রিয়াল মাদ্রিদের অনুশীলনে ফেদে ভালভের্দে ও জুড বেলিংহাম
রিয়াল মাদ্রিদের অনুশীলনে ফেদে ভালভের্দে ও জুড বেলিংহাম

চ্যাম্পিয়নস লিগ

বার্নাব্যুতে ‘অতিপ্রাকৃত’ রিয়ালের সামনে ‘কমপ্লিট’ বায়ার্ন

চ্যাম্পিয়নস লিগ আর রিয়াল মাদ্রিদ—এ যেন এক চিরন্তন প্রেমের উপাখ্যান। যে প্রেম বারবার খাদের কিনারা থেকে ফিরে আসে রাজকীয় বেশে।

চ্যাম্পিয়নস লিগ আর রিয়াল মাদ্রিদ—এই দুটি নাম যখন এক বিন্দুতে মেশে, তখন যাবতীয় যুক্তি-তক্কো আর রেকর্ড বইয়ের পরিসংখ্যান অচল হয়ে যায়। না হলে প্রতিবার দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর রিয়াল মাদ্রিদ কীভাবে এমন অলৌকিক সব গল্প লেখে!

আজ রাতে তাই যখন সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর সবুজ গালিচায় নামবে ভিনসেন্ট কোম্পানির বায়ার্ন মিউনিখ, তখন তাদের সামনে প্রতিপক্ষ শুধু রিয়াল মাদ্রিদ নামে একটা দল নয়, এক অতিপ্রাকৃত শক্তিও। কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম লেগে সেই অতিপ্রাকৃত শক্তিতে বলীয়ান রিয়ালের মুখোমুখি হতে হবে ইউরোপের এই মুহূর্তের সবচেয়ে ‘কমপ্লিট’ দল বায়ার্নকে!

বায়ার্ন এখন সত্যিই যেন অপ্রতিরোধ্য। গত জানুয়ারি থেকে টানা ১৪ ম্যাচ অপরাজিত। শেষ ষোলোতে আতালান্তাকে ১০-২ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়ে আত্মবিশ্বাস আকাশচুম্বী। অন্যদিকে রিয়াল? লা লিগায় মায়োর্কার কাছে হেরে বার্সেলোনার চেয়ে ৭ পয়েন্ট পিছিয়ে পড়ে কোচ আলভারো আরবেলোয়া কাঠগড়ায়। কিন্তু ওই যে যখনই মনে হয় রিয়ালের জাদুর থলি শূন্য হয়ে গেছে, তখনই তারা ম্যানচেস্টার সিটির মতো দলকে ছিটকে দিয়ে জানান দেয়—ইউরোপের মঞ্চে তারাই শেষ কথা!

রিয়ালের মুখোমুখি হওয়ার আগে অনুশীলনে বায়ার্নের খেলোয়াড়রা

বায়ার্নের জন্য সবচেয়ে বড় সুসংবাদ হলো হ্যারি কেইন। গোড়ালির চোটে পড়ে ইংলিশ এই গোলমেশিন দেশের হয়ে জাপানের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ আর ক্লাবের হয়ে ফ্রাইবুর্গের বিপক্ষে লিগ ম্যাচে ছিলেন না। তবে গতকাল বার্নাব্যুতে ১৫ মিনিটের অনুশীলনে কেইনকে দেখে মনে হয়েছে, তিনি ক্ষুধার্ত। চলতি মৌসুমে ৪০ ম্যাচে ৪৮ গোল করা কেইনকে নিয়ে বায়ার্ন মিডফিল্ডার জশুয়া কিমিখের রসিকতা, ‘কেইন প্রয়োজনে হুইলচেয়ারে বসেও এই ম্যাচ খেলবে!’ তবে ভিনসেন্ট কোম্পানি সিদ্ধান্ত নেবেন ম্যাচের আগমুহূর্তে।

কেইন না থাকলেও আক্রমণভাগে মাইকেল ওলিসে ও লুইস দিয়াজ হতে পারেন রিয়ালের বড় দুশ্চিন্তা। ভিনসেন্ট কোম্পানির হাই-প্রেসিং ফুটবলে এই দুজনের থাকে বড় ভূমিকা।

দুশ্চিন্তা অবশ্য বায়ার্নেরও কম নয়। কিলিয়ান এমবাপ্পে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, জুড বেলিংহাম কিংবা সিটির বিপক্ষে ‘হ্যাটট্রিক হিরো’ ফেদেরিকো ভালভার্দে—যে কেউ যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন। বায়ার্নের সম্মানসূচক প্রেসিডেন্ট উলি হোনেস তো বলেই দিলেন, ‘রিয়াল হয়তো এই মুহূর্তে সেরা ফুটবল খেলছে না, কিন্তু অভিজ্ঞতায় ওরা অতুলনীয়।’

চোট কাটিয়ে ফিরেছেন বায়ার্ন তারকা হ্যারি কেইন

বায়ার্নের ভয়টা আরও এক জায়গায়—বার্নাব্যু ফ্যাক্টর। চ্যাম্পিয়নস লিগের রাতগুলোতে মাদ্রিদের এই গ্যালারি যেন উত্তাল সমুদ্র হয়ে ওঠে। বায়ার্ন কিংবদন্তি কার্ল-হেইঞ্জ রুমেনিগে তাই আগেই সতর্ক করে রাখলেন উত্তরসূরিদের, ‘এই স্টেডিয়াম ও সমর্থকেরা দলের সঙ্গে মিলে এক ঝড়ে পরিণত হয়, যা প্রতিপক্ষকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সেই ঝড়ে শান্ত থাকার জন্য ইস্পাতের মতো স্নায়ু দরকার। মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। এটা সাধারণ কোনো ম্যাচ নয়।’

ইতিহাসও বায়ার্নকে খুব একটা স্বস্তি দিচ্ছে না। দুই দলের এটি ২৯তম লড়াই। ২০১২ সালে সর্বশেষ রিয়ালকে চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে বিদায় করেছিল বায়ার্ন। এরপর এক যুগ কেটে গেছে। গত এক দশকে চারবার নকআউট পর্বে দেখা হয়েছে, প্রতিবারই শেষ হাসি হেসেছে রিয়াল। আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বায়ার্নকে হারিয়ে রিয়াল প্রতিবারই শিরোপা জিতেছে। ২০১৮ সালে সভেন উলরিখের সেই হাস্যকর ভুল কিংবা ২০২৪-এ ম্যানুয়েল নয়্যারের হাত ফসকে বের হওয়া বলে হোসেলুর সেই জোড়া গোল—বায়ার্নের জন্য বার্নাব্যু মানেই যেন ট্র্যাজেডির মঞ্চ!

ভিনসেন্ট কোম্পানির বায়ার্ন কি পারবে সেই ইতিহাসের মলাট বদলে নতুন কোনো গল্প লিখতে?

বার্নাব্যু কিন্তু সহজে ইতিহাস বদলাতে দেয় না!