ব্রাজিলের হলুদ-সবুজ জার্সিতে তিনি এত দিন ছিলেন একচ্ছত্র অধিপতি। সাম্বার তালে যখনই বল পায়ে নিতেন, গ্যালারিতে শোনা যেত কানফাটানো চিৎকার। কিন্তু সময় বড় নিষ্ঠুর, সে কাউকেই রেহাই দেয় না। ২০২৬ বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে এসে ব্রাজিলের সেই ‘পোস্টার বয়’ নেইমার জুনিয়রকে এবার মেনে নিতে হচ্ছে এক রূঢ় বাস্তবতা। তিনি বিশ্বকাপে যাচ্ছেন ঠিকই, তবে আর ‘অস্পর্শনীয় নায়ক’ হিসেবে নয়, বরং ড্রেসিংরুমের এক পথপ্রদর্শক হিসেবে।
ব্রাজিলের সংবাদমাধ্যম ও গ্লোবো এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, কোচ কার্লো আনচেলত্তি তাঁর বিশ্বকাপ পরিকল্পনায় নেইমারকে রেখেছেন ঠিকই। তবে তার আগে এই তারকা ফরোয়ার্ডকে জানিয়ে দিয়েছেন কিছু কঠিন শর্ত। গত বৃহস্পতিবার এক ভিডিও কলের মাধ্যমে নেইমারের সঙ্গে সরাসরি কথা বলেন আনচেলত্তি। সঙ্গে ছিলেন সেলেসাওদের টেকনিক্যাল ডিরেক্টর রদ্রিগো কায়েতানো। সেই বৈঠকেই নেইমারকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, দলে তাঁর সেই পুরোনো একাধিপত্যের দিন এখন অতীত।
ভিডিও কলে আনচেলত্তি নেইমারকে জানিয়ে দিয়েছেন, বিশ্বকাপের মূল একাদশে তাঁর জায়গা নিশ্চিত নয়। এমনকি তাঁর হাতে থাকছে না অধিনায়কের আর্মব্যান্ডও। কোচের মাথায় ইতিমধ্যেই একটি সেরা একাদশ ঘুরছে, যেখানে আপাতত জায়গা নেই ৩৪ বছর বয়সী এই সান্তোস তারকার।
শুধু তা-ই নয়, নেইমারের জন্য তৈরি হয়েছে একটি কঠোর আচরণবিধিও। টুর্নামেন্টে শতভাগ মনোযোগ ধরে রাখার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত সক্রিয়তা কমানোর সুনির্দিষ্ট পরামর্শ দেওয়া হয়েছে তাঁকে। মাঠের বাইরের অতি-চটকদার জীবন ভুলে নেইমারকে এখন মন দিতে হবে কেবলই ফুটবলে।
ব্যক্তিগত আলোচনায় আনচেলত্তি যতটা কঠোর ছিলেন, জনসমক্ষে অবশ্য ততটাই আগলে রেখেছেন তাঁর এই অভিজ্ঞ খেলোয়াড়কে। ইতালিয়ান এই কোচের বিশ্বাস, মাঠের চেয়েও ড্রেসিংরুমে তরুণের ছড়াছড়ি থাকা এই দলে নেইমারের অভিজ্ঞতা এক বিশাল সম্পদ হতে পারে।
নেইমারকে দলে নেওয়ার যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে আনচেলত্তি বলেন, ‘ওর ফিটনেস আগের চেয়ে অনেক উন্নত হয়েছে। এই বিশ্বকাপে ও আমাদের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একজন খেলোয়াড় হতে যাচ্ছে। এই ধরনের বড় টুর্নামেন্টে খেলার অভিজ্ঞতা ওর আছে। দলের সবাই ওকে ভালোবাসে। ও স্কোয়াডের পরিবেশটা আরও প্রাণবন্ত করে তুলতে পারবে।’
দলকে সাহায্য করার জন্য নেইমারকে যেকোনো ভূমিকায় দেখা যেতে পারে উল্লেখ করে ইতালিয়ান এই মাস্টারমাইন্ড আরও বলেন, ‘আমরা নেইমারকে এই কারণে দলে রাখিনি যে ও একজন ভালো বিকল্প খেলোয়াড় হবে। আমরা ওকে বেছে নিয়েছি কারণ আমরা বিশ্বাস করি ও দলকে সাহায্য করতে পারবে। সেটা ১ মিনিটের জন্য হোক, ৫ মিনিটের জন্য হোক, ৯০ মিনিটের জন্যই হোক কিংবা কেবল একটা পেনাল্টি নেওয়ার জন্যই হোক না কেন।’
কোচের কাছ থেকে এমন অপ্রত্যাশিত কিন্তু বাস্তবমুখী ফোন পেয়ে নেইমার অবশ্য কোনো অহম দেখাননি। বরং উল্টো এক গাল হাসি ফুটিয়ে স্বাগত জানিয়েছেন কোচের সিদ্ধান্তকে। দলের স্বার্থে যেকোনো ভূমিকায় অবদান রাখতে তিনি প্রস্তুত—এমন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। নেইমারের এই ইতিবাচক মনোভাবই মূলত আনচেলত্তির সবুজ সংকেত এনে দেয়। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে ব্রাজিলের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এর আগে নেইমারকে কখনো দলে ডাকেননি এই ইতালিয়ান কোচ।
বিশ্বকাপের চূড়ান্ত ২৬ জনের দলে জায়গা পাওয়ার পর নেইমার কোচিং স্টাফদের ধন্যবাদ ও উদযাপনের একটি বার্তা পাঠান। যেখানে ছিল সবুজ আর হলুদ রঙের হৃদয়ের (হার্ট) ইমোজি। অহংকার ঝেড়ে ফেলে এই রূপান্তরই হয়তো নেইমারের পরিণত রূপের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন।