আসরে এটি তাঁর ১৩তম গোল, যা তাঁকে এমবাপ্পের সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসিয়ে দিল।

২৪ মিনিটে সমতায় ফেরে পিএসজি। খিচা কাভারাস্কেইয়া কী এক মুহূর্তই না উপহার দিলেন প্যারিসের দর্শকদের। বায়ার্নের রক্ষণকে তছনছ করে দিয়ে দারুণ এক বাঁকানো শটে গোল করেন জর্জিয়ান এই ফরোয়ার্ড।

কিন্তু রোমাঞ্চের সে তো মাত্র শুরু। ৩১ মিনিটে জোয়াও নেভেসের হেডে পিএসজি এগিয়ে গেল। বেশিক্ষণের জন্য নয় অবশ্য। ৪০ মিনিটেই মাইকেল অলিসে বায়ার্নকে সমতায় ফেরান। চারজন ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে অলিসে যেভাবে বল নিয়ে বেরিয়ে গেলেন, সেই দৃশ্যটাও চোখে লেগে থাকার মতো। প্রথমার্ধের ইনজুরি টাইমে পেনাল্টি থেকে গোল করে পিএসজিকে আবার ৩-২ ব্যবধানে এগিয়ে দেন উসমান দেম্বেলে।

পিএসজির গোল উদযাপন।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে মনে হয়েছিল বায়ার্ন বুঝি খেই হারিয়ে ফেলেছে। ৫৬ মিনিটে কাভারাস্কেইয়া নিজের দ্বিতীয় ও দলের চতুর্থ গোলটি করেন। এর দুই মিনিট পরই আলফনসো ডেভিসের হ্যান্ডবল থেকে পাওয়া সুযোগ কাজে লাগালেন উসমান দেম্বেলে। ৫-২ গোলে এগিয়ে গেল পিএসজি। বায়ার্নকে তখন দেখে মনে হচ্ছিল ক্লান্ত, বিধ্বস্ত। প্যারিসের উত্তাপে বুঝি গলে নাই হয়ে যাবে।

কিন্তু বায়ার্ন তো বায়ার্নই! ৫-২ স্কোরলাইন থেকে মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধানে তারা ৫-৪ করে ফেলে। ৬৫ মিনিটে দায়ো উপামেকানোর হেডে গোল, তারপর ৬৮ মিনিটে হ্যারি কেইনের দুর্দান্ত পাস থেকে লুইস দিয়াজ ব্যবধান কমিয়ে আনলেন এক গোলে। শেষ দিকে স্কোরলাইন ৫-৫ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, কিন্তু ভাগ্য পিএসজির সহায় ছিল।

বায়ার্ন মিউনিখের গোল।

রেফারি যখন শেষ বাঁশি বাজালেন, গ্যালারিতে করতালির বন্যা। পুরো গ্যালারি দাঁড়িয়ে দুই দলকেই অভিবাদন জানাল। ৯ গোলের এই মহাকাব্যে শেষ পর্যন্ত হয়তো জয়ী দল হিসেবে পিএসজির নামটাই লেখা থাকবে, কিন্তু এই ম্যাচে জিতেছে তো আসলে ফুটবল।

এমন এক ম্যাচ, যার গল্প অনেক অনেক দিন রূপকথার মতো শোনানো হবে।