স্পেনকে রুখতে পেরেছিল কেপ ভার্দে, সৌদি আরব কেন উড়ে গেল

বিশ্বকাপে স্পেন বনাম সৌদি আরবের ম্যাচটি ছিল স্পেনের রণকৌশলগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং সৌদি আরবের রক্ষণাত্মক ভুলের এক নিখুঁত উদাহরণ। প্রথম ম্যাচে কেপ ভার্দের সঙ্গে ড্রয়ের পর এই ম্যাচে স্পেনের মানসিকতা ছিল ইতিবাচক এবং তারা শুরু থেকেই সৌদি আরবকে চেপে ধরেছিল।

স্পেনের প্রথম ও প্রধান ট্যাকটিকস ছিল অত্যন্ত দ্রুতগতির ‘ফার্স্ট ব্রেক উইং প্লে’। সৌদি আরবের মতো লো-ব্লক ডিফেন্স ভাঙার জন্য উইং প্লের কোনো বিকল্প নেই। আগের ম্যাচে কেপ ভার্দের সঙ্গে স্পেন মাঝমাঠে বল খেলেছিল ৫২ শতাংশ, কিন্তু এই ম্যাচে খেলেছে ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ, তারা মাঝমাঠে খেলা কমিয়ে বল বেশি উইংয়ে পাঠিয়েছে। পরিসংখ্যানও এর প্রমাণ দেয়। কেপ ভার্দের সঙ্গে উইং প্লে যেখানে ছিল ১৭ ভাগ, এই ম্যাচে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮ ভাগে। স্পেনের সবগুলো গোলই কোনো না কোনোভাবে এই উইং প্লে থেকেই এসেছে।

খেলার গতিপথ নির্ধারণে মাঝমাঠের ভূমিকা ছিল দারুণ। খেলাটা তৈরির পর বল যখনই রদ্রি বা পেদ্রির কাছে এসেছে, তারা দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে তা উইংয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন। অন্য দিনগুলোতে যেখানে স্পেন মিডল প্লে বা মাঝখান দিয়ে খেলার চেষ্টা করত, এই ম্যাচে তারা পুরোপুরি উইং নির্ভর ফুটবল খেলেছে। পাশাপাশি লেফট ব্যাক মার্ক কুকুরেয়া বারবার ওপরে উঠে আক্রমণে দারুণ সহায়তা জুগিয়েছেন।

স্পেনের একাদশে ইয়ামালের সংযোজন ছিল ম্যাচের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। স্প্যানিশ কোচ হয়তো জানতেন যে সৌদি আরব কেপ ভার্দের মতো কমপ্লিট ডিফেন্ডিং করবে। আর এমন রক্ষণ ভাঙতে ওয়ান-টু-ওয়ান পজিশনে বিট করার জন্য ইয়ামালই ছিলেন সেরা বিকল্প। তাঁকে একাদশে নামানোর সিদ্ধান্তটি দারুণ ফল দিয়েছে। ম্যাচে সে দুটি ড্রিবল করেছে, দুটিই সফল ছিল।

দুটি সফল ড্রিবল করেন ইয়ামাল

প্রথম তিন গোল পর্যন্ত স্পেনের যতগুলো আক্রমণ হয়েছে, তার প্রায় সব কটিতেই ইয়ামালের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। ম্যাচে নম্বর নাইন পজিশনে দারুণ কার্যকর মিকেল ওইয়ারসাবাল দুটি গোল করেছেন এবং ইয়ামালের সঙ্গে তার বোঝাপড়া ছিল বেশ ভালো। প্রথম ২৪ মিনিটের মধ্যেই তাঁরা তিন গোল করে কার্যত ম্যাচটা শেষ করে দেন।

প্রথম ম্যাচ ড্র করায় স্পেনের জন্য এই ম্যাচে জয় জরুরি ছিল। এই মরিয়া ভাবটা তাদের খেলায় ফুটে উঠেছে। বল হারানোর সঙ্গে সঙ্গে তারা কাউন্টার প্রেসিংয়ে গেছে। একটি বল কাড়ার জন্য একসঙ্গে ২/৩ জন খেলোয়াড় ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং সৌদি আরবের এক-দুই টাচের মধ্যেই বলের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে।

সৌদি আরব এই ম্যাচে ৫-৪-১ ফরমেশনে খেলে লো-ব্লক ডিফেন্সের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাদের ডিফেন্ডিং আমার কাছে বড্ড আলগা লেগেছে। তাদের মিড ব্লক বা লো ব্লক, কোথাও কোনো অর্গানাইজেশন বা শৃঙ্খলা ছিল না। যখন রক্ষণভাগে ৫ জন থাকে, তখন মূল কাজটা করতে হয় মিড ব্লকের চারজনকে। এই দুটি ব্লক খুব জমাট থাকতে হয়, যা সৌদি আরব করতে পারেনি। মিড ব্লক জমাট না হওয়ায় স্পেন খুব সহজেই মিড ও লো ব্লকের মাঝে বল পেয়ে গেছে।

ব্লকে থাকার সময় বল উইন বা কেড়ে নেওয়া মূল কাজ নয়, জায়গা ধরে রাখা বা ব্লক করাই প্রধান কাজ। কিন্তু সৌদি আরব প্রায়শই বল কেড়ে ওপরে উঠে গেছে। স্পেনের মতো দলের কাছ থেকে এভাবে প্রেস করে বল নেওয়া অনেক ঝুঁকির, যা সৌদি আরবের বিবেচনায় রাখা দরকার ছিল। তাদের ব্লকের লাইনগুলো ভেঙে পড়েছিল, খেলোয়াড়েরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে একেকজন একেক জায়গায় ছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী ব্লকের সময় একজন প্রেসিংয়ে গেলে বাকিদের কভারিংয়ে থাকার কথা, কিন্তু সৌদি আরব তা করতে ব্যর্থ হয়েছে।

সৌদি আরবের জালে চারবার বল পাঠিয়েছে স্পেন

আগের ম্যাচে স্পেন ৭৪ শতাংশ বল পজেশন এবং ২৩টি শট নিয়েও কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোল পায়নি। কেপ ভার্দে স্পেনকে সফলভাবে রিড করতে পেরেছিল। সৌদি আরবও কেপ ভার্দের মতোই কৌশল নেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু কেপ ভার্দের রক্ষণে যে কড়া ডিসিপ্লিন ও অর্গানাইজেশন ছিল, তা সৌদি আরবের মধ্যে একদমই দেখা যায়নি।

ম্যাচের শুরু থেকেই স্পেন খুব দ্রুত আক্রমণ চালিয়ে গেছে এবং গোল তাড়াতাড়ি পেয়ে গেছে। দ্রুত প্রথম গোল খেয়ে যাওয়ায় সৌদি আরব তাদের প্রাথমিক পরিকল্পনা থেকে ছিটকে যায়। তারা রক্ষণভাগ ছেড়ে আরেকটু ওপরে উঠে খেলতে শুরু করে। আর স্পেনের মতো বিপজ্জনক দলের বিপক্ষে ব্যাক লাইনের পেছনে এবং গোলকিপারের মাঝে অতখানি ফাঁকা জায়গা দিলে তারা তো সুযোগ নেবেই। সৌদি আরবের এই ট্যাকটিক্যাল ভুলের পুরো সুবিধা নিয়ে স্পেন আক্রমণ করে গেছে, যার ফলে সৌদি আরবকে চার-চারটি গোল হজম করতে হয়েছে।

লেখক: ফুটবল কোচ ও বিশ্লেষক