হ্যারি কেইন কি তাহলে ওয়াইনের মতো?
বয়স বাড়ার সঙ্গে ওয়াইনের স্বাদ যেমন বাড়ে, তেমনি কেইনের গোলক্ষুধাও বেড়েছে। টটেনহামে থাকতে এক মৌসুমে কেইনের সর্বোচ্চ গোল ছিল ৪১টি। সেটা ২০১৭–১৮ মৌসুমে। তখন কেইন ২৫ বছরের টগবগে যুবক।
বুন্দেসলিগার ইতিহাসে সবচেয়ে দামি খেলোয়াড় হিসেবে কেইন বায়ার্ন মিউনিখে যোগ দেন ২০২৩ সালে, ৩০ বছর বয়সে। তারপর প্রথম তিনটি মৌসুমে ক্লাব ফুটবলে গোলসংখ্যা দেখুন—৪৪, ৪১ ও ৬১। শেষ পরিসংখ্যানটি ২০২৫–২৬ মৌসুমের। এর সঙ্গে ইংল্যান্ডের জার্সিতে আরও ১২ গোল যোগ করলে সংখ্যাটা হয়ে যায় অবিশ্বাস্য—৬৫ ম্যাচে ৭৩ গোল!
কেইন স্বাভাবিকভাবেই এবার ব্যালন ডি’অর জয়ে যোগ্য দাবিদারদের একজন। এত গোল তো আর প্রতি মৌসুমেই দেখা যায় না! সেই ২০১১–১২ মৌসুমে ৬৯ ম্যাচে লিওনেল মেসির ৮২ গোলের রেকর্ডের পর কেইনের গত মৌসুমের গোলসংখ্যাই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বায়ার্নের হয়ে গত মৌসুমে জিতেছেন বুন্দেসলিগা ও জার্মান কাপ। গত জুলাইয়ে শেষ হওয়া বিশ্বকাপে ৬ গোল করে ইংল্যান্ডকে তুলেছিলেন সেমিফাইনালে। ইংরেজ ফুটবলপ্রেমীরা তাই এরই মধ্যে ব্যালন ডি’অর নিয়ে সুর তুলেছেন, ‘ইটস কামিং হোম।’
কিন্তু চাইলেই তো আর হয় না। আগামী ২৬ অক্টোবর ব্যালন ডি’অর দেওয়ার মঞ্চে দাঁড়ানোর মতো কেইনের প্রতিদ্বন্দ্বী কম নেই। কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লামিনে ইয়ামালরা আছেন। নিজ নিজ জায়গা থেকে তাঁরা ব্যালন ডি’অর জয়ে নিজেদের পক্ষে প্রচারণাও চালাচ্ছেন। এমবাপ্পে তো এরই মধ্যে নিজেকে সেরা হিসেবে ঘোষণার পাশাপাশি বলেছেন, ‘খেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় (বিশ্বকাপে) আমি অনেক ইতিহাস গড়েছি। ব্যালন ডি’অর জয়ের জন্য এটি দারুণ একটি বছর।’ ইয়ামালও বলেছেন, ‘বিশ্বের সেরা হিসেবে হয়তো আমাদের দুজনেই (এমবাপ্পে) আছি এবং আমি যা জিতেছি, সেটির ওপর ভিত্তি করে এই বছর এটি আমারই প্রাপ্য।’
এমবাপ্পে বিশ্বকাপে গোলের রেকর্ড ভেঙেছেন। ফ্রান্সকে সেমিফাইনালে তোলার পথে জেতেন গোল্ডেন বুট। রিয়ালের হয়ে গত মৌসুমে ৪২ গোল করলেও কিছু জিততে পারেননি। ইয়ামাল আবার বিশ্বকাপ ও লা লিগা জয়ের পাশাপাশি বার্সার হয়ে ২৪ গোল করার পাশাপাশি ১৮টি গোলও বানান। প্রশ্ন হলো, এমবাপ্পে–ইয়ামাল যদি নিজেদের পক্ষে এভাবে প্রচারণা চালাতে পারেন, তাহলে কেইনের কি বলা উচিত?
শুনুন বায়ার্ন তারকার মুখেই। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কেইন বলেছেন, ‘নিজেকে নিয়ে খুব বেশি কথা বলতে ভালো লাগে না। শুধু এটুকু বলব, গত মৌসুমটি অসাধারণ ছিল। সেটি ছিল আমার জীবনের সেরা মৌসুম...তবে ব্যালন ডি’অর তো আর আমার হাতে নেই, এটি সম্পূর্ণ নির্ভর করে ভোটদাতাদের ওপর...৭৩ গোলই সব বলে দিচ্ছে।’
কেইন জানেন, এখন ব্যালন ডি’অর নিয়ে আলোচনা হবে। বর্ষসেরার এ পুরস্কারে এবারের সংস্করণটি কেইনের জন্য আবার বিশেষ উপলক্ষ। কারণ, এবারই প্রথম ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনে বসবে ব্যালন ডি’অর আসর। কেইন যেহেতু সেখানকার ঘরের ছেলে তাই তাঁকে নিয়েই স্বপ্ন দেখা স্বাভাবিক ইংলিশদের। কেইনের নিজের কেমন লাগছে?
শুনুন তাঁর মুখেই, ‘অনেকে আমাকে এই কথা বলেছেন। হয়তো এটি ভালো লক্ষণ। এটি আমার নিজের শহর হওয়ায় বিষয়টি আরও বেশি বিশেষ হয়ে উঠেছে। তাই হ্যাঁ, এ বছর সেখানে এটি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়াটা এক অদ্ভুত অনুভূতি। দেখতে হবে শেষ পর্যন্ত কী হয়।’
শেষ পর্যন্ত যা–ই ঘটুক, এরই মধ্যে এক মজার প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, কেইন এই যে গোলের পর গোল করছেন, এত গোল উদ্যাপন করতে তাঁর ক্লান্ত লাগে না? সাক্ষাৎকারে কেইন এ প্রশ্নের জবাব দিলেন জাত স্ট্রাইকারদের মতোই, ‘কখনোই না। গোল করার অনুভূতিটাই সবচেয়ে দারুণ! এটি এক অবিশ্বাস্য রোমাঞ্চ তৈরি করে; একই সঙ্গে মনের ভেতর এক বিশাল স্বস্তির ভাব আসে। আমি জানি, খেলা ছেড়ে দেওয়ার পর এই অনুভূতিটা আমার ভীষণ মিস করব।’
কেইনের বয়স ৩৩ বছর। এই বয়সে অনেকেই অবসর নেওয়ার কথা ভাবেন কিংবা নিয়ে নেন। কিন্তু কেইন সময় গড়িয়ে চলার সঙ্গে আরও ধারাল হচ্ছেন। তাঁর এই সাফল্যের রহস্য কী?
ইংল্যান্ডের জার্সিতে সর্বোচ্চ এই গোলদাতা নিজেই ভেঙেছেন সেই রহস্য। বয়স বাড়ার সঙ্গে তাঁর আরও বেশি ধারালো হয়ে ওঠায় যাঁদের অবদান সবচেয়ে বেশি, তাঁদের একজনের নাম বলেছেন বায়ার্ন ফরোয়ার্ড। কেইনের ভাষায়, ‘তাঁদের একজনকে আপনি (সাংবাদিককে) ভালো করেই চেনেন। আমার সাফল্যে (কেইনের ব্যক্তিগত ক্রীড়া চিকিৎসক) আলেহান্দ্রো এলোরিয়াগার ভূমিকা খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
কেইন তাঁর অবদান ব্যাখ্যা করলেন এভাবে, ‘আমার বর্তমান ফর্মে আলেহান্দ্রোর ভূমিকা অত্যন্ত মৌলিক। পর্দার আড়ালে আমরা প্রচুর কাজ করি। সাড়ে ছয় বছর ধরে একসঙ্গে আছি। এ পর্যায়ে পারফর্ম করা এবং এত বেশি ম্যাচ খেলতে পারার পেছনে তিনিই অন্যতম প্রধান কারণ। এ বছরগুলোয় আমি ক্রমাগত যে উন্নতি করছি, তা কাকতালীয় ব্যাপার নয়। অনেকের ধারণা, এ বয়সে পারফরম্যান্স সাধারণত কমতে থাকে। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে প্রায় উল্টো ঘটনাই ঘটেছে। আলেহান্দ্রোর সঙ্গে কাজ দুজনের জন্যই অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও তৃপ্তিদায়ক। তা ছাড়া তিনি দারুণ একজন মানুষ এবং আমরা অনেক সময় একসঙ্গে কাটাই। স্বাভাবিকভাবেই তাঁর সব কাজের জন্য আমি আমার গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চাই।’