
‘আমরা বন্ধু নই’—এফএ কাপ ফাইনালে ম্যানচেস্টার ডার্বির আগে কথাটা বলেছেন ম্যান সিটি কোচ পেপ গার্দিওলা। বন্ধু নন, কিন্তু শত্রুও যে হতে চান না, সে ইঙ্গিতও স্পষ্ট ছিল গার্দিওলার কথায়। নয়তো প্রতিদ্বন্দ্বী কোচের জন্য মুখে নিশ্চয়ই প্রশংসার তুবড়ি ছোটাতেন না। কিন্তু ফুটবলে এসব প্রশংসাবাণীকে যে বিনা সন্দেহে বিশ্বাস করতে নেই, তা নিশ্চয়ই অজানা নয় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড কোচ এরিক টেন হাগের। ‘শত্রু’কে মিষ্টি কথার ফাঁদে ফেলে শিকার করার এ কৌশল তো বহু পুরোনো।
যিনি গতকাল সংবাদ সম্মেলনে এসে তাঁকে প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন, সেই গার্দিওলাই আড়ালে বসে নিশ্চিতভাবে আরেকটি ‘পুতুলনাচ’ নাচানোর উপাখ্যান লিখছেন। বিপরীতে টেন হাগও নিশ্চয়ই হাত গুটিয়ে বসে নেই। ডার্বিতে তিনিও লিখতে চান আরেকটি বিজয়গাথা। তাই শিষ্যদের নিয়ে সিটিকে আটকানোর ফাঁদ আঁটছেন এই ফ্লাইং ডাচম্যানও। অপ্রতিরোধ্য গার্দিওলার ঘরোয়া ডাবল তথা ট্রেবল জয় রুখে দিতে নিখুঁত একটা চিত্রনাট্য যে তাঁর খুব প্রয়োজন।
তবে কৌশল আঁটলেই তো আর হয় না, মাঠে সেটির সঠিক বাস্তবায়নের ওপরই নির্ভর করছে লড়াইয়ের ফলাফল। তাই ডার্বি জিততে আজ রাতে যা প্রয়োজন, তা হলো চিত্রনাট্য তথা কৌশল ও পারফরম্যান্সের দুর্দান্ত সমন্বয়। তবে এই ম্যাচেও দুই দলের মধ্যে এমন কিছু জায়গা আছে, যা ম্যাচের ভাগ্যনির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।
ম্যানচেস্টার ডার্বিতে লম্বা সময় ধরে রাজত্ব করা ইউনাইটেড নগরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের ১৮৯ ম্যাচ খেলে ৭৮টিতেই জিতেছে, বিপরীতে সিটির জয় ৫৮ ম্যাচে। ড্র হয়েছে অন্য ৫৩ ম্যাচে। তবে এই পরিসংখ্যানে শুভংকরের ফাঁকিও আছে। কারণ, সাম্প্রতিক দৃশ্যপটটা ভিন্ন। ২০১৬ সালে পেপ গার্দিওলা দায়িত্ব নেওয়ার পর ১৮ ম্যাচের ৯টিতেই জিতেছে সিটি। অন্যদিকে এফএ কাপে এখন পর্যন্ত ৯ ম্যাচে মুখোমুখি হয়ে ইউনাইটেড জিতেছে ৬ ম্যাচ এবং সিটি জিতেছে বাকি ৩ ম্যাচে।
তবে পরিসংখ্যান যে বিশাল ধাপ্পা, সেটি আরও একবার মনে করিয়ে দিতে হয়। কারণ, এ বছরের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলে গোল করা, গোল হজম করা, গোলের সম্ভাবনা তৈরি, বলের দখল, পাস এবং অন্য সব মানদণ্ডেও ইউনাইটেডের চেয়ে ঢের এগিয়ে ছিল সিটি। আজ রাতের ম্যাচেও নিশ্চিতভাবে ফেবারিট হিসেবে মাঠে নামবে গার্দিওলার সিটি। তবু ফাইনালের মতো ম্যাচে একটি মুহূর্ত বদলে দিতে পারে ম্যাচের দৃশ্যপট। একটি পাস, কারও ব্যক্তিগত শৈলী কিংবা একটি শিশুতোষ ভুল ওলট–পালট করে দিতে পারে ম্যাচের ফল।
কাগজে–কলমে গার্দিওলার সিটি এগিয়ে থাকলেও দুই কোচের ট্যাকটিকাল মাস্টারক্লাসে ফিরে তাকালে কিন্তু ভিন্ন কিছু ধরা পড়বে। গত ১৪ জানুয়ারি প্রিমিয়ার লিগের দ্বিতীয় লেগের ম্যাচে সিটিকে ২–১ গোলে হারায় ইউনাইটেড, যা ছিল মূলত টেন হাগের দুর্দান্ত মাস্টারমাইন্ডের ফসল। যেখানে টেন হাগ গার্দিওলার শিষ্যদের স্বাভাবিক খেলার পথটা রুদ্ধ করে দেন। মিডফিল্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গার্দিওলার পুরো পরিকল্পনা ছত্রভঙ্গ করে দেন এবং ফলটা নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসেন। আজ রাতেও তেমন লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামবে ওল্ড ট্রাফোর্ডের লাল জার্সিধারী ক্লাবটি।
সাম্প্রতিক সময়ে গার্দিওলার সাফল্যের মূলত ভিত্তি ছিল ‘ওভারলোডেড মিডফিল্ড’ (যখন একটি দল নির্দিষ্ট কোনো জায়গায় প্রতিপক্ষের চেয়ে বেশি খেলোয়াড়কে খেলায়, সেটিকে ওভারলোড বলা হয়)। পাশাপাশি ইনভার্টেড ফুলব্যাক (ফুলব্যাক হলেও যাঁরা বিল্ডআপের সময় মিডফিল্ডে চলে আসেন) এবং ইনভার্টেড উইঙ্গাররাও যথেষ্ট ভূমিকা রেখেছেন। এ ছাড়া গার্দিওলার কৌশলগত মাস্টারস্ট্রোকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলেন জন স্টোনস। যাঁকে ফলস সেন্টারব্যাক হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে ধাঁধার মধ্যে ফেলে দিচ্ছেন গার্দিওলা। স্টোনসের পাশাপাশি রদ্রিও গার্দিওলার কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে কাজ করছেন।
এ ছাড়া ম্যানুয়েল আকাঞ্জিকে লেফটব্যাক পজিশনে খেলানোও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গার্দিওলার বিশেষ হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। চোটের কারণে আজকের ম্যাচে তাঁর খেলা নিয়ে অবশ্য শঙ্কা রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কমবেশি এসব কৌশল ব্যবহার করে আক্রমণ গড়ে তুলছে সিটি। যেখানে আক্রমণ তৈরির জন্য ডিফেন্সকে বিশেষভাবে কাজে লাগাচ্ছে তারা। আর চোটের কারণে লাইনআপে পরিবর্তন এলেও গার্দিওলার এই কৌশল থেকে সরে আসার সম্ভাবনা সামান্যই।
পাশপাশি ডার্বিতে আধিপত্য ধরে রাখতে হলে কয়েকজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের দিকেও তাকিয়ে থাকতে হবে সিটিকে। রিয়াল মাদ্রিদকে চ্যাম্পিয়নস লিগে উড়িয়ে দেওয়ার পথে গার্দিওলার কৌশল বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন রদ্রি, কাইল ওয়াকার, জ্যাক গ্রিলিশ এবং বের্নার্দো সিলভার মতো তারকারা। আজ রাতেও তাঁদের পারফরম্যান্সের ওপর সিটির সাফল্যের অনেকটাই নির্ভর করছে। আর্লিং হলান্ড–ডি ব্রুইনারা যদি কড়া মার্কিংয়ে পড়েন, তবে ফাঁকা জায়গা বের করতে এগিয়ে আসতে হবে এদেরকেই।
কৌশলের এ লড়াইয়ে টেন হাগের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন হবে। তিনি চাইবেন, মূলত গার্দিওলার কৌশলকে নষ্ট করে দিতে। অর্থাৎ, নিজের কৌশলগত অবস্থানের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেয়ে প্রতিপক্ষের রণে ভঙ্গ দেওয়াকেই মূলত পাখির চোখ করবেন ডাচ কোচ। এই কৌশলেই মূলত তিনি শেষ ডার্বি ম্যাচে সাফল্য পেয়েছিলেন। আজও ইউনাইটেড খেলোয়াড়দের লক্ষ্য থাকবে, বল নিয়ে আক্রমণ তৈরির জন্য সিটি ডিফেন্ডাররা যেন কোনো জায়গা বের করতে না পারেন, সেটা নিশ্চিত করা। নিজেদের এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে মিডফিল্ডে শক্ত দেয়াল তৈরি করে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের জন্য জায়গা সংকুচিত করে আনার চেষ্টাও থাকবে ইউনাইটেডের।
পাশাপাশি ইউনাইটেডের কৌশলের আরেকটি অংশ হবে উইঙ্গারদের সঠিকভাবে ব্যবহার করা। যেখানে উইঙ্গারদের মূল কাজ হবে সিটির সেন্টারব্যাকদের ওপর প্রেসিংয়ের ঝড় তুলে তাদের এলোমেলো করে দেওয়া। ‘রেড ডেভিল’ বাহিনী যদি এই কাজ ঠিকঠাক করতে পারে, তবে সিটির পাসিং লাইন অকেজো হয়ে পড়বে এবং সে ক্ষেত্রে নিজের কৌশল থেকে সরে আসতে বাধ্য হবেন গার্দিওলা, যা একই সঙ্গে ইউনাইটেডকেও প্রতি–আক্রমণে গিয়ে গোল বের করার সুযোগ তৈরি করে দেবে। ইউনাইটেডের এ কৌশলের সাফল্য বিশেষভাবে নির্ভর করছে কাসেমিরো এবং ক্রিস্টিয়ান এরিকসেনের পারফরম্যান্সের ওপর। মিডফিল্ডে এ দুজন কতটা কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারবেন, তার ওপরই নির্ভর করছে ম্যাচের অনেক কিছু।
ফাইনালের মতো গুরুত্বপূর্ণ লড়াইয়ে অবশ্য ব্যক্তিগত নৈপুণ্যও পার্থক্য গড়ে দিতে পারে। যেমন আজকের দিনটা যদি হলান্ড–ডি ব্রুইনাদের হয়, তবে ইউনাইটেডের কোনো প্রতিরোধই দিন শেষ কাজে আসবে না। তবে এর উল্টোটাও তো হতে পারে। কাসেমিরো, ব্রুনো ফার্নান্দেজ বা মার্কাস র্যাশোর্ডরা যদি নিজেদের সেরাটা নিয়ে জ্বলে উঠতে পারেন, তবে ইংল্যান্ডে নিজের দ্বিতীয় শিরোপাটা পেয়ে যেতে পারেন টেন হাগও। তবে শেষ পর্যন্ত এই আগুনে দ্বৈরথে কার কৌশল বাজিমাত করবে, তা জানতে আজ রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হচ্ছে।