
বিশ্বকাপ মানে তো শুধু মাঠের লড়াই নয়; এর আশপাশে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য গল্পের কোলাজ। যে গল্পের কোনোটিতে ঐতিহাসিক বিতর্ক আছে, আছে রোমাঞ্চ কিংবা অজানা চমক। বিশ্বকাপের তেমন কিছু গল্প নিয়ে এ আয়োজন—
গল্পটা শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় দুই শ বছর আগে।
১৮২৫ সালের মে মাস। স্কটল্যান্ডের লিথ বন্দর থেকে ছাড়ল ‘এসএস সিমেট্রি’ নামের এক বাষ্পচালিত জাহাজ। ডেকের ওপর দাঁড়িয়ে এক যুবক বুকভরে শ্বাস নিচ্ছিলেন। নাম জেমস ব্রাউন। পেশায় কৃষিশ্রমিক। বুকে একরাশ অনিশ্চয়তা নিয়েও চোখে নতুন এক পৃথিবীর স্বপ্ন, সঙ্গে স্ত্রী মেরি আর কোলে এক দুধের শিশু।
তিন মাসের এক দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর সমুদ্রযাত্রা শেষে জাহাজ বুয়েনস এইরেসের বন্দরে নোঙর ফেলল। ব্রাউন দম্পতি নতুন এক পৃথিবী খুঁজে পাওয়ার আনন্দে স্কটিশ কায়দায় হুইস্কির গ্লাসে চুমুক দিয়ে গাইলেন ‘অল্ড ল্যাং সাইন’।
জেমস ব্রাউন আর্জেন্টিনার মাটিতে হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে একদিন সফল কৃষক হলেন। কিন্তু তাঁর আসল উত্তরাধিকার জমি বা সম্পত্তি নয়—ফুটবল। তাঁর বংশধরদের হাত ধরেই আর্জেন্টিনার নতুন প্রিয় খেলা হয়ে উঠে ফুটবল এবং শুরু হয় এক অন্য অধ্যায়।
আর্জেন্টিনায় ফুটবলের জোয়ার কিন্তু কোনো লাতিন জাদুকরের হাত ধরে আসেনি, এসেছিল আরেক স্কটিশ ভদ্রলোকের হাত ধরে। নাম তাঁর আলেকজান্ডার ওয়াটসন হাটন। ১৮৭০-এর দশকে যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে একটু উষ্ণ আবহাওয়ার খোঁজে তিনি পাড়ি জমিয়েছিলেন আর্জেন্টিনায়। এক দশক পর গড়েন নিজের স্কুল। ছাত্রদের শেখান ফুটবল—তবে ইংল্যান্ডের ‘কিক-অ্যান্ড-রাশ’ নয়, স্কটিশ স্টাইল। ছোট ছোট পাস, দ্রুত সমন্বয়, ছন্দময় আক্রমণ।
এই দর্শন থেকেই জন্ম নেয় ‘অ্যালামনি’ ক্লাব। ১২ বছরের মধ্যে ১০ বার লিগ জেতে দলটি। সেই অপরাজেয় দলের মেরুদণ্ড ছিলেন কৃষক জেমস ব্রাউনের নাতিরা! বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ব্রাউন পরিবারের পাঁচ ভাই (এবং এক খালাতো ভাই) একসঙ্গে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের জার্সি গায়ে খেলেছেন। তাঁদের মধ্যে হোর্হে ব্রাউনকে বলা হতো ‘প্যাট্রিয়ার্ক’ বা আদিপিতা। তাঁর নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা দলের দুর্দান্ত ডিফেন্স। সঙ্গে হুয়ান ডোমিঙ্গো ব্রাউন ও এরনেস্তো ব্রাউন—একেবারে পারিবারিক রক্ষণভাগ!
সময় গড়ায়। আর্জেন্টিনার ফুটবলে স্থানীয় প্রতিভার উত্থান ঘটে। ধীরে ধীরে ‘ব্রাউন’ নামটি হারিয়ে যায় জাতীয় দল থেকে। কিন্তু ইতিহাস কখনো পুরোপুরি হারায় না। ঠিক ১৪১ বছর পর, নাটকীয়ভাবে সেই নাম ফিরে আসে। ১৯৮৬ বিশ্বকাপের আর্জেন্টিনা দলে দেখা গেল এক ব্রাউনকে। হোসে লুইস ব্রাউন।
বংশতালিকায় সরাসরি যোগাযোগ খুঁজে না পাওয়া গেলেও স্কটিশ ফুটবল মিউজিয়ামের এক প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, হোসে লুইস ব্রাউন স্কটল্যান্ড থেকে আর্জেন্টিনায় যাওয়া সেই জেমস ব্রাউনেরই বংশধর।
আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগের এক বিশ্বস্ত সেনা হোসে লুইস ব্রাউন। দেশের হয়ে ৩৬টি ম্যাচ খেলেছেন, কিন্তু নামের পাশে কোনো গোল নেই। গোল করার জন্য তো দলে একজন ‘ঈশ্বর’ আছেনই, যাঁর নাম ডিয়েগো ম্যারাডোনা। কিন্তু ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের ফাইনালে যখন ১ লাখ ১৪ হাজার দর্শকের গর্জনে আজতেকা স্টেডিয়াম কাঁপছে, তখন মঞ্চের আলো কেড়ে নিলেন এই রক্ষণভাগের প্রহরী। জীবনের প্রথম এবং সবচেয়ে মহামূল্যবান গোলটা সেদিন করলেন ব্রাউন, সবচেয়ে বড় মঞ্চে।
ম্যাচের তখন প্রথমার্ধ। আর্জেন্টিনার পক্ষে কর্নার। পশ্চিম জার্মানির গোলরক্ষক হারাল্ড শুমাখার বলের ফ্লাইট বুঝতে বড় ভুল করে বসলেন। বল তাঁর মাথার ওপর দিয়ে ভেসে চলে গেল পরের পোস্টের দিকে। ঠিক সেই মুহূর্তে বাজপাখির মতো শূন্যে ভেসে উঠলেন ২৯ বছর বয়সী হোসে লুইস ব্রাউন। নিখুঁত এক হেডে বল জড়ালেন জার্মানির জালে। ১-০!
মেক্সিকোর সেই আসর ম্যারাডোনার বিশ্বকাপ নামে খ্যাত। ইংল্যান্ড ও বেলজিয়ামের বিপক্ষে তাঁর ‘ঐশ্বরিক’ গোল আজও কিংবদন্তি। আর ২৯ বছর বয়সী ব্রাউনের অবদান ছিল রক্ষণের দৃঢ়তা।
অথচ ব্রাউন মূল দলে ছিলেন না। অধিনায়ক ড্যানিয়েল পাসারেলা অসুস্থ হয়ে পড়লে শেষ মুহূর্তে তাঁকে ডাকা হয়। তাঁকে নিয়ে সমালোচনাও কম ছিল না। ফাইনালে ৩-২ গোলের মহাকাব্যিক জয়ের শেষে ব্রাউন বলেছিলেন, দলের নানা সমস্যার কারণে কোচ বাধ্য হয়ে আমার ওপর ভরসা করেছিলেন। আর্জেন্টিনার খবরের কাগজগুলো আমার বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছিল। সবাই বলেছিল, এই দলে থাকার আমার কোনো যোগ্যতাই নেই। আজকের এই ট্রফিটা আমার জন্য একটা মধুর প্রতিশোধ।
ব্রাউন যখন হাসিমুখে বলছিলেন এটা তাঁর জীবনের সবচেয়ে আনন্দের দিন, তখন কিন্তু তাঁর মুখের পেশিগুলো যন্ত্রণায় কুঁচকে যাচ্ছিল। দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হওয়ার মাত্র চার মিনিটের মাথায় পশ্চিম জার্মানির ফরোয়ার্ড নর্বার্ট এডারের সঙ্গে এক ভয়াবহ ধাক্কা লাগে তাঁর। ব্রাউন নিজেই পরে জানিয়েছেন, ধাক্কা লাগার পরপরই তিনি নিজের ডান কাঁধের হাড়চ্যুত হওয়ার মটমট শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন।
‘তীব্র যন্ত্রণায় আমার শরীর অবশ হয়ে আসছিল। ভীষণ খারাপ লাগছিল। কিন্তু আমি মাঠ ছাড়তে চাইনি। দলের স্বার্থেই একজন ডিফেন্ডার কমে যাওয়ার ঝুঁকি আমি নিতে পারতাম না,’ বলেছিলেন ব্রাউন। কোচ কার্লোস বিলার্দোও পরে স্বীকার করেছিলেন, ‘আমরা তখন এগিয়ে ছিলাম। ওর ওপর আমার অগাধ ভরসা ছিল। ওদিকে টেলিভিশনের সামনে ৩ কোটি আর্জেন্টাইন দর্শক চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে। আমার বেঞ্চে এমন কেউ ছিল না যে এই ব্রাউনকে বদলে মাঠে নামাব।’
মাঠের ডাক্তাররা যখন তাঁকে তুলে নেওয়ার জন্য ব্যাকুল, তখন ব্রাউন নিলেন এক অবিশ্বাস্য সিদ্ধান্ত। তিনি নিজের জার্সির নিচের অংশ দাঁত দিয়ে কামড়ে একটা ফুটো করলেন। তারপর সেই ফুটোর ভেতর নিজের ডান হাতের বুড়ো আঙুলটা গলিয়ে দিলেন, যাতে হাড়চ্যুত হওয়া হাতটা শরীরের সঙ্গে লেপ্টে থাকে এবং ঝুলে না যায়! ভাঙা কাঁধ আর ছেঁড়া জার্সি নিয়ে, যন্ত্রণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাকিটা সময় বুক চিতিয়ে লড়ে গেলেন।
এক শতাব্দী আগে এক স্কটিশ আর্জেন্টিনায় ফুটবল নিয়ে এসেছিলেন। এক শতাব্দী পর আরেক ‘স্কটিশ’ এনে দিলেন বিশ্বকাপ।
ইতিহাস মাঝে মাঝে গোলের মতোই। অপ্রত্যাশিত কিংবা অবধারিত।