তাঁর ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডলে দুটি পোস্ট পিন করা। প্রথম পোস্টের ক্যাপশনে ‘মিসেস রম’ লেখা দেখেই বোঝা যায়, ছবির নারী তাঁর স্ত্রী। দ্বিতীয় পোস্টে ‘লিওনেল মেসি’! আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির সঙ্গে জার্সিবদলের ছবি পিন করে রেখেছেন। পোস্ট দুটি দেখে একটি বিষয় আন্দাজ করা যায়।
পৃথিবীর ফুটবল-সিন্ধুতে কুরাসাওয়ের অবস্থান বিন্দুসম। সেই দলের গোলকিপার হয়ে এমন দুটি ছবি পিন করে রাখার অনুচ্চারিত ব্যাখ্যাটা হয়তো এমন—‘এই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুই অর্জন।’
এলয় রম এখন চাইলে মেসির সঙ্গে তাঁর ছবিটি ‘আনপিন’ করতে পারেন। কানসাস সিটিতে ইকুয়েডর-কুরাসাও গোলশূন্য ড্র ম্যাচে রমকে পৃথিবী যেভাবে দেখেছে, তাতে তাঁকে ভোলা কঠিন। মেসির সঙ্গে ছবি তাই না থাকলেও চলে। স্ত্রীর সঙ্গে ছবি নামিয়ে ফেলার পরামর্শ না দেওয়াই নিরাপদ। কার ঘাড়ে কয়টা মাথা যে জীবনসঙ্গীর ছবি নামিয়ে ফেলার সাহস করে!
রমের ঘাড়ে মাথা একটাই। তবে ইকুয়েডরের খেলোয়াড়েরা সন্দেহ করতে পারেন, কুরাসাওয়ের এই গোলকিপারের হাত কয়টি! ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’ সিনেমার নিও (চরিত্র) যেমন কুংফু অনুশীলনে প্রায় আলোর গতিতে হাতের মুভমেন্ট করে। রমের সেই সুযোগ নেই। তাঁর দাঁড়ানোর জায়গাটা বাস্তব দুনিয়ায়-কানসাস সিটি স্টেডিয়ামে পোস্টের নিচে। সেখানেই সবাই দেখল, রমের ছোট্ট দুটি হাতে কত বড় ইতিহাস লেখা হলো!
বিশ্বকাপের ইতিহাসে জনসংখ্যা বিচারে কুরাসাও ক্ষুদ্রতম দেশ। ফুটবলীয় আভিজাত্য দূরের কথা, এই তালিকায় তাদের ঠিক ‘নিম্নমধ্যবিত্ত’ও বলা যায় না। সেই দেশের ৩৭ বছর বয়সী গোলকিপার, ক্লাব ফুটবলেও যাঁকে চেনার জন্য নামটা গুগল করতে হয়—সেই এলয় রম কি না একাই ১৫টি সেভ করলেন! এর মধ্যে ছিল ‘পয়েন্ট ব্লাঙ্ক রেঞ্জ’ থেকে সেভও।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো ম্যাচে (অতিরিক্ত সময় বাদে) এটাই সর্বোচ্চ সেভের রেকর্ড। ভুল হলো। কুরাসাওয়ের পোস্টের বাইরে মারা শটগুলোর মধ্যেও একটি সেভ করেছেন রম।
ফিফার রেকর্ড অনুযায়ী, ২০১৪ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় বেলজিয়ামের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের ২-১ গোলে হারের ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্র গোলকিপার টিম হাওয়ার্ড ১৬টি সেভ করেছিলেন। সেই ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়ায়। যদিও ফুটবলের তথ্য–উপাত্ত সংরক্ষণকারী প্ল্যাটফর্ম অপ্টার দাবি, হাওয়ার্ড সেই ম্যাচে ১৫টি সেভ করেছিলেন।
অর্থাৎ ১৯৬৬ সাল থেকে সব তথ্য-উপাত্ত সংরক্ষণ শুরুর পর বিশ্বকাপে নির্ধারিত ৯০ মিনিটের মধ্যে কোনো গোলকিপারের সর্বোচ্চ সেভের রেকর্ড এখন রমের। বিশ্বকাপের মঞ্চে এই তিন কাঠির নিচে কত কিংবদন্তি এলেন-গেলেন, তাঁদের ছাপিয়ে রেকর্ড বইয়ের এই পাতায় এখন এমন একজনের নাম থাকবে, যাঁর দেশের জনসংখ্যা (১ লাখ ৫৮ হাজার) সম্ভবত ঢাকার মিরপুরের চেয়েও কম!
বলতে পারেন, খেলার মাঠে জনসংখ্যায় কী আসে–যায়, কাজটাই তো আসল। তা ঠিক। কিন্তু ফুটবলের মানচিত্র এবার বিশ্বকাপের আগে প্রায় অনুপস্থিত একটি দেশের গোলকিপার, যাঁর সর্বোচ্চ সাফল্য পিএসভির হয়ে ডাচ লিগ জয়, যাঁর কোনো দিন বিশ্বসেরা কোনো গোলকিপিং কোচের সাহচার্যে আসা হয়নি, সেই রম কীভাবে করলেন এ অসাধ্যসাধন!
উত্তর দুটি—রমের নিবেদন ও মনোবল। সেটাও কোত্থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে? এই ম্যাচের আগে বিশ্বকাপে কুরাসাওয়ের অভিষেক হয়েছে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের হারে।
আজ ইকুয়েডরের নেওয়া ২৯টি শটের ১৫টি ছিল পোস্টে। তার সবই রম-দেয়ালে বিফল হওয়ায় অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডও গড়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি। বিশ্বকাপে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ ১৫টি শট পোস্টে রেখেও গোল না পাওয়া প্রথম দল ইকুয়েডর।
ম্যাচের তৃতীয় মিনিট থেকে শেষ পর্যন্ত একের পর এক শট সেভ করেছেন রম। এর মধ্যে ১০টি শট ছিল বক্সের ভেতর থেকে নেওয়া। কখনো কখনো মনে হয়েছে, এ বুঝি ভিডিও গেমের গোলকিপার অথবা হংকংয়ের সেই ‘শাওলিন সকার’ সিনেমার শট-স্টপার!
উদাহরণটি নতুন নয়। স্পেন-কেপ ভার্দে গোল শূন্য ড্র ম্যাচটি মনে আছে?
জনসংখ্যায় বিশ্বকাপ ইতিহাসে দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম দেশটির গোলকিপার ভোজিনিয়া ৭টি সেভ করে দেশকে এনে দেন ঐতিহাসিক প্রথম পয়েন্ট। ম্যাচের পর ভোজিনিয়ার ইনস্টাগ্রাম অনুসারীসংখ্যা (৪৫ হাজার ম্যাচের আগে) এক রাতেই মিলিয়ন পার হয়ে যায়। রমের ইনস্টাগ্রামও হাঁটছে সেই পথে। খেলা শুরুর সময় অনুসারীসংখ্যা ছিল ১ লাখ, খেলা শেষে ৫ লাখ! এখন ৭ লাখ পেরিয়ে যাওয়ার পথে।
রমের মন নিশ্চয়ই এসবে নেই। নেদারল্যান্ডসে জন্ম নেওয়া এই গোলকিপারের ক্লাব ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরু সেখানে। এখন খেলছেন যুক্তরাষ্ট্র ফুটবলে দ্বিতীয় স্তরের ক্লাব মায়ামি এফসিতে। এমএলএসে একবার জিতেছেন ‘সেভ অব দ্য ইয়ার’ ট্রফিও। তবে সেভ করায় ১৫ সংখ্যাটির সঙ্গে রমের সম্ভবত বিশেষ যোগসূত্র আছে। ২০১৯ সালে কনক্যাকাফ গোল্ড কাপে হুন্ডুরাসের বিপক্ষেও ১৫টি সেভের রেকর্ড (ওই প্রতিযোগিতায়) গড়েন।
কিন্তু রেকর্ড-টেকর্ড বাদ দিন। শুধু একবার ভাবুন, বিশ্বকাপ কত অবিশ্বাস্য সব গল্পের জন্ম দেয়!
ম্যাচটি দেখে থাকলে একবার কল্পনা করুন তো, ১৫ বছর আগে স্বায়ত্তশাসন পাওয়া একটি দেশ, বিশ্বকাপে খেলতে পারা যাদের জীবনে সবচেয়ে বড় উৎসবগুলোর একটি, সেই দেশের অধিকাংশ মানুষ টিভিতে আপনার বীরত্ব দেখছে। ইকুয়েডর একের পর এক শট নিচ্ছে, আর রম হাতে, বুকে, কাঁধে কিংবা পায়ে সব ঠেকিয়ে দিচ্ছেন। রম কি শুধুই গোল বাঁচিয়েছেন? তাঁর একেকটি সেভে তো কুরাসাওবাসীর আজন্ম-লালিত স্বপ্নও বেঁচে গেল। কোন সে স্বপ্ন?
বিশ্বকাপ অভিষেকে অন্তত একটি পয়েন্ট। কুরাসাওবাসীর কাছে ওই এক পয়েন্টই তো বিশ্বকাপ জয়ের সমান। সবার আরাধ্যের ট্রফিটি জিতে কেউ কেউ যে সুখ অনুভব করবেন না, কুরাসাওবাসী কিন্তু সেটা অনুভব করবে মর্মে মর্মে।
সেটাই রমের আসল জয়।
মেসির সঙ্গে ছবিটি তাই রম এখন সরিয়ে ফেলতে পারেন। পৃথিবী তাঁকে চিনে নিয়েছে দুটি হাতের বলে, যা মেসির জাদুকরি পায়ের চেয়ে কিছু কম নয়!