বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলা নিয়ে কী হবে আইসিসির আজকের সভায়

কাল রাতেও মনে হচ্ছিল আশা ছেড়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। এবার টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ হবে বাংলাদেশকে ছাড়া—এমন আনুষ্ঠানিক ঘোষণার অপেক্ষাতেই যেন ছিল তারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বোর্ড পরিচালক এই প্রতিবেদককে বলছিলেন, ‘এখান থেকে আমি আর কোনো আশা দেখি না। আমরা আমাদের অবস্থান থেকে নড়ব না, আইসিসিও মনে হচ্ছে না আমাদের ম্যাচ অন্য কোথাও নেবে। আমরা বোধ হয় হেরে গেলাম...।’

বিসিবির ওই পরিচালকের হতাশার বড় কারণ ছিল বাংলাদেশের ভারতে টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ না খেলার অবস্থানের প্রতি তখন পর্যন্ত অন্য কোনো দেশের ক্রিকেট বোর্ড দৃশ্যমান সমর্থন না জানানোয়। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) বাংলাদেশের ম্যাচ তাদের দেশে আয়োজনে আগ্রহী, পিসিবি বাংলাদেশকে সমর্থন দেবে, বাংলাদেশের খেলা ভারত থেকে না সরালে পাকিস্তানও বিশ্বকাপ বয়কট করবে—কয়েক দিন ধরে পিসিবি সূত্রের বরাতে পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমে এ রকম কিছু খবর এলেও পিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানাচ্ছিল না। কাজেই পাকিস্তান বোর্ড সত্যি সত্যি বাংলাদেশের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেবে—এমন কিছুতে ভরসা রাখা কঠিন হচ্ছিল।

পাকিস্তানের লাহোরে অবস্থিত পিসিবি কার্যালয়

তার মধ্যেই আজ সকালে ক্রিকেট–বিষয়ক ওয়েবসাইট ক্রিকইনফোর এক খবর জানাল, পিসিবি সত্যি সত্যি বাংলাদেশের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আইসিসিকে চিঠি দিয়েছে, যে চিঠি পাওয়ার পর আইসিসি আজ বাংলাদেশের দাবির বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্তের জন্য বোর্ড সভা ডেকেছে। অবশ্য বিশ্বকাপ নিয়ে চলমান আলোচনায় বাইরের কিছু সংবাদমাধ্যমে একাধিকবার ভুল ও বিভ্রান্তিকর সংবাদও এসেছে। সর্বশেষ এক প্রতিবেদনে যেমন বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের বিকল্প হিসেবে স্কটল্যান্ডকে বিশ্বকাপে নিচ্ছে আইসিসি। পরে বিবিসির এক প্রতিবেদনে পরিষ্কার করা হয়, স্কটল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের সঙ্গে এ রকম কোনো আলোচনা আইসিসি করেনি।

ক্রিকইনফোর আজকের খবর অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার পাঠানো চিঠিতে পিসিবি প্রতিবেশী অঞ্চলে রাজনৈতিক অস্থিরতার এই সময়ে ভারতে খেলতে না চাওয়ার বিষয়ে বিসিবির অবস্থানকে সমর্থন করেছে। চিঠির অনুলিপি পিসিবি আইসিসির অন্য বোর্ড সদস্যদের কাছেও পাঠিয়েছে। আইসিসি পিসিবির এই চিঠির কারণেই বোর্ড সভা ডেকেছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেনি ক্রিকইনফো। তবে তাদের ধারণা, ভারতে নিরাপত্তাশঙ্কার কারণে বাংলাদেশের শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ সরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ নিয়ে আলোচনাই সভার মূল উদ্দেশ্য। ৭ ফেব্রুয়ারি শুরু হতে যাওয়া এবারের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের আয়োজক ভারত হলেও পাকিস্তান ভারতে খেলে না বলে টুর্নামেন্টটি হবে ভারত ও শ্রীলঙ্কা দুই দেশ মিলিয়ে।

দুবাইয়ে অবস্থিত আইসিসি সদর দপ্তর

ক্রিকইনফো যদিও বলেছে, পিসিবির অবস্থানের কারণে আইসিসির সিদ্ধান্তে প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা কম; বিশ্বকাপ থেকে প্রায় ‘ছিটকে’ যেতে বসা বাংলাদেশের জন্য সেটাই আবার বড় আশার প্রদীপ। এখন অন্তত এটা বলা যাচ্ছে, বাংলাদেশ এখনো বিশ্বকাপের আলোচনায় আছে এবং বিসিবির অনড় অবস্থানের কারণে বাংলাদেশকে খেলানোর জন্য আইসিসি দৃশ্যত হলেও সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে।

কী হতে পারে আইসিসির সভায়

যতটুকু বোঝা যাচ্ছে, আজ বিকেলে (সম্ভাব্য বাংলাদেশ সময় বিকেল ৪টা) আইসিসির বোর্ড সভায় নিরাপত্তার কারণে ভারতে বিশ্বকাপের ম্যাচ না খেলার ব্যাপারে বাংলাদেশের জোরালো অবস্থান এবং তাদের প্রতি পিসিবির সমর্থনের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে বাকি সদস্যদের কাছে তুলে ধরবে আইসিসি। আইসিসির বোর্ড হচ্ছে আইসিসির ‘অ্যাপেক্স বডি’। বাংলাদেশের বিষয়টি নিয়ে আইসিসির কারও এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ নেই। বোর্ড সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা। সেখানে পিসিবি ছাড়া অন্যান্য বোর্ডেরও সুযোগ থাকবে বাংলাদেশের অবস্থানকে সমর্থন জানানোর।

বাংলাদেশ যেহেতু আইসিসির পূর্ণ সদস্যদেশ, বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে বিশ্বকাপ আয়োজন করতে হলে অবশ্য বোর্ড সভার অনুমোদন এমনিতেও দরকার হতো। আর এখানে তো নিরাপত্তা–শঙ্কার কারণে বাংলাদেশের ভারতে না খেলার দাবি অযৌক্তিকও নয়। শুধু উগ্রবাদীদের দাবির মুখে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনাই নয়, ধারণা করা হচ্ছে, বিগত আওয়ামী লিগ সরকারের অনেকেরই এখন ভারতে অবস্থান করাটাকেও বাংলাদেশ ভারতে গিয়ে খেলার ক্ষেত্রে ঝুঁকির একটা কারণ মনে করে।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের দাবির প্রতি সম্মান দেখাতে বা বাংলাদেশের প্রতি সহানুভূতিশীল মনোভাব দেখানোর জন্য হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে আইসিসি বোর্ড সভা করত। সভার আগে আইসিসির কাছে বাংলাদেশের প্রতি পিসিবির সমর্থনসূচক চিঠিটিকে বাংলাদেশ ইতিবাচক জ্বালানি হিসেবে দেখতে পারে। এতে অন্তত আইসিসি ও ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডর (বিসিসিআই) ওপর একটা বাড়তি চাপ তৈরি হলো। আইসিসির ম্যানেজমেন্ট এককভাবে বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে বিশ্বকাপ আয়োজন করতে চাইলে আজকের বোর্ড সভা ডাকত না।

ভারতের মুম্বাইয়ে বিসিসিআইয়ের প্রধান অফিস

তা ছাড়া গ্রুপ বদলের যে প্রস্তাব নিয়ে এরই মধ্যে বিসিবি–আইসিসি আলোচনা হয়েছে, সে রকম কিছু করতে হলেও বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী অন্য দলগুলোর মতামত প্রয়োজন, বিশেষ করে সংশ্লিষ্ট দুই গ্রুপের দলগুলোর। সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত যেটাই হোক, এই সভার পর আইসিসি অন্তত বলতে পারবে, বাংলাদেশকে বিশ্বকাপ খেলানোর সর্বোচ্চ চেষ্টাই তারা করেছে। উল্লেখ্য, ভারতে না খেলার কঠোর অবস্থান নেওয়ার পর আইসিসির আজকের ভার্চুয়াল সভাতেই প্রথম বিসিবি ও বিসিসিআই মুখোমুখি হবে।

পিসিবি কি সত্যি সত্যি বিশ্বকাপ বয়কট করবে

পাকিস্তানের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর, বিসিবির প্রস্তাব মেনে আইসিসি বাংলাদেশের ম্যাচ ভারত থেকে না সরালে পাকিস্তানও বিশ্বকাপ খেলার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে। অর্থাৎ বাংলাদেশের দাবি মানা না হলে পাকিস্তান বিশ্বকাপ বয়কট করলেও করতে পারে। পিসিবি এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে এ রকম কিছু না বললেও পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, আইসিসিকে মৌখিকভাবে এই অবস্থানের কথা জানিয়ে রেখেছে পিসিবি।

কিন্তু বাস্তবতা পিসিবির সম্ভাব্য এই অবস্থানকে কতটা সমর্থন করে? বাংলাদেশের দাবিকে যেকোনো দেশ সমর্থন দিতেই পারে, কিন্তু সে দাবি মানা না হলে নিজেদেরই বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানো আপাতদৃষ্টিতে অবাস্তবই মনে হয়।

শেষ মুহুর্তে ভেন্যু বদল যেহেতু জটিলতা অনেক বাড়াবে, সভায় বাংলাদেশের প্রস্তাব মানার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। বাকিটা নির্ভর করছে অন্য বোর্ডগুলোর অবস্থান এবং ক্রিকেট–কূটনীতিতে বিসিবির সামর্থ্য ও দক্ষতার ওপর।

কিন্তু পাকিস্তানের সাংবাদিকদের মতে, পিসিবি প্রধান মহসিন নাকভি এ বিষয়ে খুবই ‘অ্যাগ্রেসিভ’। তিনি আগেই বলেছেন, বাংলাদেশের পক্ষে তাঁরা প্রয়োজনে ‘শকিং’ কিছু করবেন। পাকিস্তান বিশ্বকাপ না খেললে পাকিস্তানের মানুষ সেটা সমর্থন করবে কি না—এমন প্রশ্নে একজন বলেছেন, ‘ভারতের বিপক্ষে যেকোনো অবস্থানে পাকিস্তানের মানুষের সমর্থন থাকবে।’ অর্থাৎ পিসিবি যেটাই করুক, সেটা যতটা না বাংলাদেশের পক্ষে, তার চেয়ে বেশি হবে তাদের ভারতবিরোধী অবস্থান থেকে। সেই অবস্থানের ‘উপজাত’ হিসেবে বাংলাদেশ কিছু পেলে ভালো। আবার ভবিষ্যতের জন্য তা হীতে বিপরীত হওয়ার শঙ্কাও জিইয়ে রাখতে পারে।

কতটা আশাবাদী হতে পারে বাংলাদেশ

শেষ মুহুর্তে ভেন্যু বদল যেহেতু জটিলতা অনেক বাড়াবে, সভায় বাংলাদেশের প্রস্তাব মানার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। বাকিটা নির্ভর করছে অন্য বোর্ডগুলোর অবস্থান এবং ক্রিকেট–কূটনীতিতে বিসিবির সামর্থ্য ও দক্ষতার ওপর। ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রুপে অদল–বদলের প্রশ্নে আয়ারল্যান্ডসহ এই দুই গ্রুপের অন্যদলগুলোর মতামত জরুরি। আবার গ্রুপ ঠিক রেখে বাংলাদেশের ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় সরাতে গেলেও মতামত লাগবে প্রতিপক্ষ দলগুলোর। সংশ্লিষ্ট সবার মতামত আদায় সহজ কাজ হবে না বিসিবির জন্য, যদি না তারা আরও আগেই থেকেই অন্য বোর্ডগুলোর সঙ্গে ইতিবাচক সমঝোতায় না পৌঁছে থাকে। বিসিবির পক্ষে ভার্চুয়ালে অনুষ্ঠেয় এই সভায় যোগ দেওয়ার কথা বোর্ড সভাপতি আমিনুল ইসলামের।

বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম

এরপরও আশা থাকবে, তবে…

টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে বিসিবির সঙ্গে এর আগে দুই দফা সভা করেছে আইসিসি। তাতে ইতিবাচক কিছু আসেনি বলেই আজকের সভা। ধরুন আজও ইতিবাচক কিছু হলো না, অর্থাৎ বাংলাদেশের ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় সরানোর পক্ষে মত দিল না আইসিসি, তখন কী হবে? তখন কি বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যাবে?

তখন আসলে একটাই পথ খোলা থাকবে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ খেলার—যদি বাংলাদেশ ভারতে গিয়ে খেলতে রাজি হয়। কিন্তু সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল গতকাল আবারও বলেছেন, কোনো অযৌক্তিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করে বাংলাদেশ ভারতে খেলতে যাবে না।

সে ক্ষেত্রে আইসিসির শেষ চেষ্টা হতে পারে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের ঢাকায় পাঠানো এবং বাংলাদেশ সরকারকে ভারতে খেলতে যাওয়ার ব্যাপারে রাজি করানোর চেষ্টা করা। এ ব্যাপারে আইসিসির শীর্ষ পর্যায়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে বলেও জানিয়েছে একটি সূত্র।

তবে বিসিবির দাবি, আইসিসির সঙ্গে সর্বশেষ সভায় ভারতে গেলে বাংলাদেশ দলকে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেওয়া হবে—এমন কোনো আশ্বাস দেওয়া হয়নি। আইসিসির প্রতিনিধিরা নাকি বলেছেন, অন্য দলগুলোর মতো বাংলাদেশ দলও সেখানে সাধারণ নিরাপত্তা প্রটোকলের মধ্যে থাকবে এবং সেটাতেই তারা নিরাপদ থাকবে। আইসিসির সভায়ও যদি সে রকমই বলা হয় এবং এরপর বাংলাদেশে আইসিসির কোনো হাইপ্রোফাইল প্রতিনিধিদলও সেই মনোভাব নিয়ে আসে, আইসিসির প্রচেষ্টাটাকে তখন শুধু ‘আই–ওয়াশ’ই মনে হবে।