নতুন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক
নতুন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক

মাঠের অতন্দ্র প্রহরী থেকে এবার ক্রীড়াঙ্গনের ‘ক্যাপ্টেন’ আমিনুল

ফুটবল মাঠে একসময় যাঁর বিশ্বস্ত হাত প্রতিপক্ষের গোল রুখে দিত, সেই আমিনুল হক এখন দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সর্বোচ্চ অভিভাবক। দীর্ঘ জল্পনা আর রাজনৈতিক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে ‘টেকনোক্র্যাট কোটায়’ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন জাতীয় দলের সাবেক এই অধিনায়ক। মাঠ থেকে পরে মন্ত্রিসভায় যাওয়ার নজির অবশ্য এ দেশে নতুন নয়। এর আগে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও আরিফ খান জয়রাও বুট জোড়া তুলে রেখে রাজনীতির আঙিনায় পা রেখেছিলেন। হয়েছিলেন মন্ত্রীও।

ভোলার ছেলে আমিনুলের বেড়ে ওঠা ঢাকার মিরপুরে। বড় ভাই মঈনুল হকও ছিলেন মাঠের মানুষ। ভাইয়ের হাত ধরেই ফুটবলের প্রেমে পড়া। কিশোর বয়সে খ্যাপ খেলে পাওয়া প্রথম ১৫০ টাকা যখন মায়ের হাতে তুলে দিয়েছিলেন, সেই তৃপ্তির হাসিই যেন আমিনুলকে বুঝিয়ে দিয়েছিল—তাঁকে অনেক দূর যেতে হবে। পাইওনিয়ার লিগের এমএসপিসি সিটি ক্লাবে যখন হাতেখড়ি হলো, তখনই কোচরা টের পেয়েছিলেন, এই ছেলেটি বিশেষ কিছুর জন্য জন্ম নিয়েছে।

অবিশ্বাস্য শোনালেও সত্য, নব্বইয়ের দশকে ঢাকার পাইওনিয়ার লিগে নিজের প্রথম ৯ ম্যাচে কোনো গোল হজম করেননি আমিনুল। পাইওনিয়ার লিগে নৈপুণ্যের পর আমিনুলকে ঢাকার প্রথম বিভাগ লিগের দল ইস্ট এন্ড ক্লাবে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ভাই মঈনুল হক এবং মোহামেডানের রক্ষণভাগের খেলোয়াড় ইমতিয়াজ সুলতান জনির সহায়তায় মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব তাঁকে দলে ভেড়ায়। অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ছাঈদ হাসান কানন ক্লাবে থাকায় মোহামেডানে আমিনুলের সময়টা কেটেছিল তৃতীয় গোলরক্ষক হিসেবে।

২০০১ বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে দাম্মামে বাংলাদেশের ফুটবলের তিন তারকা হাসান আল মামুন, আমিনুল হক (মাঝে) ও আলফাজ আহমেদ

মোহামেডানের সঙ্গে দুই বছরের বাইন্ডিংস শেষে আমিনুল ১৯৯৬ সালের প্রিমিয়ার লিগে ফরাশগঞ্জ এসসিতে নাম লেখান। কোচ প্রাণ গোবিন্দ কুণ্ডুর অধীনে আমিনুল দলের প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক হিসেবে খেলেন। আমিনুলের অভিষেক মৌসুমে ফরাশগঞ্জ লিগে ষষ্ঠ হয়ে অবনমন এড়ায়। ১৯৯৬ সালে ফরাশগঞ্জের জার্সি গায়েই আমিনুল বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, বড় মঞ্চের জন্য প্রস্তুত তিনি। তাঁর রক্ষণব্যূহের সামনে দেশের সেরা স্ট্রাইকাররা বারবার খেই হারিয়ে ফেলতেন। সেই লিগের দুই পর্বে আবাহনী-মোহামেডানের বিপক্ষে চার ম্যাচে ফরাশগঞ্জ হারেনি। চারটিই হয়েছে ড্র। আবাহনীকে রুখে দিলে মোহামেডান পুরস্কার দিত ১০ হাজার টাকা, আবার মোহামেডানকে রুখলে আবাহনী দিত ১০ হাজার টাকা। এভাবে ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি প্রেরণা পান বড় দলের কাছ থেকে।

জাতীয় দলে অভিষেক ১৯৯৮ সালে কাতারের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে। খেলেছেন ২০১১ পর্যন্ত। চোট ছাড়া তাঁকে কখনো বসে থাকতে হয়নি। আমিনুলের জন্যই জাতীয় দলে বেশি খেলার সুযোগ হয়নি বিপ্লব ভট্টাচার্যর।

আমিনুলের ক্যারিয়ারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র। ১৯৯৭ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে দলটির গোলপোস্টের নিচে ছিলেন। এর মধ্যে ২০০০ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত দলটিকে এনে দিয়েছেন অসংখ্য ট্রফি। আবাহনী, মোহামেডান বা শেখ জামালের হয়ে যখনই তিনি মাঠে নেমেছেন, সমর্থকদের মনে নিশ্চিন্ত ভরসা জেগেছে। দলকে এনে দিয়েছেন ট্রফি। ২০০৯ সালে প্রথম সুপার কাপের ফাইনালে মোহামেডানকে শিরোপা জেতাতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন, স্বীকৃতিস্বরূপ টুর্নামেন্টের সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার পেয়েছেন।

২০০১ সালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে সৌদি আরবের বিপক্ষে ম্যাচে বাংলাদেশের গোলকিপার আমিনুল হক

জাতীয় দলে অভিষেক ১৯৯৮ সালে কাতারের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে। খেলেছেন ২০১১ পর্যন্ত। চোট ছাড়া তাঁকে কখনো বসে থাকতে হয়নি। আমিনুলের জন্যই জাতীয় দলে বেশি খেলার সুযোগ হয়নি বিপ্লব ভট্টাচার্যর।

২০০৩ সালে ঢাকার জাতীয় স্টেডিয়াম মেতেছিল সাফ ট্রফি জয়ের আনন্দে। পুরো দেশ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল সাফের ফাইনালের দিকে। মালদ্বীপের বিপক্ষে টাইব্রেকারে আমিনুল যখন দ্বিতীয় শটটি রুখে দিলেন, তখন পুরো গ্যালারি গর্জে উঠেছিল। সেই মুহূর্তটি আমিনুলকে পরিণত করেছিল জাতীয় নায়কে। বাংলাদেশের ফুটবলে এখনো ২০০৩ সালের সাফ জয়ই শ্রেষ্ঠ অর্জন হিসেবে গণ্য করা হয়।

২০১০ সালের এসএ গেমস ছিল আমিনুলের ক্যারিয়ারের আরও এক স্মরণীয় মাইলফলক। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ দল সোনা জিতেছিল এবং বিস্ময়করভাবে পুরো টুর্নামেন্টে আমিনুলের বিপক্ষে কোনো গোল হয়নি। ২০০১ সালে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে দাম্মামে ভিয়েতনামের সঙ্গে ড্র দিয়ে শুরু করে বাংলাদেশ। মঙ্গোলিয়াকে হারিয়ে বড় জয় পায় বাংলাদেশ। তারপর সৌদি আরবের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ ৩-০ গোলে হারলেও তাঁর লড়াকু মনোভাব প্রশংসিত হয়েছিল আন্তর্জাতিক মহলে। দাম্মামের রাস্তায় বেরোলে তাঁকে ঘিরে ধরতেন প্রবাসীরা। কাতার যুব দলের সঙ্গে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ দলের প্রীতি ম্যাচ ড্রয়ের পর দোহার এক প্রবাসীর কাছে পাওয়া ২০০ রিয়াল পুরস্কার আমিনুলের ফুটবল–জীবনের অন্যতম প্রাপ্তি।

গোলকিপারের জার্সিতে আমিনুল হক

বাংলাদেশের সাফ জয়ের নেপথ্য কারিগর প্রয়াত অস্ট্রিয়ান কোচ জর্জ কোটানের প্রিয় ছাত্র ছিলেন আমিনুল। কোটান থেকে শুরু করে অনেক ফুটবল বিশেষজ্ঞর মতেই আমিনুলের প্রতিভা ছিল ইউরোপের বড় লিগে খেলার মতো। কাতারের আল হিলাল ক্লাব একবার তাঁকে দলভুক্ত করতে চেয়েছিল, কিন্তু ভাগ্য খোলেনি শেষ পর্যন্ত।

ঢাকার দলবদলে তাঁকে নিয়ে নাটক হয়েছে অনেক। ২০০০ সালে লন্ডনে প্রীতি ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ জাতীয় দল ঢাকায় ফিরলে বিমানবন্দরেই আমিনুলকে নিয়ে কাড়াকাড়ি লাগে আবাহনী আর মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে। ২০০৩ সালে এই দুই ক্লাব আবার যুদ্ধে নামে আমিনুলকে দলে নিতে। তারই জেরে মুন্সিগঞ্জের এক জায়গায় ১২ দিন তাঁকে লুকিয়ে রাখে মুক্তিযোদ্ধা। ২০০৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমিনুলের ভাই মঈনুল হক রমনা থানায় একটি মামলা করেন, যেখানে তিনি আবাহনী লিমিটেড ঢাকার বিরুদ্ধে আমিনুলকে অপহরণের অভিযোগ আনেন। ১২ সেপ্টেম্বর ভোরে পুলিশ আমিনুলের সন্ধানে ধানমন্ডির আবাহনী ক্লাবে নজিরবিহীন অভিযান চালায়, কিন্তু সেখানে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

দেশজুড়ে যখন তাঁর খোঁজ চলছিল, তখন ওই দিন বিকেলেই আমিনুল আকস্মিকভাবে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ড অফিসে হাজির। সেখানে তিনি দাবি করেন, বন্দুকের মুখে তাঁকে তুলে নিয়ে আবাহনী ক্লাবে রাখা হয়েছিল এবং পরে মোহাম্মদপুরের একটি বাড়িতে বন্দী করে রাখা হয়। আমিনুল তখন বলেছিলেন, তিনি ওই বাড়ির দোতলার ব্যালকনি থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে এসেছেন।

খেলা ছাড়ার পর রাজনীতিতে যোগ দেন আমিনুল হক

খেলার মাঠ থেকে অবসর নিয়ে আমিনুল বেছে নেন দেশের মূলধারার রাজনীতি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে রাজপথে সক্রিয় হন। কিন্তু এই পথ তাঁর জন্য মসৃণ ছিল না। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাঁকে রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। দিনের পর দিন কারাগারে কাটাতে হয়েছে, সহ্য করতে হয়েছে হয়রানি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৬ আসনে অত্যন্ত স্বল্প ব্যবধানে হেরে যাওয়া আমিনুলের জন্য ছিল এক সাময়িক ধাক্কা। তবে তাঁর ক্রীড়া মেধা এবং রাজনৈতিক ত্যাগের কথা বিবেচনা করে তাঁকে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছে নতুন সরকার।

পোস্টের নিচে যেমন কোনো বলকে জালে ঢুকতে দেননি, তেমনি দেশের ক্রীড়াঙ্গনেও আমিনুল কোনো ‘অনিয়মের গোল’ হতে দেবেন না—এমনটাই প্রত্যাশা ক্রীড়াপ্রেমীদের।