‘বি’ গ্রুপে থাকা দলটির বিশ্বকাপ মিশন শুরু হচ্ছে আজ
‘বি’ গ্রুপে থাকা দলটির বিশ্বকাপ মিশন শুরু হচ্ছে আজ

এক দেশের জার্সি, ড্রেসিংরুমে অন্য দেশের ভাষা, বিশ্বকাপের ‘অদ্ভুত’ এক দল সুইজারল্যান্ড

আল্পস পর্বতের বরফঢাকা চূড়া আর নিখুঁত ঘড়ির দেশ সুইজারল্যান্ডের ফুটবল দলটা আসলে কেমন? উত্তরটা লুকিয়ে ঠিক এক দশক আগের এক ঐতিহাসিক বাস্তবতায়।

২০১৬ ইউরোতে আলবেনিয়ার মুখোমুখি হয়েছিল সুইজারল্যান্ড। ম্যাচের আগে যখন দুই দেশের জাতীয় সংগীত বাজছিল, গ্যালারির হাজার হাজার দর্শক তখন কাঁপছিলেন এক অদ্ভুত রোমাঞ্চে। কারণ, মাঠের দুই প্রান্তে দুই ভাই—গ্রানিত জাকা সুইজারল্যান্ডের লাল জার্সিতে, তাঁর ভাই তাউলান্ত জাকা আলবেনিয়ার জার্সিতে।

সেদিন গ্যালারিতে তাঁদের মায়ের বসার আসনটি ছিল একদম মাঝামাঝি, যাঁর এক পাশে সুইজারল্যান্ডের ক্রস আর অন্য পাশে আলবেনিয়ার ইগল আঁকা। দৃশ্যটি স্রেফ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, আধুনিক সুইস ফুটবলের আসল চালিকাশক্তির বড় উদাহরণও।

সুইসরা রাতারাতি পরাশক্তি হয়ে ওঠেনি; বরং ধীরে ধীরে বড় হয়েছে বহু সংস্কৃতির অসাধারণ মেলবন্ধনে। আশি ও নব্বইয়ের দশকে বলকান অঞ্চলের যুদ্ধ এবং আফ্রিকার রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে বাঁচতে হাজার হাজার মানুষ সুইজারল্যান্ডে আশ্রয় নেন।

সেই অভিবাসীদের দ্বিতীয় প্রজন্মই আজকের সুইস ফুটবলের মেরুদণ্ড।
একসময় ফুটবল মাঠে তাঁদের ভাবা হতো কিছুটা রক্ষণশীল বা একঘেয়ে, এখন তাঁদের জাতীয় দল দেশটির বৈচিত্র্যের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন।

গ্রানিত জাকা বা ব্রিল এম্বোলোদের গল্প যেন কোনো হলিউডি স্পোর্টস ড্রামার মতো; যেখানে নায়কেরা জীবনের সব প্রতিকূলতা পেরিয়ে এসে এক অচেনা পতাকাকে ভালোবেসে ফেলেন এবং সেই দেশেরই নায়ক বনে যান।

ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ১৯ নম্বরে থাকা সুইজারল্যান্ড এবারের আগে বিশ্বকাপ খেলেছে ১২ বার

দলের ফরোয়ার্ড ব্রিল এম্বোলোর কথাই ধরা যাক। ক্যামেরুনের ইয়াউন্ডেতে জন্ম নেওয়া ছেলেটি মায়ের হাত ধরে মাত্র ছয় বছর বয়সে ফ্রান্সে এবং পরে সুইজারল্যান্ডে পাড়ি জমান। বাসেলে তাঁর ফুটবলার হয়ে ওঠার গল্প যেকোনো ফুটবল রোমান্টিককে মুগ্ধ করবে।

গত বিশ্বকাপে যখন এম্বোলো নিজের জন্মভূমি ক্যামেরুনের জালেই বল জড়ান, তখন তাঁর উদ্‌যাপনে কোনো বুনো উল্লাস ছিল না, ছিল এক পরম শ্রদ্ধা ও নীরবতা। নিজের শিকড়কে সম্মান জানিয়ে বর্তমান স্বদেশের প্রতি শতভাগ উজাড় করে দেওয়া—এটাই তো সুইজারল্যান্ডের ফুটবল সংস্কৃতির সৌন্দর্য।

শুধু এম্বোলোই নন, সুইজারল্যান্ডের বর্তমান দলের অর্ধেকের বেশি খেলোয়াড় বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক আবহ থেকে আসা। এঁদের মধ্যে গোলরক্ষক ইভন এমভোগোর জন্ম ক্যামেরুনে। ফরোয়ার্ড নোয়া ওকাফোর নাইজেরিয়ান এবং দেনিস জাকারিয়া কঙ্গো ও দক্ষিণ সুদানের মিশ্র শিকড় থেকে এসেছেন।

সুইজারল্যান্ডের বর্তমান দলের অর্ধেকের বেশি খেলোয়াড় বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক আবহ থেকে আসা

রক্ষণভাগের মূল ভরসা রিকার্দো রদ্রিগেজের পরিবার স্পেন ও চিলির, আর ফরোয়ার্ড রুবেন ভারগাস ডোমিনিকান রিপাবলিক বংশোদ্ভূত। সে জন্য তাঁদের ড্রেসিংরুমে কান পাতলে আপনি একসঙ্গে ফ্রেঞ্চ, জার্মান, ইতালিয়ান এবং আলবেনিয়ান ভাষার শব্দও শুনতে পাবেন।

ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি থেকে আসা এই ফুটবলাররা যখন একসঙ্গে মাঠে নামেন, তখন তাঁদের ইউরোপীয় ট্যাকটিক্যাল ডিসিপ্লিনের সঙ্গে যুক্ত হয় লাতিন আমেরিকার ড্রিবলিংয়ের ছোঁয়া কিংবা আফ্রিকান ফুটবলের চিতা বাঘের মতো গতি।

সুইজারল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন খুব চতুরতার সঙ্গে এই মিশ্রণকে তাদের শক্তিতে রূপান্তর করেছে। তারা অভিবাসী তরুণদের শুধু ফুটবলার বানায়নি, দিয়েছে এক নতুন পরিচয়।

বিশ্বমঞ্চেও সেই প্রমাণ রাখছেন সুইসরা। ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ১৯ নম্বরে থাকা দলটি এবারের আগে বিশ্বকাপ খেলেছে ১২ বার; যার মধ্যে তিনবার খেলেছে কোয়ার্টার ফাইনালে। এবারও নতুন কোনো চমক দেখানোর অপেক্ষায় তারা।

‘বি’ গ্রুপে থাকা দলটির বিশ্বকাপ মিশন শুরু হচ্ছে আজ। সান ফ্রান্সিসকোতে নিজেদের প্রথম ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ কাতার। র‍্যাঙ্কিংয়ে যাদের অবস্থান ৫৬ নম্বরে। অভিজ্ঞতার পাল্লাও একেবারে হালকা; এবারের আগে কাতার বিশ্বকাপ খেলেছে মাত্র একবার—সেটা ২০২২ সালে নিজেদের মাঠে।