কনদোরের ডানা ভাঙার গল্প এবং ‘প্লেবয়’-এর সেই মডেল

বিশ্বকাপ মানে তো শুধু মাঠের লড়াই নয়; এর আশপাশে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য গল্পের কোলাজ। যে গল্পের কোনোটিতে ঐতিহাসিক বিতর্ক আছে, আছে রোমাঞ্চ কিংবা অজানা চমক। বিশ্বকাপের তেমন কিছু গল্প নিয়ে এ আয়োজন—

১৯৮৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর রিও ডি জেনিরোর মারাকানা স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল ও চিলি। ১৯৯০ ইতালি বিশ্বকাপের টিকিট কার পকেটে যাবে, তা নির্ধারণের ম্যাচ। ম্যাচের ৬৭ মিনিটে যখন ব্রাজিল ১-০ গোলে এগিয়ে, তখন হঠাৎ গ্যালারি থেকে একটা ফ্লেয়ার (আতশবাজি) এসে পড়ে চিলির গোলরক্ষক রবের্তো ‘কনদোর’ রোহাসের পাশে। চিলির জাতীয় পাখি কনদোরের মতো বাতাসে ভেসে চমৎকার সব সেভ করতেন বলে সেটাই তাঁর ডাকনাম হয়ে গিয়েছিল।

ফ্লেয়ারটি ছুড়েছিলেন রোজেনেরি মেলো নাসিমেন্তো নামের ২৪ বছর বয়সী এক ব্রাজিলিয়ান তরুণী। চিলির চিকিৎসকেরা মাঠে এসে রোহাসকে স্ট্রেচারে করে নিয়ে যান, তাঁর মুখ ও জার্সি রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। ‘আক্রমণের’ প্রতিবাদে চিলি দল মাঠ ছেড়ে চলে যায় এবং ম্যাচটি স্থগিত করেন আর্জেন্টাইন রেফারি হুয়ান কার্লোস লুস্তাও। চিলির কর্তারা দাবি করলেন, ব্রাজিলকে শাস্তি দিয়ে চিলিকে বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ দেওয়া হোক।

কিন্তু ফিফার তদন্তে বেরিয়ে এল এক হাড়হিম করা সত্য। ভিডিওতে দেখা গেল, ফ্লেয়ারটি রোহাসের মাথায় নয়, বরং অন্তত এক মিটার দূরে পড়েছিল। চিলি আসলে ম্যাচ জেতার জন্যই এই নোংরা নাটকের আশ্রয় নিয়েছিল। রোহাসের ক্ষতটি আসল হলেও, সেটি ফ্লেয়ারের আঘাত ছিল না। তিনি নিজের গ্লাভসের ভেতর লুকিয়ে রাখা একটি ছোট ব্লেড দিয়ে নিজের ভ্রু নিজেই কেটে ফেলেছিলেন!

গ্যালারি থেকে একটা ফ্লেয়ার এসে পড়ে চিলির গোলরক্ষক রবের্তো ‘কনদোর’ রোহাসের পাশে।

পরে এক সাক্ষাৎকারে রোহাস স্বীকার করেন, ‘ম্যাচের দুই দিন আগেই বুদ্ধিটা মাথায় আসে। আমি অধিনায়ক ফার্নান্দোকে জিজ্ঞেস করেছিলাম সে কিছু করতে রাজি কি না। ও রাজি হয়। ফ্লেয়ারটা পড়তে দেখেই গ্লাভসের ব্লেডটা দিয়ে নিজেকে কেটে ফেলি।’

রোহাস আরও বলেছিলেন, ‘ফার্নান্দো আর আমিই শুধু জানতাম আসলে কী ঘটেছিল। আমরা ভেবেছিলাম পরিকল্পনাটা কাজে লেগে গেছে। জেতার জন্য দেশের এত চাপ ছিল যে তখন মনেই হয়নি কোনো অন্যায় করছি।’

ফল হলো উল্টো। চিলিকে ম্যাচটিতে পরাজিত ঘোষণা করা হয়, ১৯৯০ বিশ্বকাপ থেকে তো বটেই, ১৯৯৪ বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব থেকেও তাদের নিষিদ্ধ করা হয়। রোহাসকে আজীবন এবং কোচ ও ডাক্তারকে পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে ফিফা। ২০০৯ সালে ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য টাইমস ফুটবলের ইতিহাসের ‘সেরা অভিনেতাদের’ যে তালিকা করেছিল, তাতে রোহাস প্রথম স্থান পান। অবশ্য ১২ বছর পর রোহাসের আজীবন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় ফিফা, কিন্তু ততক্ষণে ৪৩ বছর বয়সী কনদোর রোহাসের ক্যারিয়ার শেষ।

১২ বছর নিষেধাজ্ঞার পর ৪৩ বছর বয়সে শেষবারের মতো মাঠে নেমেছিলেন রোহাস।

নিষেধাজ্ঞা শেষে ২০০১ সালে সান্তিয়াগোতে চিলির কিংবদন্তি ইভান জামোরানোর বিদায়ী ম্যাচে ৪৩ বছর বয়সে শেষবারের মতো মাঠে নেমেছিলেন রোহাস। চিলির দর্শকেরা তাঁকে হাততালি দিয়ে বরণ করে নিয়েছিলেন। রোহাস সেদিন আবেগ জড়ানো কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘নিজের দেশের মানুষের ক্ষমার চেয়ে বড় আর কিছু হতে পারে না।’

মারাকানায় ফ্লেয়ারটি ছুড়েছিলেন যিনি, সেই রোজেনেরি মেলো নাসিমেন্তো।

ও আচ্ছা, সেই ফ্লেয়ার ছোড়া সুন্দরী রোজেনেরির গল্পটা তো শেষ করা হয়নি। সেদিন কয়েক ঘণ্টা পুলিশি হেফাজতে থাকার পর তিনি রাতারাতি তারকা বনে যান এবং শুরু করেন মডেলিংও। পরে বিখ্যাত প্লেবয় ম্যাগাজিনের জন্য পোজ দিয়েছিলেন। ‘প্লেবয়’-এ যেভাবে পোজ দিতে হয় আর কী!