
‘তিন বছর আগে যাদের দেখেছি, এবার তাদের অনেকেই নেই। তারা হারিয়ে গেছে’—প্রথম বিভাগ হকি লিগ মাঠে ফেরার আনন্দের আড়ালে এমন দীর্ঘশ্বাসও আছে ব্যাচেলর্স এসসির কোচ নাঈম উদ্দিনের।
তাঁর দলের ১৮ জনের ১৫ জনই নতুন, যাঁরা আগে কখনো কোনো লিগে খেলেননি। ফরাশগঞ্জেও ১৮ জনের মধ্যে ১৪ জন নতুন। অন্য ক্লাবগুলোতেও নতুন খেলোয়াড়ের সংখ্যা কম নয়।
গত তিন বছরে হকি থেকে হারিয়ে যাওয়া খেলোয়াড়দের কেউ ব্যবসায় ঢুকেছেন, কেউ চাকরিতে, কেউ চালাচ্ছেন উবার। মওলানা ভাসানী হকি স্টেডিয়ামে লিগ ফিরলেও তাই ফেরেননি অনেক খেলোয়াড়ই।
ঢাকা ইউনাইটেডের অধিনায়ক ইয়াসিন আরাফাত হারিয়ে যাওয়া সতীর্থদের কথা মনে করিয়ে বললেন, ‘লিগ নিয়মিত না হলে অনেকেই খেলা ছেড়ে দেয়। তিন বছর আগে যাদের লিগ খেলতে দেখেছি, তাদের অনেকেই নেই এবার। তারা এখন অন্য পেশার সঙ্গে জড়িত।’
লিগ নিয়মিত না হওয়ার পরিণতি হকির জন্য কতটা বেদনাদায়ক হতে পারে, এই কথাগুলোই তার প্রমাণ। খেলোয়াড়েরা একসময় হারিয়ে যান খেলা থেকেই। একসময় যাঁরা হকি নিয়ে স্বপ্ন দেখতেন, তিন বছর মাঠে লিগ না থাকায় তাঁদের অনেকেই জীবিকার প্রয়োজনে অন্য পথ বেছে নিয়েছেন। তিন বছর পর লিগ ফিরলেও সেই খেলোয়াড়দের ফিরিয়ে আনা যায়নি।
পিডব্লুডির অধিনায়ক মিঠুন মিয়ার কণ্ঠেও আক্ষেপ, ‘এটা কেমন কথা, একটা লিগের জন্য তিন বছর অপেক্ষা করতে হয়! আমরা যারা জাতীয় দলে খেলতে চাই, তাদের কী হবে? এত দিন পর খেলা হলে তো হকিই ছেড়ে দেবেন খেলোয়াড়েরা! আমার অনেক বন্ধু এখন আর হকিতে নেই। অথচ হকি নিয়ে তাদের কত স্বপ্ন ছিল!’
আজ বেলা ১১টায় ব্যাচেলর্স এসসি ও ফরাশগঞ্জের ম্যাচ দিয়ে শুরু হয়েছে প্রথম বিভাগ হকি লিগ; ম্যাচটি ৩–৩ গোলে ড্র হয়েছে। বিকেলের ম্যাচে ওয়ারী ক্লাব ৬–৩ গোলে হারিয়েছে ঢাকা ইয়াং স্টারকে। অনেক দিন পর ফেরা লিগের গ্যালারিতেও ছিলেন কিছু দর্শক।
সিলেট থেকে ব্যাচেলর্সের হয়ে লিগে খেলতে এসেছেন নন্দন। ঢাকার বাইরের খেলোয়াড়দের অনিশ্চয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা যারা ঢাকার বাইরের খেলোয়াড়, তাদের অবস্থা খুবই খারাপ। হকির প্রতি এখন আর আগ্রহ নেই তরুণদের। এটার ভবিষ্যৎই দেখছি না। মাঠে খেলা না থাকলে কীভাবে আমরা স্বপ্ন দেখব?’
ওয়ারী ক্লাবের অধিনায়ক খায়রুল আমিন জানেন না, এবারের লিগের পর আবার কবে মাঠে খেলতে নামবেন, ‘লিগ খুবই দরকার। কিন্তু দুঃখজনক, আমাদের লিগটা নিয়মিত হয় না। এবার যারা খেলবে, তারা আবার কবে খেলবে, সেই নিশ্চয়তা নেই।’
ফরাশগঞ্জের অধিনায়ক সাব্বির রহমানের মধ্যেও একই অনিশ্চয়তা, ‘একটা খেলার যদি ভবিষ্যৎ থাকে, তাহলেই নতুনরা তাতে আসবে। আমাদের খেলাই ঠিকমতো হয় না। যদি নিয়মিত লিগ হতো, জাতীয় দল আরও শক্তিশালী হতো; আমিরুল–জিমি ভাইদের মতো অনেক খেলোয়াড় উঠে আসত। মাঠে খেলা না থাকলে খেলোয়াড় হারিয়ে যায়। গত তিন বছরে অনেক খেলোয়াড় হকি ছেড়েছে।’
সবার কথায়ই একই আকুতি—হকিকে বাঁচাতে হলে খেলা আর খেলোয়াড়দের মাঠে রাখতে হবে। সে জন্য প্রয়োজন নিয়মিত লিগ আয়োজন। কে জানে, হকি ছেড়ে যাওয়া খেলোয়াড়েরা তখন হয়তো আবার ফিরে আসবেন স্টিক হাতে।