আর্জেন্টিনা–ইংল্যান্ড সেমিফাইনাল আজ
যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়, কিন্তু কিছু যুদ্ধ কখনো শেষ হয় না।
সেগুলো মানচিত্রে বেঁচে থাকে না, বেঁচে থাকে মানুষের স্মৃতিতে। পুরোনো সংবাদপত্রের হলদে পাতায়, বাবার মুখে শোনা গল্পে কিংবা ফুটবল স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে হঠাৎ উঠে আসা কোনো স্লোগানে। চার দশকের বেশি সময় আগে দক্ষিণ আটলান্টিকের ঠান্ডা সমুদ্রে যে কামানের শব্দ থেমে গিয়েছিল, তার ক্ষীণ প্রতিধ্বনি আজও মাঝেমধ্যে ভেসে আসে ফুটবলের সবুজ ঘাসে।
তাই আটলান্টার এই ম্যাচকে শুধু বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল বলা যায় না। এটা শুধু দুই দলের লড়াই নয়, দুই ইতিহাসেরও।
বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১টায় ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হবে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে। বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা চাইছে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের পথে আরেকটি ধাপ পেরোতে। ইংল্যান্ড চাইছে ১৯৬৬ সালের পর প্রথমবারের মতো আবার বিশ্বকাপ ফাইনালে উঠতে। কিন্তু ম্যাচটা যতই কাছে এসেছে, আলোচনা শুধু লিওনেল মেসি, হ্যারি কেইন, জুড বেলিংহাম কিংবা কৌশল নিয়ে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ফিরে এসেছে ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ, ১৯৮৬ সালের সেই আজতেকার বিকেল, ‘হ্যান্ড অব গড’, শতাব্দীর সেরা গোল আর দুই দেশের এমন এক ফুটবল ইতিহাস, যার প্রতিটি অধ্যায়ে আবেগের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।
লিওনেল স্কালোনি অবশ্য এই আগুনে আর ঘি ঢালতে চান না। আর্জেন্টিনা কোচের কণ্ঠে বরং শান্তির সুর, ‘এটা একটা ফুটবল ম্যাচ। আমি এটুকুই বলতে পারি।’
কিন্তু সবাই কি এত সহজে পারে? ডিয়েগো ম্যারাডোনার ছেলে পারেননি। বাবার নামের ভারী উত্তরাধিকার বয়ে বেড়ানো ম্যারাডোনা জুনিয়র স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, ‘আমার বাবা এটাকে সাধারণ ম্যাচ ভাবতেন না। এই ম্যাচ মনে করিয়ে দেয়, ফকল্যান্ডের যুদ্ধ আর সেখানে মারা যাওয়া আমাদের ভাইদের কথা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোনো ম্যাচই আর স্বাভাবিক হতে পারে না।’
ম্যারাডোনা নেই। তবু তাঁর ছায়া যেন আগেই ঢুকে পড়েছে আটলান্টা স্টেডিয়ামের করিডরে।
ইংল্যান্ড অবশ্য সেদিকে কান না দেওয়ার ভান করছে। এই দলের সব ফুটবলারের জন্মই ১৯৮৬ সালের অনেক পরে। জুড বেলিংহাম, বুকায়ো সাকা কিংবা অ্যান্থনি গর্ডনদের কাছে ম্যারাডোনা ইতিহাসের বইয়ের চরিত্র। কিন্তু ইংল্যান্ডের ড্রেসিংরুমেও বোঝা যাচ্ছে, তারা জানে এই ম্যাচের ওজন শুধু ৯০ মিনিটের নয়।
লিওনেল মেসি কোনো দিন ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেননি। ১৯ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ২০৫টি ম্যাচ আর ১২৫ গোলের পরও একটা প্রতিপক্ষ তাঁর কাছে এখনো অচেনা রয়ে গেছে। ৩৯ বছর বয়সে, ক্যারিয়ারের গোধূলিবেলায় এসে সেই অচেনা সীমানা পেরোতে চলেছেন তিনি। নিজেই বলেছেন, ‘ইংল্যান্ড ছাড়া সবার বিপক্ষে খেলেছি আমি। এটা বিশেষ। কারণ, ওরা একটা শক্তিশালী দল। বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এমন দলের বিপক্ষে খেলাটা বিশেষ ব্যাপার।’
ম্যাচ সামনে রেখে করা ইংল্যান্ডের সংবাদ সম্মেলনে দলের গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ডকে যতবার প্রশ্ন করা হয়েছে, ততবারই ঘুরে এসেছে মেসির কথা। তিনি বলে গেছেন, ‘সবাই মেসির কথাই বলবে। কারণ, সে ইতিহাসের অন্যতম সেরা। কিন্তু শুধু মেসিকে নিয়ে ভাবলে ভুল হবে। আর্জেন্টিনা বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন শুধু মেসির জন্য নয়, পুরো দলটাই অসাধারণ।’
এ কথার মধ্যে সতর্কতা আছে, আবার আত্মবিশ্বাসও। কারণ, আর্জেন্টিনাকে শুধু একজন মানুষের গল্প বানিয়ে ফেললে আসলেই বিপদ। এই বিশ্বকাপে মেসি অবশ্য নিজের মতো করেই গল্প লিখে চলেছেন। ৮ গোল করেছেন। ৩৯ বছর বয়সে দাঁড়িয়ে তিনি যেন সময়কে বোঝাতে চাইছেন, বয়স শুধু জন্মসনদের একটি সংখ্যা।
আর্জেন্টিনা অবশ্য বয়স্কদেরই দল। স্কোয়াডের গড় বয়স ৩০ ছুঁই ছুঁই, কিন্তু সেটা বেঞ্চে থাকা তরুণদের কারণে। মাঠে স্কালোনি যাঁদের খেলাচ্ছেন, তাঁরা বেশির ভাগই ৩০ পেরোনো, যাঁদের শরীরে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। নকআউট পর্বের দুটি ম্যাচেই অতিরিক্ত সময় খেলতে হয়েছে। কেপ ভার্দে, মিসর, সুইজারল্যান্ড—প্রতিটি জয় যেন একটু একটু করে শক্তি শুষে নিয়েছে।
অন্য পাশে ইংল্যান্ড তুলনায় তরুণ, গড় বয়স মাত্র ২৬.৬। তাদের শরীরে গতি বেশি, কিন্তু অভিজ্ঞতা কম। ফুটবলের ইতিহাস অবশ্য বলে, সেমিফাইনালগুলো শুধু পায়ের শক্তিতে জেতা যায় না। সেখানে মাথার ভেতরের ঝড়ও সামলাতে হয়।
কখনো বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে না হারা আর্জেন্টিনা চার বিশ্বকাপে তৃতীয়বারের মতো ফাইনালে উঠতে চায়। সেখানে উঠেও জিতে গেলে ১৯৬২ সালের ব্রাজিলের পর প্রথম দল হিসেবে বিশ্বকাপ ধরে রাখার কীর্তি হবে। ইংল্যান্ড চাইছে আরেকটি বিশ্বকাপের জন্য ছয় দশকের অপেক্ষার অবসান। দুই স্বপ্ন পাশাপাশি হাঁটছে, একটার শেষ মানেই আরেকটার এগিয়ে যাওয়া।
এর মধ্যে আবার আর্জেন্টিনার নীল জার্সি নিয়েও আলোচনা চলছে। সেমিফাইনালে ওঠার পরই ফিফার কাছে নীল জার্সি পরে খেলার অনুমতি নিয়েছে তারা। যে রং দেখলেই আর্জেন্টাইনদের অনেকের মনে পড়ে যায় ১৯৮৬ সালের আজতেকা স্টেডিয়াম। ম্যারাডোনার দুই গোল। একটিতে ঈশ্বরের হাত, আরেকটিতে মানুষের পায়ের সবচেয়ে অলৌকিক শিল্প। রঙেরও যে স্মৃতি থাকে, এই ম্যাচ আবার মনে করিয়ে দিচ্ছে।
তবে ইতিহাস কখনো গোল করে না, গোল করতে হয় বর্তমানকে। বেলিংহামের দুরন্ত ফর্ম, হ্যারি কেইনের অভিজ্ঞতা, পিকফোর্ডের আত্মবিশ্বাস—সব মিলিয়ে ইংল্যান্ড নিজেদের প্রস্তুত বলেই বিশ্বাস করছে। অন্যদিকে মেসির সেই পরিচিত স্থির চোখ, স্কালোনির নীরব আত্মবিশ্বাস, হুলিয়ান আলভারেজ আর লাওতারো মার্তিনেজের দৌড়—আর্জেন্টিনাও জানে, ইতিহাসের পাতায় নতুন লাইন যোগ করার সুযোগ প্রতিদিন আসে না।
শেষ পর্যন্ত হয়তো জয়ী হবে একটি দল, ফাইনালে যাবে একটি পতাকা। কিন্তু আজকের রাতের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হয়তো স্কোরলাইন নয়। দেখা, ইতিহাসের দীর্ঘ ছায়া থেকে কে আগে পেরিয়ে আসতে পারে।
কারণ, কিছু ম্যাচ শুধু জেতার জন্য খেলা হয়। আর কিছু ম্যাচ খেলা হয় স্মৃতির সঙ্গে বোঝাপড়া করার জন্য।