কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচ জয়ের পর আর্জেন্টিনা ফুটবলারদের উদ্‌যাপন
কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচ জয়ের পর আর্জেন্টিনা ফুটবলারদের উদ্‌যাপন

‘অশুভ দৃষ্টি’ এড়াতে কী করে আর্জেন্টিনা দল

দৃশ্যগুলো এখনো বেশ তরতাজা। হুট করেই কেপ ভার্দের বক্সের ভেতর দৌড় শুরু করলেন লিওনেল মেসি। তাঁর কাছে বলটা উড়ে এল একদম ঠিকঠাক। বক্সের অনেক দূর থেকে তাঁকে বল বাড়িয়ে দিয়েছিলেন লিসান্দ্রো মার্তিনেজ।

গত পরশু আর্জেন্টিনা–কেপ ভার্দে ম্যাচের আরও পরের দুটি দৃশ্যও মনে থাকার কথা সবার। মার্তিনেজ বক্সের কোনায় দাঁড়িয়ে জোরালো শটে জাল খুঁজে পেলেন, প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠা ভোজিনিয়া অসহায় চোখে তাকিয়ে দেখলেন তা।

আরও পরে অতিরিক্ত সময়ে যে আত্মঘাতী গোলে আর্জেন্টিনা প্রায় মুঠো থেকে বেরিয়ে যাওয়া ম্যাচে জয়ের খোঁজ পেল, ক্রিস্টিয়ান রোমেরোর হেডই ঠিক করে দিয়েছিল তার গন্তব্য। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি—কেপ ভার্দের বিপক্ষে আর্জেন্টিনাকে বাঁচিয়ে দেওয়া এই দুজনের কেউই কিন্তু স্ট্রাইকার তো দূর, মাঝমাঠের কেউও নন।

চারদিকে সাদা দাগ কাটা ডি–বক্স সামলে রাখার যে কাজটি তাঁরা করেন, ফুটবলের পরিভাষায় সে পজিশনের নাম ‘সেন্টারব্যাক’। গোলরক্ষকের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাই তাঁদের কাজ। কিন্তু রোমেরো–মার্তিনেজ ওই সীমানা ছাড়িয়েও চলে যান বহুদূর।

পালো সান্তো কাঠ

নিজেদের সীমানা ঠিকঠাক রাখার কাজটা জুটি বেঁধে গত প্রায় চার বছর তাঁরা করছেন। সময়মতো এগিয়ে গেছেন প্রতিপক্ষের ডি–বক্স অবধিও। সবকিছু কখনো আঁধার হয়ে এলে বাকিদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন আশা।

দুজনেরই জন্ম ১৯৯৮ সালে। বয়সভিত্তিক ফুটবলে একসঙ্গে পথচলায় গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। তখনই স্বপ্ন বোনা শুরু জাতীয় দলের জন্যও—এক দিনে একসঙ্গে সব জয় করবেন। ওই গল্পের শুরুটা হয় ২০২২ বিশ্বকাপে।

জাতীয় দলে অভিষেক আগে হলেও কাতারের ওই বিশ্বকাপের আগে দুজনের একসঙ্গে খেলা হয়নি সেভাবে। ২০২২ বিশ্বকাপের সময়ই বয়সভিত্তিক দলের আরেক সঙ্গী নাহুয়েল মলিনাকে নিয়ে রোমেরো–মার্তিনেজ গড়ে তোলেন ‘দ্য পালো সান্তো’ গ্যাং।

দলের ভেতর তিন বন্ধুর এমন নামের পেছনেও আছে মজার গল্প। ২০২২ বিশ্বকাপে সৌদি আরবের কাছে হেরে টুর্নামেন্ট শুরু করেছিল আর্জেন্টিনা। তাদের জন্য বড় এক ধাক্কাই হয়ে এসেছিল ওই হার। তখনই ‘অশুভ দৃষ্টি’ এড়াতে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ হাজির হন একটা বিশেষ উপায় নিয়ে।

‘পালো সান্তো’ নামে একধরনের সুগন্ধি কাঠকে দক্ষিণ আমেরিকার মানুষেরা পবিত্র মনে করেন। সেটি জ্বালিয়ে আর্জেন্টিনার ওপর থেকে ‘অশুভ দৃষ্টি’ সরিয়ে দেন মার্তিনেজ। এর পর থেকে ওই কাঠ জ্বালানো একরকম নিয়মই হয়ে গেছে আর্জেন্টিনা দলের জন্য।

কাতার বিশ্বকাপ হয়ে ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকা, এমনকি এবারের বিশ্বকাপেও প্রতিটি জয়ের পরই পালো সান্তো কাঠ জ্বালান আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা।

কদিন আগে কানসাস থেকে মায়ামি আসার আগে নিরাপত্তা তল্লাশির মধ্যে পড়েছিল আর্জেন্টিনা দল। মেসিরা তাতে বেশ মজাই পেয়েছিলেন বলে মনে হয়েছে সে ঘটনার ভাইরাল ভিডিও দেখে। যদিও সেদিন মেসিদের হাসির কারণটা ছিল ভিন্ন। তল্লাশির সময় সেদিন ‘পালো সান্তোস’ কাঠ জ্বালানোর লাইটারটাই নিয়ে যে গিয়েছিলেন নিরাপত্তাকর্মীরা! ক্রিস্টিয়ান রোমেরো যখন কথাটা মেসিকে জানান, তখনই তাঁর ও রকম হাসি।

ক্রিস্টিয়ান রোমেরো, নাহুয়েল মলিনা ও লিসান্দ্রো মার্তিনেজ— তারা তিন বন্ধু

দলের মধ্যে ওই ‘কুসংস্কার’ ছড়িয়ে দিয়েই মার্তিনেজ–রোমেরো পেয়ে যান ‘পালো সান্তো গ্যাং’য়ের নাম। এমন আধ্যাত্মিকতা অবশ্য তাঁদের দৈনন্দিন জীবনেরই অংশ। কেপ ভার্দের বিপক্ষে ম্যাচের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটা ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। তাতে দেখা যায়, ম্যাচ চলার সময়ই এক সহকারী ‘পবিত্র জল’ এগিয়ে দেন রোমেরো ও মার্তিনেজকে। একজন আরেকজনের হাতে ছিটিয়ে দেন তা।

আর্জেন্টিনা দলে ধর্মীয় রীতি পালনের ঘটনাও পুরোনো। প্রতিটি টুর্নামেন্টেই তাদের ড্রেসিংরুমে ধর্মীয় প্রতীক ও ছবি রাখা থাকে। ২০২২ বিশ্বকাপ জেতার পর তো ট্রফিটা উপাসনালয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্লদিও তাপিয়ে।

‘পবিত্র কাঠে’র বিশ্বাস রোমেরো আর মার্তিনেজের বন্ধুত্বকে করেছে আরও দৃঢ়। তাঁদের মধ্যে মিলেরও অভাব নেই তাই। ২০২২ বিশ্বকাপ জেতানোর এই দুই কারিগরের পায়ে আছে একই রকম ট্যাটু। তাতে বিশ্বকাপ ট্রফির নিচে কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছেন দুজন, তাঁদের সঙ্গী মলিনাও। সামনের পথটাতে তাঁরা আর্জেন্টিনার হয়ে লিখতে চান এমন আরও অনেক গল্প।