বিশ্বকাপে আর রোনালদোকে দেখব না, ভাবতেই খারাপ লাগছে

বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে বিদায় নিলেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ম্যাচ শেষে এই একটি দৃশ্যই যেন স্তব্ধ করে দিয়েছে ফুটবলপ্রেমীদের। পর্তুগিজ এই মহাতারকার বিদায় মেনে নেওয়া সত্যিই কষ্টের। আমার সবচেয়ে প্রিয় খেলোয়াড় লিওনেল মেসি এবং ছোটবেলার আদর্শ ডিয়েগো ম্যারাডোনা।

এ ছাড়া জিনেদিন জিদান, ডেভিড বেকহ্যাম ও স্টিভেন জেরার্ডদের খেলাও দারুণ পছন্দ করতাম। তবে প্রিয় তারকাদের তালিকায় রোনালদোও অন্যতম। আগের দিন বিদায় নিলেন নেইমার, তারও আগে লুকা মদরিচ আর এবার বিশ্বকাপের মঞ্চ ছাড়লেন সিআর সেভেন। বিশ্বকাপে তাঁদের আর কখনো দেখতে পাব না, এটি ভাবলেই মনটা খারাপ হয়ে যায়।

বাস্তবতা হলো, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো মাঠে থাকলেও আগের সেই চেনা রোনালদোকে আর দেখা যায়নি। বয়স হয়ে গেছে ৪১, সেটা একটা কারণ। নিজে খেলোয়াড় ছিলাম বলে বুঝি, একটা সময় খেলার ধার কমে আসে।

সময়ের কাছে আত্মসমর্পণ করে বিদায় বলতে হয়। রোনালদো এখনো আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়েননি। বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পর আরও দু–এক বছর ক্লাব ও পর্তুগালের জার্সিতে খেলে হয়তা বুটজোড়া তুলে রাখবেন।

কিন্তু এরই মধ্যে যে অনন্য সব কীর্তি গড়ছেন, তা তাঁকে ফুটবল ইতিহাসে জীবন্ত করে রাখবে। ক্লাব আর আন্তর্জাতিক ফুটবলে হাজার গোলের কাছাকাছি পৌঁছেছেন। পর্তুগালের হয়ে ২৩৩ ম্যাচে ১৪৬ গোল। এত এত গোলের মালিক স্পেনের বিপক্ষে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের ক্ষণটায় নিজেকে সামলাতে পারেননি। টিভি পর্দায় বারবার তাঁকে দেখানো হচ্ছিল। বিষণ্ন, বিদায়ের ব্যথায় কাতর এক যোদ্ধা।

চোখের পানিতে রোনালদোর বিদায়

রোনালদো হয়তো আরেকটু যেতে পারতেন এই বিশ্বকাপে। কিন্তু তাঁর দল পর্তুগালের টিমওয়ার্ক মোটেও ভালো ছিল না। ব্যক্তিগতভাবে ভিতিনিয়া বা ব্রুনো ফার্নান্দেজদের মতো সুপারস্টার দলে থাকলেও তাঁরা সামর্থ্য অনুযায়ী একটা দল হয়ে পুরোপুরি খেলতে পারেননি স্পেনের সঙ্গে। আর পর্তুগালের এই ব্যর্থতা ও রোনালদোর বিদায়ের দিনটিতেই উল্লাসে মেতেছে স্পেন।

স্পেন ও পর্তুগালের মধ্যকার এই লড়াইটা অবশ্য বেশ ভালোই জমেছিল। ম্যাচের শুরু থেকে খেলাটি চলছিল সমানে সমানে। তবে ম্যাচের ৫৪ মিনিটে পর্তুগালের লেফটব্যাক নুনো মেন্দেস ইনজুরিতে পড়লে খেলার চিত্র বদলে যায়। স্পেন ঠিক সেই দুর্বল জায়গাটাতেই বাড়তি চাপ তৈরি করে। পুরো ম্যাচে দুই দলই সুযোগ তৈরি করেছে এবং মিসও করেছে। তবে উইথ বল খেলা ও ফাঁকা জায়গার দখল নেওয়ার লড়াই মিলিয়ে ফুটবলটা বেশ উপভোগ্য ছিল।

পর্তুগাল মাঝমাঠে মোটামুটি ভালো খেললেও স্পেন ছিল অনন্য। রদ্রি, পেদ্রি আর দানি ওলমো—এই তিনজন মিলে পুরো মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রেখেছিলেন। তাঁদের রোটেশনাল পাসিং আর পাসের কোয়ালিটি ছিল দেখার মতো। কখনো কখনো তাঁরা ৪-২-৩-১ ফরমেশনে খেলেছেন, যেখানে দানি ওলমো সরাসরি প্রতিপক্ষের রক্ষণে হানা দিচ্ছিলেন আর রদ্রি নিচ থেকে বল বিল্ডআপ করছিলেন।

অবশ্য মাঝমাঠ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও স্পেনের আসল সমস্যা ছিল তাদের ‘নাম্বার নাইন’ পজিশন। চোটের কারণে লেফট উইঙ্গার নিকো উইলিয়ামস না থাকায় কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয়েছে তাদের। তবে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে এসে পাশার দান উল্টে যায়। বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনো মাঠে নামতেই কাজ হয়। ৯০ মিনিট শেষে যোগ করা সময়ের প্রথম মিনিটে (৯১ মিনিটে) মেরিনোর করা গোলটিই ম্যাচের ভাগ্য এবং মূল পার্থক্য গড়ে দেয়।

আক্রমণ আর পাল্টা-আক্রমণের এই ম্যাচে মাঠের পারফরম্যান্সে পর্তুগালের চেয়ে তুলনামূলকভাবে এগিয়ে ছিল স্পেনই। তারা নিজেদের চেনা পাসিং ফুটবলের ধারা ধরে রেখেছিল, পাসিংয়ের হার ও গোলে শটের সংখ্যাতেও এগিয়ে ছিল। দুই দলই রক্ষণ সুরক্ষিত রেখে খেলছিল এবং পর্তুগাল সহজে জায়গা দিচ্ছিল না বলেই স্পেনের গোল পেতে দেরি হয়েছে।

লামিনে ইয়ামাল

তবে স্পেনের আক্রমণভাগে লামিনে ইয়ামালের মতো তরুণ প্রতিভা আছেন, তোরেস ও পেদ্রি ভালো খেলছেন আর রদ্রিগো পুরো মাঠ নিয়ন্ত্রণ করেছেন। দল হিসেবে পর্তুগালের চেয়ে এগিয়ে থাকা এবং মাঠে আধিপত্য ধরে রাখার কল্যাণে যোগ্যতর দল হিসেবেই শেষ পর্যন্ত জয় তুলে বিশ্বকাপের শেষ আটে গেছে স্পেন।

বর্তমান ইউরো চ্যাম্পিয়ন এই স্প্যানিশ দলটি বেশ তরুণ। তারা এখনো পুরোপুরি পরিপক্ব নয়, তবে দল হিসেবে বেশ ভালো। সব দিক বিবেচনায় স্পেনের এই জয়টা প্রাপ্যই ছিল; কারণ, তারা ভালো ফুটবল খেলেছে। তবে স্পেনের এখনো সেরা খেলাটা উপহার দেওয়া বাকি। একজন ভালো ‘নাম্বার নাইন’ পেলে তাদের এই স্কোরিং সমস্যাটা কেটে যাবে।

স্পেনের সামনে সেমিফাইনালের পথটা কিন্তু বেশ কঠিন। শেষ আটের বাধা পার হতে তাদের লড়তে হবে আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র বা বেলজিয়ামের বিপক্ষে। আর সেই বাধা পেরোতে পারলে সেমিফাইনালে তাদের সামনে পড়তে পারে ফ্রান্স বা মরক্কো। বিশেষ করে ফ্রান্সের মুখোমুখি হলে এই স্কোরিং সমস্যা নিয়ে স্পেনকে বেশ ভুগতে হতে পারে।

লেখক: জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক