পর্তুগাল ফুটবল দল
পর্তুগাল ফুটবল দল

যে ১০ কারণে এবার বিশ্বকাপ জিততে পারেন রোনালদো

পর্তুগাল বিশ্বকাপের বিমান ধরেছে বেশ দেরিতে, টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র এক দিন আগে। অন্য দলগুলো যখন বিশ্বকাপের মাঠে নেমে পড়ার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ছিল, পর্তুগাল তখনো লিসবনে নিজেদের গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত। সব বক্সে টিক মার্ক দিয়েই হয়তো দেশ ছাড়তে চেয়েছে রবার্তো মার্তিনেজের দল।

বিশ্বমঞ্চে এবার ‘হেভিওয়েট’ তকমা নিয়েই হাজির হচ্ছে পর্তুগাল। টানা ছয়টি বিশ্বকাপে অংশ নিলেও এবার ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো পাশে পাচ্ছেন এমন একঝাঁক তরুণ ও চটপটে ফুটবলার, যা তাঁর ক্যারিয়ারে আগে কখনো ঘটেনি। ৪১ বছরে এসে প্রথম বিশ্বকাপ ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্নে বিভোর পর্তুগিজ যুবরাজ।

প্রথমবার বিশ্বজয়ের যে স্বপ্ন পর্তুগিজরা দেখছে, সেটা যে অযৌক্তিক নয়, তা বোঝা যাবে এই কারণগুলো পড়লেই।

দারুণ ফুলব্যাক জুটি

পর্তুগালের রক্ষণের দুই পাশ আগলে রাখার দায়িত্বে থাকছেন নুনো মেন্দেস ও জোয়াও কানসেলো। আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা ফুলব্যাক জুটি বললে একটুও বাড়িয়ে বলা হবে না। রক্ষণ সামলে বল পায়ে গতি বাড়িয়ে ওপরে ওঠা কিংবা প্রতিপক্ষের উইং ভেঙে ঢুকে পড়ায় তাঁদের জুড়ি মেলা ভার। অবশ্য প্রস্তুতি ম্যাচে রবার্তো মার্তিনেজ পরখ করে দেখেছেন দিয়োগো দালোত ও নেলসন সেমেদো জুটিকেও। ব্যাকআপ হিসেবে তাঁরাও পাস মার্ক পেয়ে গেছেন। ফলে পুরো বিশ্বকাপে দুই প্রান্ত থেকে পর্তুগালের মুহুর্মুহু আক্রমণ দেখার অপেক্ষায় থাকতে পারে ফুটবল–বিশ্ব।

নুনো মেন্দেস

উইংয়ে ছড়ানো রোমাঞ্চের বারুদ

উইং দিয়ে যখন আক্রমণের ঝড় উঠবে, তার ঠিক সামনেই প্রতিপক্ষের বক্সে কাঁপন ধরাতে প্রস্তুত থাকবেন উইঙ্গাররা। পেদ্রো নেতো, রাফায়েল লিয়াও, ফ্রান্সিসকো কনসেইসাও, জোয়াও ফেলিক্স, ফ্রান্সিসকো ত্রিনকাও—ফুটবল–দুনিয়ার অন্যতম রোমাঞ্চকর উইং আক্রমণভাগ এটি। প্রত্যেকেই ক্লাব ফুটবলে নিজেদের দলের প্রধান তারকা, যাঁরা মুহূর্তের জাদুতে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন। গোল করা কিংবা গোল করানো—দুই বেলাতেই সমান দক্ষ এই উইঙ্গাররা। মার্তিনেজ যদি ডাগআউট থেকে এই তাসগুলো ঠিকঠাক চালতে পারেন, প্রতিপক্ষের কপালে দুঃখ আছে।

প্যারিসের রসায়ন বা ‘পিএসজি কানেকশন’

দুবারের চ্যাম্পিয়নস লিগজয়ী পিএসজি যেন বদলে দিয়েছে পর্তুগাল দলের ভেতরের সমীকরণ। বিশ্বকাপের ঠিক আগ মুহূর্তে ফরাসি ক্লাবটির জার্সিতে মাঠ মাতাচ্ছেন পর্তুগালের চার তারকা। মাঝমাঠের দুই ভরসা ভিতিনিয়া আর নেভেস তো আছেনই, তাঁদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন গনসালো রামোস ও নুনো মেন্দেস। বিশ্বকাপ জেতার অঙ্কে যেমন কৌশল লাগে, তেমনই লাগে বোঝাপড়া। ২০১০ সালের স্পেন বা ২০১৪ সালের জার্মানি এর সেরা উদাহরণ; যাদের মূল শক্তির ভিত ছিল বার্সেলোনা আর বায়ার্ন মিউনিখের খেলোয়াড়দের পারস্পরিক রসায়ন। এবার সেই চেনা সুরটাই মার্তিনেজ খুঁজে পাচ্ছেন পিএসজি কানেকশনে।

পর্তুগাল মিডফিল্ডার ভিতিনিয়া

মাঝমাঠের দুই জাদুকর: ভিতিনিয়া-নেভেস

ভিতিনিয়া ও জোয়াও নেভেস জুটি দুই মৌসুম ধরে ইউরোপিয়ান ফুটবলের মাঝমাঠ শাসন করছেন। নেভেস যখন নিখুঁত ছন্দে ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করেন এবং প্রতিপক্ষের আক্রমণগুলো অঙ্কুরেই বিনষ্ট করেন, তখন ভিতিনিয়ার দূরদর্শী পাসিং দলকে এনে দিতে পারে কাঙ্ক্ষিত লিড। আবার দুজনই ড্রিবলিংয়ের দক্ষতায় প্রতিপক্ষ রক্ষণকে ঘোল খাওয়াতে ওস্তাদ। পার্ক দে প্রিন্সেসের সেই চেনা সুর যদি বিশ্বকাপের মঞ্চেও বেজে ওঠে, তবে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া পর্তুগালের জন্য সময়ের ব্যাপার মাত্র।

গোলবারের নিচে এক বিশ্বস্ত দেয়াল

কাগজে-কলমে পর্তুগাল দলের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনের নাম ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো হলেও এই দলের আসল ত্রাতা কিন্তু গোলরক্ষক দিয়োগো কস্তা। পোর্তোর হয়ে খেলা ২৬ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক ক্লাব ফুটবলে হয়তো খুব বড় আলো কাড়েননি, কিন্তু জাতীয় দলের জার্সিতে তিনি এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। ২০২৪ ইউরোতে টাইব্রেকারে তিনটি শট রুখে দেওয়া কিংবা ২০২৫ নেশনস লিগের ফাইনালে আলভারো মোরাতার পেনাল্টি থামিয়ে দেওয়া—কস্তার ঠান্ডা মাথার কীর্তি ফুটবলপ্রেমীদের মনে থাকার কথা। এই বিশ্বকাপেও পর্তুগিজদের আশা-ভরসা বেঁচে থাকবে তাঁর বিশ্বস্ত গ্লাভসেই।

প্রয়াত দিয়োগো জোতা

এক অদৃশ্য যোদ্ধা এবং ওয়ান-ম্যান আর্মি

দিয়োগো জোতার আকস্মিক মৃত্যু ফুটবল–দুনিয়াকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। পর্তুগিজ সমর্থকেরা যখন তাঁর চোখে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনছিলেন, তখনই এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা কেড়ে নেয় তাঁকে। প্রতিটি দল যখন ২৬ জনের স্কোয়াড ঘোষণা করেছে, পর্তুগাল সেখানে ব্যতিক্রম—তারা দল সাজিয়েছে ২৭ জনের। দলের সেই ২৭ নম্বর নামটি ফুটবলার দিয়োগো জোতা। দেশ ছাড়ার আগে কোচ রবার্তো মার্তিনেজ আবেগময় কণ্ঠে বলে গেছেন, ‘জোতা আমাদের অনুপ্রেরণা, আমাদের শক্তি। ও সব সময় চাইত পর্তুগাল বিশ্বকাপ জিতুক। আমরা ওর সেই অপূর্ণ স্বপ্নটাই এবার পূরণ করতে যাচ্ছি।’

এক পজিশন, বহু রূপ

বিশ্বকাপের স্কোয়াড গড়া হয় চোট বা কম্বিনেশনের ব্যাকআপ মাথায় রেখে। কিন্তু পর্তুগালের এবারের দলটা একটু অন্য ধাতুতে গড়া। প্রতিটি পজিশনে শুধু যোগ্য বিকল্পই নেই, বরং এমন কিছু ‘ভার্সেটাইল’ খেলোয়াড় আছেন, যাঁরা একাধিক পজিশনে সমান কার্যকর। ডানে খেলা ফুটবলার যেমন স্বচ্ছন্দে বাঁয়ে খেলতে পারেন, তেমনই মাঝমাঠের তারকারাও রূপ বদলাতে পারেন মুহূর্তে। যেমন বের্নার্দো সিলভা; তিনি ডান উইংয়ে খেলতে পারেন, আবার মাঝমাঠে প্লেমেকারের ভূমিকাও নিতে পারেন। পেদ্রো নেতো কিংবা জোয়াও ফেলিক্সও আক্রমণের যেকোনো প্রান্তে খেলতে অভ্যস্ত। মার্তিনেজের কাছে তাই কৌশল বদলানোর চালগুলো সব সময়ই তৈরি থাকছে।

পর্তুগালের মিডফিল্ডার ব্রুনো ফার্নান্দেজ

সুরকার ব্রুনো ফার্নান্দেজ

পর্তুগাল দলের সুর আর ছন্দ পুরোটাই নির্ভর করছে ব্রুনো ফার্নান্দেজের ওপর। অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে মাঝমাঠ আর আক্রমণের ভেতরের শূন্যতা পূরণের কাজটি তিনি বছরের পর বছর ধরে নিখুঁতভাবে করছেন। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের এই মিডফিল্ডারের ওপর কোচ মার্তিনেজের ভরসা এতটাই অগাধ যে পুরো দলটার কৌশল সাজানো হয়েছে তাঁকে কেন্দ্র করেই। ব্রুনোর পা সচল থাকলে পর্তুগালের আক্রমণের ধার সামলানো যেকোনো ডিফেন্সের জন্যই কঠিন হবে।

ডাগআউটে রবার্তো মার্তিনেজ

বেলজিয়ামের ‘স্বর্ণযুগ’কে কোচিং করিয়েও কোনো ট্রফি এনে দিতে পারেননি এই স্প্যানিশ মাস্টারমাইন্ড। সর্বোচ্চ অর্জন ছিল বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। এবার তাঁর কাঁধে পর্তুগালের দায়িত্ব। রোনালদোদের নিয়ে মার্তিনেজের যাত্রাটা শুরু হয়েছিল টানা ১০ জয় দিয়ে। মাঝে নতুন কৌশল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে গিয়ে ছন্দ হারিয়েছিলেন, সমর্থকদের মনেও দানা বেঁধেছিল সংশয়। তবে বিশ্বকাপ ঘনিয়ে আসতেই মার্তিনেজ ফিরেছেন তাঁর চেনা ও সফল কৌশলে। পর্তুগালও এখন ফর্মের তুঙ্গে, যার প্রমাণ তাদের পকেটে থাকা ২০২৫ নেশনস লিগের শিরোপা। এবার শুধু বিশ্বমঞ্চে প্রমাণের পালা। সব ঠিক থাকলে প্রথম ‘বিদেশি’ কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস গড়তেই পারেন মার্তিনেজ।

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো

মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়: রোনালদোর শেষ বাজি

চল্লিশের কোটা পার করেছেন বেশ আগেই। ক্যারিয়ারে হাজার গোলের অবিশ্বাস্য মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর জন্য এটাই সম্ভবত শেষ সুযোগ। ফুটবল–বিধাতা হয়তো তাঁর হাতে শেষবারের মতো ট্রফিটি তুলে দেওয়ার মঞ্চ তৈরি করেছেন। পাশে একঝাঁক দুর্দান্ত তরুণ তুর্কি, গত দুই দশকের মধ্যে কাগজে-কলমে এটাই পর্তুগালের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ও শক্তিশালী দল। এই দলটিকে নিয়ে সোনালি ট্রফিটা উঁচিয়ে ধরতে রোনালদো তাঁর সর্বস্ব উজাড় করে দেবেন, এটাই স্বাভাবিক। কোচ মার্তিনেজও তাঁর রণকৌশলের কেন্দ্রে রাখছেন এই মহাতারকাকে। লিসবনের যুবরাজের শেষ বাজি যদি সফল হয়, তবে ফুটবল ইতিহাস পাবে তার সবচেয়ে রোমান্টিক সমাপ্তি।