তাঁর ইনস্টাগ্রামেই পুরোনো একটা ভিডিও আছে। যেখানে দেখা যায়, কলম্বিয়ার কোনো এক নাম না জানা জায়গায় তুমুল বৃষ্টি ঝরছে। সেই বৃষ্টির মধ্যেই দাঁড়িয়ে হামেস রদ্রিগেজ। প্রায় ২০ গজ দূর থেকে পরপর তিনটি ফ্রি-কিক নিলেন।
তিনটি শটই চোখের পলকে জালে! একেবারে পোস্টের ওপরের কোনা দিয়ে। ওই ভিডিওটারই পরের অংশ—রদ্রিগেজ একটু বাঁ দিকে সরে এসে ডি-বক্সের বাইরে থেকে আলতো করে আরও একটি শট নিলেন। আবারও গোল! সবকিছু যেন কত সহজ!
রদ্রিগেজের ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডলে ঢুঁ মারলে এখন এমন অসংখ্য ফ্রি-কিকের ভিডিও পাওয়া যাবে। পাওয়া যাবে তাঁর জিমে ঘামঝরানো বা দৌড়ানোর ছবি।
২০১৪ বিশ্বকাপের ‘গোল্ডেন বুট’ জয়ী এবং একসময়ের বিশ্ব ফুটবলের এই ‘গোল্ডেন বয়’-এর বয়স এখন ৩৪। ৩০-এর ওপারের বয়স সাধারণত ফুটবলারদের (আসলে সব খেলোয়াড়দেরই) অনেক বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়।
রদ্রিগেজের ক্ষেত্রে এই কঠিন বাস্তবতা হলো, মাস দেড়েক ধরে তিনি বেকার! কোনো ক্লাবে খেলছেন না। মেক্সিকান ক্লাব ‘ক্লাব লিওঁ’-র সঙ্গে তাঁর চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ডিসেম্বরে। কলম্বিয়া জাতীয় দলে তিনি এখনো অধিনায়ক। কিন্তু সেই অধিনায়ক বিশ্বকাপের পাঁচ মাস আগে কোনো ক্লাবে খেলছেন না, এটা তাঁর জন্য কিংবা তাঁর দেশের জন্য মোটেও ভালো কিছু নয়।
তাহলে কি মনে করতে হবে জাতীয় দলে রদ্রিগেজের জায়গা নড়বড়ে হয়ে গেছে? এই প্রশ্নের উত্তরেও ‘হ্যাঁ’ বলার সুযোগ নেই। নিজের দেশে তিনি এখনো মহাতারকা এবং কলম্বিয়ার সবচেয়ে সম্মানিত অধিনায়ক। বাণিজ্যিক দিক থেকেও তাঁর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী।
কলম্বিয়া জাতীয় দলের অন্যতম বড় স্পনসর ‘সার্ভেসা আগিলা’র বিশ্বকাপ প্রচারণার প্রধান মুখ রদ্রিগেজ। সঙ্গে আছেন কলম্বিয়ার কিংবদন্তি কার্লোস ভালদেরামাও। একটি বিজ্ঞাপনে দেখা যায়, জাতীয় দলের জার্সি গায়ে রদ্রিগেজ বলছেন, ‘এটা আমার কাছে শুধুই একটা জার্সি নয়, পুরো দেশের প্রতীক।’ ওই বিজ্ঞাপনেই দেখা যায়, একটা বারে বিয়ারের অর্ডার দিয়ে ভালদেরামা বলছেন, ‘আমি লটারিতে কলম্বিয়ার ১০ নম্বর জার্সিটি জিততে চাই। কিন্তু বারটেন্ডার তাঁকে মনে করিয়ে দেন, দুঃখিত স্যার, ১০ নম্বরটা শুধু হামেসের!’ মুচকি হেসে ভালদেরামার উত্তর, ‘ঠিক আছে, আমাদের অধিনায়ককেই ১০ নম্বরটা পরতে দাও।’
তার মানে, ক্লাব ক্যারিয়ারে অনিশ্চয়তা থাকলেও রদ্রিগেজ জাতীয় দলে এখনো অগাধ আস্থার নাম। বিশ্বকাপের আগে মনে হয় না এই আস্থা হারিয়ে যাবে।
বিশ্বকাপের সময়টাতেই তো মায়ামিতে সেই কোপা আমেরিকার ফাইনালের দুই বছর পূর্তি হবে। আর্জেন্টিনার কাছে ১-০ গোলে হারলেও সেই টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হয়েছিলেন হামেস। টুর্নামেন্টে সবচেয়ে বেশি গোলে সহযোগিতা ছিল তাঁর। বুঝিয়ে দিয়েছিলেন কোচ নেস্তর লরেঞ্জো কেন তাঁর ওপর এত ভরসা করেন।
ক্লাব ফুটবলে তাঁকে বেশ কিছুদিন ধরেই চেনা রূপে দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু জাতীয় দলের জার্সিতে তাঁর নিবেদন একেবারেই প্রশ্নাতীত। এই কারণেই হয়তো ক্যারিয়ারের তৃতীয় বিশ্বকাপ মিস করার কোনো শঙ্কাই নেই তাঁর।
তবে এটাও সত্য, কলম্বিয়ার কোচ লরেঞ্জো এবং দেশটির ফুটবলপ্রেমীরা রদ্রিগেজকে কোনো ক্লাবের জার্সিতে প্রতি সপ্তাহেই দেখতে চান, বিশেষ করে বিশ্বকাপের আগে। তবে সেটা যদি না–ও হয়, ১৭ জুন উজবেকিস্তানের বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে তিনিই কলম্বিয়ার অধিনায়ক থাকবেন—এমন সম্ভাবনাই এখন পর্যন্ত প্রবল।
তা–ই যদি হয়, বড় তারকাদের ক্লাবহীন অবস্থায় বিশ্বকাপে নামার ঘটনাও এটাই প্রথম হবে না। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো যখন ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে খেলতে যান, তখন তিনি কোনো ক্লাবে ছিলেন না। ৩৬ বছর বয়সে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সঙ্গে তিক্ততা নিয়ে বিদায়ের পর ‘ফ্রি এজেন্ট’ হিসেবে বিশ্বকাপ খেলেন। আবার ২০০৬ বিশ্বকাপের আগেই অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন ফরাসি কিংবদন্তি জিনেদিন জিদান। কোচের অনুরোধে সেই অবসর ভেঙে ফিরে ৩৪ বছর বয়সে জিদান দলকে ফাইনালে তোলেন, নির্বাচিত হন টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ও। ফাইনালে ইতালির মার্কো মাতেরাজ্জিকে ঢুঁ মেরে লাল কার্ড দেখায় শেষটা রাঙাতে পারেননি।
যদিও জিদান বা রোনালদোর সঙ্গে রদ্রিগেজের পরিস্থিতি ঠিক মেলে না। জুন মাসের আগে নতুন কোনো ক্লাব খুঁজে না পেলে টানা সাত মাসে কোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ না খেলেই বিশ্বকাপে নামবেন রদ্রিগেজ, এমন কিছু ফুটবল ইতিহাস আগে কখনো দেখেনি।
কলম্বিয়ানদের বিশ্বাস, জাতীয় দলে রদ্রিগেজ মানেই জাদুকরি কিছু। রদ্রিগেজও ইতিমধ্যে জানিয়েছেন, ২০২৬ বিশ্বকাপের পরই জাতীয় দলকে বিদায় বলবেন। আর শেষটায় বড় ছাপ রাখার জন্য তাঁর মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নিজেকে ফিট রাখা। এখন নতুন কোনো ক্লাবে যোগ দিলেও সেই ক্লাবের সাফল্যের চেয়ে বিশ্বকাপের প্রস্তুতিই তাঁর কাছে অগ্রাধিকার পাবে।
এর মধ্যেও অবশ্য তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে গুঞ্জন থেমে নেই। মেজর লিগ সকারের কলম্বাস ক্রু বা টরন্টোর মতো ক্লাবের নাম শোনা গেলেও পরে সেগুলো স্রেফ গুঞ্জনই রয়ে গেছে। কলম্বিয়ার ক্লাব মিলোনারিওস তাঁকে দলে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু বাজেটের সীমাবদ্ধতায় তারাও পিছিয়ে গেছে।
এই তো কদিন আগেই রদ্রিগেজ নিজের ইনস্টাগ্রামে একটি ফ্রি-কিক টিউটোরিয়াল পোস্ট করেছেন। সেখানে তার বাঁ পায়ের ধার দেখে বোঝার উপায় নেই যে তিনি মাঠের বাইরে আছেন। ক্যাপশনে লিখেছেন, ‘কোনো কিছুই কাকতালীয় নয়’, সঙ্গে দুটি ইমোজি দিয়েছেন পাশাপাশি—১০ নম্বর জার্সি, কামিং সুন!
তার মানে কি রদ্রিগেজ বড় কোনো চমক দিতে যাচ্ছেন? উত্তরটা হয়তো বিশ্বকাপেই পাওয়া যাবে।