ম্যানচেস্টার ডার্বিতে নাটক হবে না, তা হয় নাকি!
ওল্ড ট্রাফোর্ডেও আজ নাটক হলো, বেশ ভালোই হলো। তবে শেষ পর্যন্ত স্বাগতিকদের বিমর্ষ করে দিয়ে ম্যাচটা জিতে নিল অতিথি হয়ে আসা ম্যানচেস্টার সিটি।
অথচ এই ম্যাচের ২৩ মিনিটেই ফিল ফোডেন লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ায় ১০ জনের দল হয়ে গিয়েছিল সিটি। কিন্তু সেই সুযোগটা নিতে পারল না ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড।
আর্লিং হলান্ডের একমাত্র গোলেই সিটি কোচ এনজো মারেসকা পেলেন তাঁর প্রথম ডার্বি জয়ের স্বাদ।
তবে সিটির জয়ের উৎসবের মধ্যেও বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে একটাই প্রশ্ন—ফিল ফোডেন আসলে কী করেছিলেন? ২৩ মিনিটের সেই নাটকীয় মুহূর্তের আসল দোষী কে?
২৩ মিনিটে ঘটনাটা ঘটে। ইউনাইটেড তখন সিটিকে চেপে ধরেছে নিজেদের অর্ধে। লাল জার্সির চাপে দমবন্ধ অবস্থা। বল ক্লিয়ার করার সুযোগ পেয়েও লম্বা পাস না দিয়ে ছোট ছোট পাস খেলছিলেন সিটির খেলোয়াড়েরা।
এ রকম একটা মুহূর্তে নুনেসের বাড়ানো একটি ছোট পাসে সাইডলাইনের কাছে বল পান ফোডেন। ঘাড়ের ওপর তখন নিশ্বাস ফেলছিলেন ইউনাইটেড অধিনায়ক ব্রুনো ফার্নান্দেজ। ব্রুনোর প্রথম ট্যাকেলটি কড়া ছিল, তাতে ফোডেন মাটিতে পড়ে যান। রেফারির বাঁশি বাজল ফাউলের জন্য। তবে আসল নাটকের জন্ম হলো এরপরই।
মাটিতে শুয়ে থাকা ফোডেনের পিঠের দিকে রেফারিদের অলক্ষ্যে বুট দিয়ে একটা গুঁতা মারলেন ব্রুনো। ফোডেনের মেজাজ বিগড়ে দেওয়ার পুরোনো এক মনস্তাত্ত্বিক খেলা।
ফাঁদে পা দিলেন ফোডেন। ক্ষোভে ফুঁসে উঠে পিঠের ওপর ভর দিয়েই ঘুরলেন, তারপর দুই পা তুলে লাথি চালিয়ে দিলেন ব্রুনোর পেটে। ব্রুনোও সুযোগ ছাড়েননি, নাটুকে ভঙ্গিতে লুটিয়ে পড়লেন মাঠে।
গ্যালারিজুড়ে ইউনাইটেড সমর্থকদের গর্জন, আর রেফারি মাইকেল অলিভার দৌড়ে এসে পকেট থেকে বের করলেন সোজা লাল কার্ড।
ফোডেন নির্দোষ দাবি করে হাত নাড়তে লাগলেন বটে; কিন্তু রিপ্লেতে স্পষ্ট দেখা গেল রাগ সামলাতে না পেরে পা চালিয়েছেন তিনি। ভিএআরও কোনো দ্বিধা ছাড়া রেফারির সিদ্ধান্ত বহাল রাখল। অলিভার মাইক্রোফোনে জানালেন, ‘ফিল ফোডেনকে লাল কার্ড—ব্রুনোর গায়ে পা চালিয়ে দেওয়ার জন্য।’ ভিএআর রেফারি ম্যাট ডোনাহুও সায় দিয়ে বললেন, ‘এটি স্পষ্ট লাল কার্ড। ৪৭ নম্বর জার্সির লাল কার্ড নিশ্চিত করা হচ্ছে।’
কিন্তু ঘটনার শুরু যাঁর হাত ধরে, সেই ব্রুনো ফার্নান্দেজ কী করে কোনো শাস্তি ছাড়া পার পেয়ে গেলেন? প্রথম ফাউল তিনিই করেছিলেন, ফোডেন মাটিতে পড়ার পর লাথি বা গুঁতাটাও ছিল তাঁর। অথচ লাল তো দূরের কথা, একটা হলুদ কার্ডও দেখানো হলো না পর্তুগিজ মিডফিল্ডারকে!
ফোডেন রেফারির সঙ্গে তর্ক জুড়লেন; কিন্তু রেফারি তাঁকে সাফ জানিয়ে দিলেন, ‘অধ্যায় এখানেই শেষ, মাঠ ছাড়ো।’ সতীর্থকে আর জটিলতায় না ফেলে হলান্ড নিজেই যেন এগিয়ে এসে আলতো ধাক্কায় ফোডেনকে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দিলেন। শহরের ঘরের ছেলে ফোডেন মাথা নিচু করে টানেলের দিকে হেঁটে গেলেন, পেছনে রেখে গেলেন ওল্ড ট্রাফোর্ডের উল্লাস।
টেলিভিশন ধারাভাষ্যে স্কাই স্পোর্টসের গ্যারি নেভিল মন্তব্য করলেন, ‘ফোডেন মেজাজ হারিয়ে ফেলেছিল। পেটে এভাবে লাথি মেরে পার পাওয়ার সুযোগ নেই।’ রিপ্লে দেখার পর অবশ্য ব্রুনোর পার পেয়ে যাওয়া দেখে তিনি যোগ করেন, ‘ব্রুনো কোনো কার্ড না পাওয়ায় আমি অবাক। আমার মনে হয় ব্রুনোর জন্য এটি হলুদ কার্ড এবং ফোডেনের জন্য লাল কার্ড হওয়া উচিত ছিল।’
তবে ধারাভাষ্য কক্ষে বিতর্ক জমে ওঠে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক অধিনায়ক রয় কিন ও সিটির সাবেক তারকা মাইকা রিচার্ডসের মন্তব্যে। রয় কিন স্পষ্ট ফোডেনের পক্ষে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ব্রুনো ওকে ফাউল করল, তারপর মাটিতে ফেলে আলতো করে বুট দিয়ে লাথিও মারল। ফোডেন প্রতিক্রিয়ায় যা করেছে, তা অবশ্যই লাল কার্ডের মুখোমুখি করেছে। কিন্তু আমার কাছে সহিংস আচরণ যদি কিছু হয়ে থাকে, তবে সেটা ব্রুনোই করেছে। আমি কোনোভাবেই এতে ফোডেনের লাল কার্ড দেখি না।’
রিচার্ডস তুলে ধরলেন ফুটবলের সেই চরম সত্য—যেটা মাঠের অভিনয়। তিনি বললেন, ‘ব্রুনোর লাথি খাওয়ার পর ফোডেন যদি মাঠে পড়ে চিৎকার করত বা গড়াগড়ি দিত, তবে লাল কার্ডটা ব্রুনোই পেত। কিন্তু ফোডেন স্পর্শ করামাত্রই ব্রুনো চিৎকার করে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে লাগল। দৃশ্যটা দেখতে যত মারাত্মক লেগেছে, বাস্তবে হয়তো অতটা ছিল না। তবে আমি কিনের সঙ্গে একমত—শুরুটা ব্রুনোই করেছিল।’