
বিশ্বকাপ মানে তো শুধু মাঠের লড়াই নয়; এর আশপাশে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য গল্পের কোলাজ। যে গল্পের কোনোটিতে ঐতিহাসিক বিতর্ক আছে, আছে রোমাঞ্চ কিংবা অজানা চমক। বিশ্বকাপের তেমন কিছু গল্প নিয়ে এ আয়োজন—
ঘটনাটা ঘটেছিল ১৯৯৪ বিশ্বকাপের ঠিক আগ মুহূর্তে। বোস্টনের ফ্যানুইল হল মার্কেটের ফুড কোর্টে তখন পিৎজা খাচ্ছিলেন ডিয়েগো ম্যারাডোনা। সঙ্গে স্ত্রী ক্লদিয়া, কন্যারা ও বন্ধু সাংবাদিক আদ্রিয়ান পায়েঞ্জা। পায়েঞ্জার এক সাবেক ছাত্র গেরি গারবুলস্কিও যোগ দিয়েছিলেন সেই মধ্যাহ্নভোজে।
খাওয়া শেষে ডিয়েগোর হঠাৎ খেয়াল চাপল, নিজের জন্যই কয়েক জোড়া জুতা কেনা দরকার। ব্যস, গেরিকে সঙ্গী করে ম্যারাডোনা ঢুকলেন কাছের এক ‘ফুট লকার’ শোরুমে।
দোকানের চারপাশ তখন বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে নানা তারকার পোস্টারে সেজে উঠেছে। তবে অদ্ভুত ব্যাপার, সেসব পোস্টারের ভিড়ে আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সির কোনো ছবিই ছিল না! মার্কিনিদের এমন ফুটবল-জ্ঞানের বহর দেখে ম্যারাডোনা অবশ্য রাগ করেননি। বরং শোকেসের হরেক ব্র্যান্ড আর রংবেরঙের জুতার মডেল দেখে ছোট বাচ্চার মতো উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। ডিয়েগো একের পর এক জুতা পায়ে দিয়ে দেখছেন, আর তাঁকে সাহায্য করছেন বন্ধু গেরি এবং দোকানের এক তরুণ বিক্রয়কর্মী।
পছন্দ খোলতাই হতে হতে শেষ পর্যন্ত এক ধাক্কায় আট জোড়া জুতা কিনে ফেললেন ম্যারাডোনা! বিল মেটানোর সময় ক্যাশিয়ারের মুখে তো চওড়া হাসি। এত বড় খদ্দের বলে কথা! মহাখুশি হয়ে ক্যাশিয়ার সাহেব ম্যারাডোনাকে একটা চাবির রিং উপহার দিলেন। তারপর অত্যন্ত গোপন তথ্য দেওয়ার মতো করে ফিসফিসিয়ে ইংরেজিতে বললেন, ‘আপনি হয়তো জানেন না, আমাদের এই আমেরিকায় কিন্তু একটা ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হতে যাচ্ছে। এই চাবির রিংটায় সেই টুর্নামেন্টের লোগো দেওয়া আছে।’
আমেরিকার মানুষের এমন সরল ফুটবল-অজ্ঞতা দেখে মনে মনে হয়তো হেসেছিলেন ম্যারাডোনা। গেরি যখন কথাটা অনুবাদ করে শোনালেন, ডিয়েগো অত্যন্ত ভদ্রভাবে হাসিমুখে উপহারটা নিলেন। তারপর ক্যাশিয়ারকে ধন্যবাদ জানিয়ে দুই আর্জেন্টাইন দোকান থেকে বেরিয়ে এলেন।
গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু বিধাতা তো ম্যারাডোনার জীবনের চিত্রনাট্য সব সময় একটু বেশি নাটুকে করে লিখতে ভালোবাসেন!
তাঁরা বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক কয়েক সেকেন্ড পর ওই দোকানে ঢুকলেন সাংবাদিক পায়েঞ্জা আর ম্যারাডোনার স্ত্রী ক্লদিয়া। ক্লদিয়া আসলে তাঁর মেয়েদের জন্য স্নিকার্স কিনতে ভুলে গিয়েছিলেন। দোকানে ঢুকেই পায়েঞ্জা লক্ষ করলেন চারপাশের ফুটবলীয় সাজসজ্জা। তরতাজা আট জোড়া জুতা বেচতে পেরে তখনো ক্যাশিয়ারের চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক।
পায়েঞ্জা কৌতূহল সামলাতে না পেরে ক্যাশিয়ারকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা ভাই, একটু আগে যে ভদ্রলোক জুতা কিনে গেলেন, ওনাকে চিনতে পেরেছেন?’
ক্যাশিয়ার মাথা চুলকে বললেন, ‘না তো! কে উনি?’
পায়েঞ্জা বুক ফুলিয়ে বললেন, ‘উনি এই পৃথিবীর ইতিহাসে সেরা ফুটবলার!’
শুনেই তো ছোকরা ক্যাশিয়ারের চক্ষু চড়কগাছ! এত বড় তারকার কাছ থেকে একটা অটোগ্রাফ নেওয়া হলো না? নিজের এই ঐতিহাসিক বোকামিতে চরম লজ্জিত হয়ে সে আর এক সেকেন্ডও সময় নষ্ট করল না। তড়িঘড়ি করে একটা কাগজ আর কলম হাতে নিয়ে দোকান থেকে এক ছুটে বাইরে বেরোল। হন্যে হয়ে খুঁজতে লাগল সেই উজ্জ্বল নক্ষত্রকে। গগনবিদারী চিৎকার করতে করতে যখন সে ডিয়েগোদের দলের কাছাকাছি পৌঁছাল, তখন উত্তেজনায় তার হাত কাঁপছে।
অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত! ক্যাশিয়ার ছোকরা হাঁপাতে হাঁপাতে কাগজ আর কলমটা বাড়িয়ে দিল। কার দিকে?
ডিয়েগো ম্যারাডোনার দিকে নয়! সে পরম আবেগে আর কাঁপা কাঁপা গলায় অটোগ্রাফ চাইল ডিয়েগোর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধু গেরি গারবুলস্কির কাছে!
ডিয়েগোর চেয়ে ওই দীর্ঘদেহী, জাদুকরি চেহারার গেরিকেই যে ক্যাশিয়ারের কাছে আসল বিশ্বসেরা ফুটবলার মনে হয়েছিল!