
ঢাকার ফুটবলে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ২০০৫ সালে ব্রাদার্স ইউনিয়নের হয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন। ২০২৬ সালে যখন মাঠ ছাড়লেন, তখন তিনি বাংলাদেশের ফুটবলের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক মামুনুল ইসলাম ইতি টানলেন তাঁর দীর্ঘ ২১ বছরের ফুটবল ক্যারিয়ারের। মাঠের লড়াই, ব্যক্তিগত অর্জন আর ফেডারেশনের সঙ্গে তিক্ততা—সবই উঠে এসেছে মাসুদ আলম–এর নেওয়া এই সাক্ষাৎকারে।
পরশু যখন শেষবারের মতো বুট পরে কিংস অ্যারেনার টানেল দিয়ে বের হচ্ছিলেন, তখন মনে কী চলছিল?
মামুনুল: শুধু ভেবেছি, মাঠে যতক্ষণই থাকি, দলকে যেন সেরা সাপোর্ট দিতে পারি। রহমতগঞ্জের বিপক্ষে লিগ ম্যাচের ২২ মিনিটে যখন মাঠ ছাড়ি, তখন স্কোর ২-২। শেষ পর্যন্ত আমার দল ফর্টিস এফসি ৩-২ গোলে জেতে, এটাই বড় তৃপ্তি।
২০০৫ থেকে ২০২৬—এই দুই সময়ের মামুনুলের মধ্যে পার্থক্য কী?
মামুনুল: ২০০৫ সালে মাঠে নেমেছিলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে। আর ২০২৬-এ মাঠ ছাড়লাম একজন প্রতিষ্ঠিত ফুটবলার হিসেবে। শুরুর সব স্বপ্ন পূরণ করেই বিদায় নিয়েছি।
অবসরে কোন জিনিসটা সবচেয়ে বেশি মিস করবেন?
মামুনুল: জাতীয় দলের পতাকা বহন। যদিও ছয় বছর আগেই বুরুন্ডির বিপক্ষে শেষ ম্যাচ খেলেছি, কিন্তু একজন ফুটবলারের জন্য জাতীয় পতাকাই সবচেয়ে বড় আবেগের জায়গা।
২০১০ সালে ঢাকায় এসএ গেমসে সোনা জয় তো ক্যারিয়ারের বড় মাইলফলক...
মামুনুল: অবশ্যই। নেপালের বিপক্ষে আমার প্রথম গোলে শুরু হওয়া সেই জয়যাত্রা আর ফাইনালে ৪-০ গোলের জয়। এই স্মৃতিগুলো সব সময় মনে পড়বে।
মাঝমাঠ সামলানো না অধিনায়কত্ব—কোনটি বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল?
মামুনুল: মাঝমাঠ সামলানোই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সাফ চ্যাম্পিয়ন হতে না পারার আক্ষেপ কি কখনো দূর হবে?
মামুনুল: নিজের আক্ষেপ দূর হবে না, তবে পরের প্রজন্ম সাফ জিতলে আমি মনে করব আমিই জিতেছি। এ ছাড়া ভারতের আইএসএলে অ্যাথলেটিকো ডি কলকাতায় নাম লিখিয়েও সেখানে ম্যাচ টাইম না পাওয়ার আক্ষেপও সারা জীবন থাকবে। ওখানে খেললে দেশের অন্য ফুটবলারদের জন্যও সুযোগ খুলত।
বর্তমান খেলোয়াড়েরা কেন বিদেশি লিগে সুযোগ পাচ্ছে না?
মামুনুল: প্রথমত ইচ্ছাশক্তি আর দ্বিতীয়ত আমাদের কোনো এজেন্ট নেই। তাই স্প্যানিশ প্রথম বিভাগে লিগ বা মালয়েশিয়ার লিগে প্রস্তাব পেয়েও আমি শুধু এজেন্টের অভাবেই এগোতে পারিনি।
ডাগআউটে কোচ মামুনুলকে কবে দেখা যাবে?
মামুনুল: খেলা আর কোচিং আলাদা। ‘এ’ লাইসেন্স করেছি ঠিকই, তবে এখনো অনেক শেখার বাকি আছে। তবে আমি ইতিমধ্যে সংগঠক হিসেবে কাজ করছি। বাবার স্মৃতিধন্য ‘কল্লোল সংঘ’ পরিচালনা করছি এবং চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার কাউন্সিলর হিসেবেও আছি।
মাঠে কাদের সঙ্গে খেলতে ভালো লাগত, কাকে আটকানো কঠিন মনে হতো?
মামুনুল: মাঝমাঠে জামাল, সোহেল, শরিফ ও জয় ভাইদের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতাম। আর প্রতিপক্ষ হিসেবে আবাহনীতে আসা ব্রিটিশ ফরোয়ার্ড লি টাককে আটকানো ছিল সবচেয়ে কঠিন।
আপনার চোখে বাংলাদেশে খেলা সেরা ফুটবলার কারা?
মামুনুল: বিদেশিদের মধ্যে সনি নর্দে। দেশিদের মধ্যে আমার চোখে আরমান ভাই সেরা। এর পরে জাহিদ হাসান এমিলি, জাহিদ হোসেন আর বর্তমানে রাকিবের কথা বলব। হামজা চৌধুরী তো আছেই।
জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে ড্রেসিংরুমে কোনো অনুপ্রেরণামূলক স্মৃতির কথা মনে পড়ে?
মামুনুল: ঢাকায় বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপে প্রথম ম্যাচে মালয়েশিয়ার কাছে হারের পর আমি আর এমিলি সতীর্থদের বলেছিলাম, ফাইনালে না যেতে পারলে আমরা অবসর নেব। সেই চাপে সবাই জানপ্রাণ দিয়ে খেলে দলকে ফাইনালে তুলেছিল।
আপনার বাঁ পায়ের ফ্রি কিক ও কর্নার তো বিখ্যাত ছিল...
মামুনুল: এটা পরিশ্রমের ফল। কোচ মারুফুল হক ভাই ২০০৯ সালে মোহামেডানে থাকাকালীন এই ডেড বল স্কিলের ওপর অনেক কাজ করেছিলেন আমাকে নিয়ে।
ক্যারিয়ারের কোনো বড় ভুল?
মামুনুল: চট্টগ্রাম আবাহনীতে খেলা।
নিজেকে সফল ভাবেন কি?
মামুনুল: অবশ্যই। ঘরোয়া ফুটবলে প্রায় ৪০০ ম্যাচ, ৫০ গোল, ২০০ অ্যাসিস্ট আর ১৬-১৭টি ট্রফি আছে। জাতীয় দলে ৭৫ ম্যাচ খেলেছি। তিনটি গোল, ১৫টির মতো অ্যাসিস্ট। ২০১৪ এশিয়ান গেমসে আফগানিস্তানের বিপক্ষে আমার একমাত্র গোলে বাংলাদেশ জিতেছিল। ২০১২ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত টানা অধিনায়ক ছিলাম। ২১ বছর বা ৬টি সাফ খেলা মিডফিল্ডার দেশে কজন আছে, বলুন?
সাফ জিততে না পারা কি ব্যর্থতা নয়?
মামুনুল: এটা আমার এবং দেশের ফুটবলের ব্যর্থতা, যার দায় আমি মাথা পেতে নিয়েছি। কিন্তু আমাদের প্রজন্মকে অসফল বলা যাবে না। আমরা বঙ্গবন্ধু কাপে রানার্সআপ হয়েছি, এসএ গেমসে সোনা জিতেছি, এএফসি কাপের জোনাল সেমিফাইনাল খেলেছি। ভুটানের কিংস কাপ জিতেছি, কলকাতায় আইএফএ শিল্ডে রানার্সআপ হয়েছি ক্লাবের হয়ে।
বাফুফের সঙ্গে আপনার সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে কী বলবেন?
মামুনুল: আমি ২০ বছর বাফুফের সঙ্গে যুদ্ধ করেছি। শুরুতে বাফুফের ছাইদ হাসান কানন ভাই আমাকে বারবার দল থেকে বাদ দিতে চেয়েও পারেননি। সালাহউদ্দিন ভাই আর সোহাগ সাহেবের থেকে কোনো সাপোর্ট পাইনি, উল্টো সব সময় চাপে রাখা হয়েছে। জেমি ডের অধীনে আমি যখন জাতীয় দল থেকে আনুষ্ঠানিক রিটায়ারমেন্ট চেয়েছি, তাঁরা সেটাও দেননি। শৃঙ্খলাভঙ্গের যে অভিযোগ তুলে আমাকে সাসপেন্ড করা হয়েছিল, তার কোনো প্রমাণ তাঁরা দেখাতে পারেননি।
কার কাছ থেকে সবচেয়ে বেশি শিখেছেন?
মামুনুল: ডিডো, জর্জেভিচ, ক্রুইফ আর জেমি ডে। জর্জেভিচ ইমোশনালি আমাদের রক্ত গরম করে দিতে পারতেন। আর মারুফ ভাইয়ের কাছে আধুনিক ফুটবলের সব শিখেছি।
আপনাদের প্রজন্ম নিয়ে সবচেয়ে বড় অভিযোগ, আপনারা মাঠে দর্শক আনতে পারেননি। বিদায়ের পর সমর্থকদের প্রতি কোনো বার্তা?
মামুনুল: মাঠে দর্শক আনা বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। তবে আমরা সেরাটা দিয়ে চেষ্টা করেছি। আশা করি ঘরোয়া ফুটবলে মাঠে দর্শক যাবে। শেষটায় বলব, এই দীর্ঘ পথচলায় যারা আমার পাশে ছিলেন, সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা।