১৯৫৮ বিশ্বকাপ। আয়োজক সুইডেন। সবার আগে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশটিতে পা রাখে ফ্রান্স। তখন এক ফরাসি সংবাদমাধ্যম কটাক্ষ করে লিখেছিল, ‘ওরা সবার আগে গেছে, কারণ সবার আগে বিদায় নেবে।’
ফুটবলের মানচিত্রে ফ্রান্স তখনো দ্বিতীয় সারির নাম। এই দল সেমিফাইনালে খেলবে, এমন বিশ্বাস দেশটির গণমাধ্যমের ছিল না। আর এই দলের একজন স্ট্রাইকার পরের কয়েক সপ্তাহে এমন এক রেকর্ড গড়বেন, যা সাত দশক পেরিয়েও কেউ স্পর্শ করতে পারবে না—তা বোধ হয় দুনিয়ার কারও কল্পনাতেই ছিল না।
আর সেই রেকর্ড গড়ার সময় তাঁর পায়ে ছিল অন্যের জুতা। ধারের জুতায় খেলে কিংবদন্তি হয়ে ওঠা এই ফুটবলারের নাম জাস্ট ফন্টেইন।
বাবা ফরাসি, মা স্প্যানিশ। আর ফন্টেইনের জন্ম মরক্কোর মারাকেশে। ২০ বছর বয়সে ১৯৫৩ সালে থিতু হন বাবার দেশে। ’৫৮–এর বিশ্বকাপ শুরুর আগের মৌসুমে ফন্টেইন ছিলেন দুর্দান্ত ছন্দে। তাঁর দল রেইমস জেতে ফরাসি লিগ আর ফরাসি কাপ। ৩৪ গোল করে লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতা ফন্টেইনই। তবু দুর্ভাগ্য। বিশ্বকাপে তাঁর নাম স্ট্রাইকার হিসেবে প্রথম পছন্দের তালিকায় ছিল না।
ফন্টেইনকে সুইডেন বিশ্বকাপের দলে নেওয়া হয় মূলত আরেক স্ট্রাইকার রেনে ব্লিয়ারের বিকল্প হিসেবে। কিন্তু ব্লিয়ারের গোড়ালিতে চোট লাগলে সুযোগ এসে পড়ে ফন্টেইনের সামনে। কিন্তু সুযোগের সঙ্গে হাজির হলো নতুন বিপদও।
১৯৫৮ সালের মে মাসে ওরলিতে অনুশীলনের সময় ফন্টেইনের বুট ছিঁড়ে গেল। ‘তখন আমাদের কাছে মাত্র দুই জোড়া বুট থাকত, কোনো স্পনসর ছিল না’—পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন তিনি।
স্পনসর নেই, নতুন জুতা আনার সময় নেই। বিশ্বকাপের দরজায় দাঁড়িয়ে ফন্টেইনের হাতে তখন শুধু ছেঁড়া এক জোড়া বুট। সৌভাগ্যক্রমে দলের রিজার্ভ ফরোয়ার্ড স্তেফান ব্রুয়ের পায়ের মাপ হুবহু মিলে গেল। ব্রুয়ে নিজের জুতা ধার দিলেন।
সেই ধার করা জুতা পায়ে দিয়ে জাস্ট ফন্টেইন নামলেন বিশ্বকাপে।
গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই প্যারাগুয়ের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক, ফ্রান্স জিতল ৭-৩ ব্যবধানে। পরের ম্যাচে যুগোস্লাভিয়ার বিপক্ষে চতুর্থ মিনিটে এবং ৮৫তম মিনিটে আরও ২ গোল। ম্যাচে ফ্রান্সের গোল ওই দুটিই। এরপর স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে একটি, উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে দুটি আর সেমিফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে একটি গোল।
সেমিফাইনালে জিততে পারেনি ফ্রান্স। হেরে যায় ৫–২ গোলে। এরপর এল তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ।
গুটেনবার্গে পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে সেদিন ফন্টেইনের শরীরে যেন অন্য কোনো শক্তি ভর করেছিল। ১৬ মিনিটে প্রথম গোল, ৩৬ মিনিটে দ্বিতীয়। বিরতির পর আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠেন তিনি। ৭৮ ও ৮৯ মিনিটে আরও ২ গোল। নামের সঙ্গে আরেকটা গোলও যোগ হতে পারত, যদি ২৭ মিনিটে পাওয়া পেনাল্টির সুযোগটা সতীর্থ কোপাকে না দিয়ে নিজেই নিতেন। কিন্তু ম্যাচে ৫ গোল না হলে কী হবে, এর মধ্যেই ইতিহাস গড়া হয়ে গেছে।
৬ ম্যাচে ১৩ গোল—ফন্টেইনকে কাঁধে তুলে নিলেন সতীর্থরা। বিশ্বকাপ এর আগেও হয়েছে, পরেও হয়েছে। কিন্তু ফুটবল দুনিয়া আর কখনো এক আসরে এত বেশি গোল দেখেনি!
এত বড় কীর্তির পরও ফন্টেইনের হাতে ওঠেনি কোনো গোল্ডেন বুট। এক বিশ্বকাপে ১৩ গোলের ওজন কত বেশি, সেটি তখনো ঠিকঠাক টেরই পাননি তিনি। পাবেন কী করে, টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোল করা যে বিশেষ কিছু—এই ব্যাপারটাই ওই সময় ফিফা ভাবত না।
২০০৬ সালে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফন্টেইন বলেছিলেন, ‘আমি শুধু একটা রাইফেল পেয়েছিলাম। একটা সুইডিশ সংবাদপত্র দিয়েছিল সেরা শিকারির প্রতীক হিসেবে।’
অবশ্য ৫৬ বছর পর স্বীকৃতির একটা স্মারক তিনি পেয়েছিলেন। ২০১৪ বিশ্বকাপের সময় ফন্টেইনের হাতে একটা ‘প্লাটিনাম বুট’ দিয়েছিল ফিফা।
বছরের পর বছর ধরে ফন্টেইন এই জুতার গল্পটি বলতেন হেসে হেসে। মজা করে বলতেন, ‘আমার গোলগুলো আসলে একটি জুতার ভেতরে দুটি মনের মিলনে অনুপ্রাণিত হয়েছিল।’
নিজের গড়া বিশ্বকাপ রেকর্ডটি ২০২২ সাল পর্যন্ত অক্ষত থাকতে দেখেছেন তিনি। পেলে, গারিঞ্চা, ম্যারাডোনা, রোনালদো, ক্লোসা, মেসি, এমবাপ্পে—অনেকে বিশ্বকাপকে শাসন করেছেন, কিন্তু এক আসরে ১৩ গোলের চূড়ায় আর কেউ উঠতে পারেননি।
২০২৩ সালের মার্চে পৃথিবী ছেড়ে গেছেন জাস্ট ফন্টেইন। জেনে গেছেন, বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখনো এক জোড়া ধার করা বুট দৌড়ে বেড়ায়। তার নাম—জাস্ট ফন্টেইন।