ফাইনাল নিশ্চিত করে স্পেনের উদ্‌যাপন
ফাইনাল নিশ্চিত করে স্পেনের উদ্‌যাপন

বিবর্ণ ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন

স্পেন ২–০ ফ্রান্স

টুর্নামেন্টে সেরা আক্রমণভাগ ছিল ফ্রান্সের। সেরা রক্ষণ স্পেনের। ডালাসে গতকাল রাতে সেই রক্ষণের সামনে হঠাৎই বিবর্ণ হয়ে পড়লেন কিলিয়ান এমবাপ্পেরা। উল্টো এই বিশ্বকাপে তাদের সেরা ফুটবল খেলে দুই অর্ধে দুই গোলে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে গেল স্পেন।

প্রথমার্ধে ২২ মিনিটে পেনাল্টি থেকে মিকেল ওইয়ারসাবালের গোলের পর ৫৮ মিনিটে পেদ্রো পোরোর গোলে স্পেনের জয়ের ব্যবধান ২–০। অফসাইডের কারণে ৬৪ মিনিটে লামিনে ইয়ামালের গোল বাতিলও হয়েছে।

নিউ জার্সিতে আগামী রোববার রাতে বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা কিংবা ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে স্পেন। অন্য সেমিফাইনালে আগামীকাল রাতে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা।

ফরাসি ডিফেন্ডার লুকাস দিনিয়ে বক্সে ইয়ামালকে ফাউল করলে পেনাল্টি পায় স্পেন। পোরোর গোলটি দানি ওলমোর সঙ্গে দারুণ বোঝাপড়ার ফসল। এমবাপ্পে–দেম্বেলে–ওলিসেদের তারকাখচিত ফরাসি আক্রমণভাগ আশ্চর্যজনক নিষ্প্রভ ছিল এদিন। প্রথমার্ধে কোনো শট পোস্টেই রাখতে পারেনি ফ্রান্স। দ্বিতীয়ার্ধেও রাখতে পেরেছে মাত্র দুটি।

পেনাল্টি থেকে গোলে মিকেল ওইয়ারসাবালের উদ্‌যাপন

এই ম্যাচের আগপর্যন্ত ফ্রান্স ছিল সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বকাপের সেরা দল। অথচ সেমিফাইনালে হঠাৎই যেন খেলা ভুলে গেল তারা। আর স্পেনের হলো উল্টো, অসাধারণ এক টিম পারফরম্যান্সের পুরস্কার মিলল ফাইনালের টিকিটে।

প্রথমার্ধে ফ্রান্স পিছিয়ে পড়ার পর ইতিহাস বলছিল, ফাইনালের টিকিট শেষ পর্যন্ত স্পেনই পাবে। কারণ, বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ইতিহাসে প্রথমার্ধে পিছিয়ে পড়ে ঘুরে দাঁড়ানোর নজির খুব বেশি নেই। ১৯৯০ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ও ২০১৮ বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়া শুধু এখান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছে।

ফ্রান্সও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু মাঝমাঠ থেকে বরাবরের মতো খেলাটা তৈরি করতে পারেনি। কারণ, বল হারানোর পর স্প্যানিশ মিডফিল্ড ও ডিফেন্স তাদের চেপে ধরে পাসের চ্যানেল বন্ধ করেছে। এই দায়িত্বে দুর্দান্ত ছিলেন রদ্রি। দুই দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ‘ডুয়েল’ (১১) জিতেছেন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সফল পাসও (৫৯) তাঁর। মাঝমাঠে রদ্রির পাশাপাশি পাউ কুবারসিও দুর্দান্ত ছিলেন রক্ষণে।

ফরাসি মাঝমাঠের প্রাণভোমরা মাইকেল ওলিসেকে যেন বোতলবন্দী করে রেখেছিল স্পেন। দলীয় সমন্বয়ে তাঁকে স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে দেয়নি স্পেন। ২০ বার বলের দখল হারান। বাধ্য হয়েই তাঁকে ৭২ মিনিটে তুলে নেন ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ের দেশম।

স্পেনের হয়ে দ্বিতীয় গোলটি করেন পেদ্রো পোরো

ডিফেন্সচেরা পাসের প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গোটা টুর্নামেন্টে দুর্দান্ত খেলা এমবাপ্পেও ছিলেন ছায়া হয়ে। মোট ১১ গোলে অবদান রাখা ফরাসি তারকা গোটা ম্যাচে মাত্র ৩টি শট নিয়ে একটিও পোস্টে রাখতে পারেননি। উল্টো ৮৬ মিনিটে হলুদ কার্ড দেখেন।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে স্পেনকে সবচেয়ে বড় ফেবারিট ভেবেছিলেন বিশ্লেষকরা। ফ্রান্সও ফেবারিট ছিল, টুর্নামেন্টের শুরু থেকে দুর্দান্ত খেলায় ফেবারিটের দৌড়ে বাকিদের ছাপিয়ে দেশমের দল। তবে স্পেন যে ফ্রান্সের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে, সেটার প্রমাণ ছিল সাম্প্রতিক ইতিহাসে।

হারে হতাশ এমবাপ্পে। পেছনে তাঁর সতীর্থরা

সর্বশেষ বিশ্বকাপের ফাইনাল খেলার পর ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকের ফুটবল ইভেন্টে স্পেনের কাছে ৫–৩ গোলে হারে ফ্রান্স। ২০২৪ ইউরো ও ২০২৫ নেশনস লিগের সেমিফাইনালেও হেরেছে স্পেনের কাছেই। এবার হারল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও। সে জন্য স্পেনকে খেলতে হয়েছে এবার বিশ্বকাপে নিজেদের সেরা খেলাটা।

স্প্যানিশ মাঝমাঠ ও রক্ষণ কতটা ভালো খেলেছে, সেটা বুঝিয়ে দিচ্ছে পরিসংখ্যান। ফ্রান্স এই ম্যাচে ৪৮৮টি পাস খেললেও তাদের ৯৩টি পাসই ভুল হয়েছে স্প্যানিশদের অব দ্য বল মুভমেন্টে। ১৮টি ক্রস দিয়ে সফল হতে পেরেছে মাত্র চারবার।

স্প্যানিশ আক্রমণভাগের প্রশংসাও করতে হবে। শুরু থেকেই দুই উইং বেশি ব্যবহার করে আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করে তারা। ফরাসি বক্সের সামনে বল ধরে রেখে চাপও প্রয়োগ করে লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল। সেই চাপ আলগা করে ফ্রান্স দ্রুত পাসে প্রতি আক্রমণে ওঠার চেষ্টা করেছে। কিন্তু বেশির ভাগ সময়ই মাঝমাঠে কিংবা বক্সের সামনে গিয়ে বল হারিয়ে ফেলেছে কড়া মার্কিংয়ের কারণে।

ফাইনালে ওঠার পর ইয়ামালের সঙ্গে পোরোর উদ্‌যাপন

২০১০ বিশ্বকাপে ফাইনালে উঠে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল স্পেন। ফ্রান্সের সামনে সুযোগ ছিল টানা তৃতীয় ফাইনাল খেলার। কিন্তু সেমিফাইনালে হারের পর এখন তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ খেলতে হবে দেশমের দলকে। আগামী শনিবার রাতে এই ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে।