আজতেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানে গাইছেন শাকিরা
আজতেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানে গাইছেন শাকিরা

শাকিরার সুরে পর্দা উঠল বিশ্বকাপের

স্টেডিয়ামের মাঝে বেশ বড় সোনালি ট্রফি। চারপাশে সোনালি পোশাকের পারফরমার। আজতেক সভ্যতার সোনালি সময় ফুটেছে তাঁদের পোশাক ও নাচের ঢঙে। লিলা ডাউনস দাঁড়িয়ে তাঁর মাঝে। সুরেলা কণ্ঠে মেক্সিকান সংগীতশিল্পী স্বাগত জানালেন বিশ্বকে, ‘বিশ্ববাসী, মেক্সিকোয় স্বাগত!’

ব্যস, ঢাকে কাঠি পড়ল ২০২৬ বিশ্বকাপের। রঙিন রঙের আবির ছড়িয়ে পড়ল আজতেকা স্টেডিয়ামের চারপাশে। ওটা ফুটবলের ‘ক্যাথেড্রাল’—তিনটি বিশ্বকাপের উদ্ধোধন হওয়া ইতিহাসের প্রথম এবং একমাত্র স্টেডিয়াম। গতকাল রাতে সেই আজতেকাতেই বিশ্বকাপের ‘প্রথম’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশ্ববাসীকে স্বাগত জানাল মেক্সিকো।

প্রথম বলার কারণ, সহ–আয়োজক দুই দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাতেও উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে। তবে আজতেকার ইতিহাস এবং ঐতিহ্য বিচারে বিশ্বকাপের আসল উদ্ধোধন হয়ে গেল আসলে সেখানেই। মেক্সিকোর কিংবদন্তি রক ব্যান্ড ‘মানা’ মঞ্চে ‘ওই মি আমোর’ (হে, আমার ভালোবাসা) গানের সুর তুলতেই গ্যালারিতে জন্ম হলো ‘মেক্সিকান ওয়েভ’। হাত ছড়িয়ে দর্শকদের তোলা সেই ঢেউ ছুঁয়েছে পর্দার দর্শকের হৃদয়ও।

আজতেক সভ্যতার সংস্কৃতি তুলে ধরা হয় উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানে। বিশ্বকাপের বিশাল এক ট্রফিও ছিল মাঠে

ভেনেজুয়েলার গায়ক ড্যানি ওশান পারফর্ম করার পর মেক্সিকান মিউজিক্যাল গ্রুপ লস অ্যাঞ্জেলস আজুলসের সঙ্গে ফোক ব্যালে পারফরম্যান্স ছিল নজরকাড়া। এরপর এলেন কলম্বিয়ান গায়ক জে বলভিন। কিন্তু মজাটা যেন তখনো সেভাবে ঠিক জমছিল না। কারণ, বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের ‘রানি’ তখনো মঞ্চে আসেননি।

শাকিরা! হলুদ, বেগুনি ও সাদা পোশাকে যখন মঞ্চে উঠলেন, তখন যেন শুরু হলো বিশ্বকাপের আসল ঢেউ। সানগ্লাস চোখে পারফরমারদের নিয়ে ‘দাই দাই’ গানের সুর ধরেন শাকিরা। নাইজেরিয়ান গায়ক বার্না বয়ও ভালো সঙ্গ দেন কলম্বিয়ান কিংবদন্তিকে। কিন্তু সব চোখ আসলে কলম্বিয়ান কিংবদন্তির ওপরই ছিল। শাকিরা ছাড়া বিশ্বকাপ আবার জমে নাকি! ২০১০ বিশ্বকাপে ‘ওয়াকা ওয়াকা’ গান দিয়েই তো চিরস্মরণীয় হয়ে গেছেন।

পাখির চোখে ওপর থেকে বিশ্বকাপের উদ্ধোধনী অনুষ্ঠান। আজতেকা স্টেডিয়ামে

জমে না বলেই শাকিরার কণ্ঠে সুর খেলা করতে দর্শক উন্মাতাল হয়েছে সবচেয়ে বেশি। আজতেকার বাইরেও তখন বেশ চড়া হয়েছে উৎসবের সুর। নাচে-গানে মেতেছিলেন ফুটবলপ্রেমীরা, তার মধ্যে বেশির ভাগই মেক্সিকান। উদ্বোধনী এই অনুষ্ঠানের পরই যেহেতু তাঁদের ম্যাচ দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে—তাই স্বাগতিক হিসেবে যেন পুরো প্রস্তুতি নেওয়া ছিল। যেখানে চোখ যায় সেখানেই মেক্সিকান সমর্থক, ফুটবলপাগল মেক্সিকানদের ভিড়ে ‘বাফানা বাফানা’ সমর্থকদের খুঁজে পাওয়াই দায়!

বর্ণিল পোশাকে পারফর্ম করেন পারফরমাররা

অলিম্পিক অনুষ্ঠানের মতো বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া সবগুলো দেশের পতাকা নিয়ে প্রতিনিধিরা ছিলেন মাঠে। প্রতিটি দেশের নামও ঘোষণা করেন স্পিকারের ঘোষক। ৪৮টি দেশ নিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপের ‘প্রথম’ উদ্বোধনী এই অনুষ্ঠানে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো ট্রফিটি তুলে ধরার সঙ্গে গর্জনে ফেটে পড়ে ৮০ হাজার আসনের গ্যালারি।

বিশ্বকাপের উৎসব যে ততক্ষণে জমে গেছে, সেটা বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন এক ফুটবলপ্রেমী, ‘পার্টি এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। অসাধারণ লাগছে।’ স্টেডিয়ামে যখন এমন উৎসবের সুর, তখন মেক্সিকো সিটিতে বিশ্বকাপের ফ্যান জোনে ঢুকতে রীতিমতো লড়াই করতে হয়েছে ফুটবলপ্রেমীদের। ধাক্কাধাক্কিতে ধৈর্য হারিয়ে কেউ কেউ বোতলও ছুড়ে মারেন। নিরাপত্তারক্ষীদের সঙ্গে লেগে যায় দর্শকদেরও।

গান ও সুরের মূর্চ্ছনায় মেতেছিলেন দর্শক

ব্যবস্থাপনা নিয়ে এক দর্শকের অভিযোগ, ‘অবিশ্বাস্য উন্মাদনা। ব্যবস্থাপনা আরও ভালো হতে পারত।’ তবে ফ্যান জোন আগেই দর্শকে টইটম্বুর হয়ে পড়ায় স্থানীয় প্রশাসন আগেই দর্শকদের অন্য কোথাও যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল। কিন্তু সব জায়গাতেই প্রচুর ভিড় জমেছিল দর্শকের।

আজতেকাকেও সাজানো হয়েছিল নতুন করে। লাল রঙে স্টেডিয়ামের চারপাশটা রাঙানো হয়। বিভিন্ন রঙের আবির ও আলোকসজ্জা, বাদ্যি-বাজনায় ভরপুর হয়ে উঠেছিল উদ্বোধনের উৎসব। মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা দল মাঠে ঢোকার পরও গ্যালারিতে বসে গান শুনেছেন দর্শক।

বিশ্বকাপের উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানের একটি মুহূর্ত। আজতেকা স্টেডিয়ামে

খেলা শুরুর মিনিট বিশেক আগে গ্যালারিতে ‘মেক্সিকান ওয়েভ’–এর ঢেউ ফিরিয়ে আনেন তাঁরা। ’৮৬ বিশ্বকাপে এই আজতেকা স্টেডিয়ামেই জন্ম হয়েছিল দর্শকদের এমন উদ্‌যাপনের। তার ১৬ বছর আগে ’৭০ বিশ্বকাপও আয়োজিত হয়েছিল আজতেকায়।