
বিশ্বকাপ মানে তো শুধু মাঠের লড়াই নয়; এর আশপাশে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য গল্পের কোলাজ। যে গল্পের কোনোটিতে ঐতিহাসিক বিতর্ক আছে, আছে রোমাঞ্চ কিংবা অজানা চমক। বিশ্বকাপের তেমন কিছু গল্প নিয়ে এ আয়োজন—
স্টেডিয়ামের বাইরে তাঁর কোনো ভাস্কর্য নেই। গ্যালারিতে দর্শক-সমর্থকদের কণ্ঠে কখনো তাঁর নাম শোনা যায় না। এমনকি পোল্যান্ডের জাতীয় স্টেডিয়ামের কোনো হসপিটালিটি স্যুটেও তাঁর নামটা খুঁজে পাবেন না।
তাঁর নাম ছিল আর্নেস্ট ভিলিমভস্কি। ১৯৩৮ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের বিপক্ষে এক ম্যাচেই ৪ গোল করার অবিশ্বাস্য কীর্তি ছিল তাঁর। পোল্যান্ডের হয়ে ২২ ম্যাচে ২১ গোল—যেকোনো স্ট্রাইকারের জন্য ঈর্ষণীয় পরিসংখ্যান। তবু পোল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাস থেকে এক রহস্যময় কারণে হারিয়ে গেছেন এই কিংবদন্তি। যেন তিনি কোনো দিন ছিলেনই না!
গল্পটা শুরু ১৯১৬ সালে। তৎকালীন জার্মান সাম্রাজ্যের কাতোভিচে জন্ম নেওয়া এক শিশুর নাম ছিল আর্নেস্ট অটো প্রাডেলা। লাল চুল, বড় বড় কান—শারীরিক গড়নে কিছুটা অদ্ভুত হলেও ফুটবলার হিসেবে ছিলেন ক্ষিপ্র ও সৃজনশীল। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল ডান পায়ে। সেখানে জন্মগতভাবেই ছিল ছয়টি আঙুল! ভিলিমভস্কি বিশ্বাস করতেন, এই ১১তম আঙুলটিই তাঁর জন্য সৌভাগ্যের প্রতীক।
তবে তাঁর জন্মটা ছিল ইউরোপের এক উত্তাল সময়ে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির হয়ে লড়তে গিয়ে তাঁর বাবা মারা যান, যাঁকে কোনো দিন দেখার সুযোগ পাননি আর্নেস্ট। যুদ্ধ শেষে তাঁর শহর কাতোভিচ পোল্যান্ডের অংশ হয়ে যায়। সৎবাবার পদবি নিয়ে তিনি হয়ে যান আর্নেস্ট ভিলিমভস্কি। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, যে জার্মানি তাঁর বাবার প্রাণ কেড়ে নিয়েছিল, সেই জার্মানিই একদিন বদলে দিল তাঁর পরিচয়।
ভিলিমভস্কির ফুটবল ক্যারিয়ার ছিল রূপকথার মতো। পোলিশ ক্লাব রুখ চোরজোর হয়ে ১৯৩০-এর দশকে টানা চারবার লিগ জিতেছিলেন। ১৯৩৪ ও ১৯৩৬ সালে ছিলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। তাঁর ক্যারিয়ারের বাঁকটা বদলে দেয় ১৯৩৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপ। যদিও এর আগে ১৯৩৫ সালে বোনাসের টাকা পেয়ে মাতাল হয়ে লিগ খেলতে আসায় এক বছরের নিষেধাজ্ঞাও জুটেছিল কপালে, যার জন্য ১৯৩৬ অলিম্পিকে খেলা হয়নি তাঁর।
১৯৩৮ বিশ্বকাপের সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে স্ট্রাসবুর্গে ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়েছিল পোল্যান্ড। প্রথমার্ধে ৩-১ গোলে পিছিয়ে থাকা পোলিশরা যখন খাদের কিনারায়, তখনই জ্বলে উঠলেন সেই ১১ আঙুলের জাদুকর। দ্বিতীয়ার্ধে হ্যাটট্রিক করে ম্যাচটাকে ৪-৪ সমতায় ফেরালেন। অতিরিক্ত সময়ে করলেন নিজের চতুর্থ গোল। যদিও শেষ পর্যন্ত ব্রাজিল ম্যাচটি জেতে ৬-৫ ব্যবধানে, কিন্তু ফুটবল–বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছিল দুর্দান্ত এক স্ট্রাইকারকে।
১৯৩৯ সালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে ৪-২ গোলের জয়ের ম্যাচেও হ্যাটট্রিক করেন তিনি। পোলিশরা সেই ম্যাচকে বলে ‘দ্য লাস্ট গেম’। কারণ, তার মাত্র চার দিন পরই জার্মান বাহিনী পোল্যান্ড আক্রমণ করে। শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
বিশ্বযুদ্ধ অনেক ফুটবলারের ক্যারিয়ার শেষ করে দিলেও ভিলিমভস্কি বেছে নিলেন ভিন্ন পথ। পৈতৃক পরিচয়ের সূত্র ধরে তিনি জার্মানির নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর কাছে জাতীয়তা ছিল একটা তকমা মাত্র, তিনি নিজেকে ভাবতেন সাইলেসিয়ান (পোলিশ-জার্মান)। কিন্তু পোল্যান্ডের মানুষের কাছে তিনি হয়ে গেলেন এক চরম ‘বিশ্বাসঘাতক’। জার্মানির জার্সিতে কালো ঈগল প্রতীক বুকে নিয়ে যখন তিনি ফুটবল খেলছিলেন, পোল্যান্ড তখন ধ্বংসস্তূপ। নাৎসিদের হয়ে তাঁর এই ‘প্রোপাগান্ডা ম্যাচ’ খেলা পোলিশরা মেনে নিতে পারেনি।
যদিও এই সিদ্ধান্তের আড়ালে ছিল এক করুণ বাস্তবতা। একজন রুশ ইহুদির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের অভিযোগে তাঁর মাকে আউশভিৎজ কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো হয়েছিল। ধারণা করা হয়, জার্মানির হয়ে ফুটবল খেলেই তিনি তাঁর মাকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। জার্মানির হয়ে ৮ ম্যাচে ১৩ গোল করার পর ১৯৪২ সালে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার থমকে যায়। কারণ, নাৎসিদের যুদ্ধংদেহী আচরণের কারণে জার্মানির সঙ্গে খেলতে কোনো দল রাজি ছিল না তখন!
যে মানুষটি দুই দেশের হয়েই গোল করেছেন, দুই দেশেই যাঁর পরিচয় ছিল, তিনি গ্যালারিতে বসে অচ্ছুতের মতো দেখলেন পোল্যান্ডের হার।
যুদ্ধ শেষ হলে ভিলিমভস্কি তাঁর পোল্যান্ডে ফিরতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পোল্যান্ডের তৎকালীন কমিউনিস্ট সরকার তাঁকে ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যা দিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। অভিমানে আর কোনো দিন পোল্যান্ডে পা রাখেননি তিনি।
১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে পোল্যান্ড যখন জার্মানিতে খেলতে যায়, ভিলিমভস্কি চেয়েছিলেন নিজ দেশের ফুটবলারদের সঙ্গে একবার দেখা করতে। কিন্তু পোল্যান্ডের কর্তারা তাঁকে সেই অনুমতি দেননি। কী ট্র্যাজেডি—যে মানুষটি দুই দেশের হয়েই গোল করেছেন, দুই দেশেই যাঁর পরিচয় ছিল, তিনি গ্যালারিতে বসে অচ্ছুতের মতো দেখলেন পোল্যান্ডের হার।
দক্ষিণ-পশ্চিম জার্মানিতে নিঃসঙ্গ জীবন কাটিয়ে ১৯৯৭ সালে অন্যলোকে চলে যান ভিলিমভস্কি। কিংবা অভিশপ্ত এক জীবন থেকে মুক্তি পান হয়তো!