ডাগআউট থেকে

ফ্রান্সের জন্য চ্যালেঞ্জ হাকিমি-দিয়াজরা

শেষ ১৬-এর টানটান উত্তেজনা শেষ। বাংলাদেশ সময় আজ রাত দুইটায় ফ্রান্স বনাম মরক্কো ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে কোয়ার্টার ফাইনালের লড়াই। ফুটবলপ্রেমী সবার চোখ এখন এ ম্যাচের দিকে। কাগজ-কলমের বিশ্লেষণে অবশ্যই এগিয়ে ফ্রান্স। কেন এগিয়ে, তা একটু গভীরভাবে তাকালেই পরিষ্কার হয়ে যায়। এবারের বিশ্বকাপে ফ্রান্সের ফরমেশন মূলত ৪-২-৩-১। তবে তা ম্যাচের মধ্যে বদলেও যায়। ফ্রান্সের আক্রমণ ও রক্ষণে ফরমেশনের শেপও বদলাতে দেখা যায়। ফ্রান্সের খেলার কৌশল সবচেয়ে বেশি ভারসাম্যপূর্ণ। তাদের একাদশের খেলোয়াড়েরা মাঠের পারফরম্যান্সে দারুণ ধারাবাহিক।

পরিসংখ্যান বলছে, এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত মরক্কোর বল পজেশন ৫৯ শতাংশ, যেখানে ফ্রান্সের ৫৫। তবে ফ্রান্সের বল পজেশন নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের ভিত্তিতে। অযথা বল ধরে না রেখে তারা পরিকল্পনা সাজায়। আরেকটি বিষয় হলো গোল হতে পারত, এমন পরিস্থিতি মরক্কোর চেয়ে ফ্রান্স কম তৈরি করেছে শেষ ১৬ পর্যন্ত। সুযোগ কম তৈরি করলেও গোল করার হারে ফ্রান্স এগিয়ে। এর মূল কারণ ফরাসিদের নিখুঁত ফিনিশিং। সঙ্গে যোগ হয়েছে তাদের দ্রুত আক্রমণাত্মক ট্রানজিশন, যা যেকোনো দলের জন্যই বিপদের কারণ।

শেষ আট দলের মধ্যে রক্ষণ থেকে আক্রমণে যাওয়ার গতি ফ্রান্সেরই সবচেয়ে দ্রুত ও কার্যকর। উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে বা কিলিয়ান এমবাপ্পেদের নিয়ে গড়া তাদের আক্রমণভাগ এককথায় বিধ্বংসী। বিশেষ করে তাদের প্লে-মেকার ওলিসে ৫টি অ্যাসিস্ট করে এখন পর্যন্ত তালিকার শীর্ষে আছেন। শুধু আক্রমণ নয়, রক্ষণেও ফ্রান্স দুর্দান্ত। এখন পর্যন্ত পাঁচ ম্যাচে মাত্র ২টি গোল হজম করেছে দিদিয়ের দেশমের দল। মূলত ফ্রান্সের দুই সেন্ট্রাল ব্যাক দায়োত উপামেকানো ও উইলিয়াম সালিবার বোঝাপড়া এবং ম্যাচের পুরোটা সময় তাঁদের মনঃসংযোগ ফ্রান্সকে বাড়তি সুরক্ষা দিচ্ছে।

অন্যদিকে মরক্কোর বল পজেশন মাঝেমধ্যে লক্ষ্যহীন ও মাঝমাঠেই বেশি সীমাবদ্ধ থাকে। তবে মরক্কোর রাইট ব্যাক আশরাফ হাকিমি ও রাইট উইঙ্গার ব্রাহিম দিয়াজের মধ্যে ডান পাশের সমন্বয়টা ফ্রান্সের জন্য বিপদের কারণ হতে পারে। এই দুজন যেকোনো কিছু করতে পারেন ম্যাচে আর সেটা মরক্কোর জন্য বড় আশার জায়গাও। ফ্রান্সের কাজ হবে এই দুজনের সমন্বয়টা ভাঙা, সেটি না পারলে ফ্রান্সকে ভুগতে হতে পারে।

মরক্কো এবারের বিশ্বকাপটা শুরু করেছিল ব্রাজিলের মতো দলের সঙ্গে ১–১ গোলের ড্র দিয়ে। দলটি সেভাবে লো-ব্লকে না খেললেও এই কৌশলে তারা বেশ দক্ষ। ফ্রান্সের ফুল-ব্যাকরা যখন ওপরে উঠে খেলবেন, তখন মরক্কো যদি লো-ব্লক থেকে দ্রুত প্রতি আক্রমণে যায়, তাহলে বড় সুযোগ তৈরি হতে পারে ফ্রান্সের রক্ষণে। তবে মরক্কোর জন্য বড় দুশ্চিন্তা ইসমায়েল সাইবারির হ্যামস্ট্রিং ইনজুরি, তিনি খেলতে না পারলে মরক্কোর বিল্ডআপ প্লে-তে সমস্যা হতে পারে।

ফ্রান্স শিবিরে মিডফিল্ডার অরেলিয়াঁ চুয়ামেনির চোট আছে। তাঁর জায়গায় যিনি খেলবেন, তিনি চুয়ামেনির মতো রক্ষণাত্মক সুরক্ষা দিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে আমার সংশয় আছে। মরক্কো সাধারণত রক্ষণে থাকে নিখুঁত ৪-৫-১ ব্লকে। সব মিলিয়ে জয়ের সম্ভাবনায় আমি ফ্রান্সকে ৫৫-৪৫ শতাংশে এগিয়ে রাখব।

তার মানে আমি ফ্রান্সের সেমিফাইনাল খেলার সম্ভাবনাই বেশি দেখছি। অন্য তিন সম্ভাব্য সেমিফাইনালিস্ট নিয়ে এখনই অনুমান করা কঠিন, তবে ঝুঁকি থাকলেও আমি তিনটি নাম বলবস্পেন, ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। ধারে–ভারে এই তিন দলই প্রতিপক্ষের চেয়ে এগিয়ে। মাঠে নিজেদের সেরাটা দিতে পারলে স্পেন বলুন, ইংল্যান্ড বলুন বা আর্জেন্টিনা...তিন দলই শেষ চারে যেতে পারে।

তবে সব সময়ই কাগজ–কলমের হিসাব মেলে না। নির্দিষ্ট দিনের পারফরম্যান্সই আসল। আর সেটা মাথায় রেখেই বলব, এবারের বিশ্বকাপের যেভাবে তথাকথিত পিছিয়ে থাকা দলগুলো লড়াই করছে, সম্ভাব্য শিরোপাপ্রত্যাশীদের ঘাম ছুটিয়ে দিচ্ছে, তাতে ফলও যেকোনো দিকে যেতে পারে। সেমিফাইনালে কোন চারটি দল আসবে, তা নিয়ে আমার অনুমান যে বদলাবে না, সেই নিশ্চয়তা কিন্তু নেই। মাঠের লড়াইয়ে কী ঘটবে, তা বলবে সময়ই। তবে আপাতত কাগজ–কলমের ফেবারিটদের দিকেই আমার ভোট।

লেখক: ফুটবল কোচ ও বিশ্লেষক