২৩ বছরের শিরোপাখরা ভাঙার আশা টমাস ডুলির
২৩ বছরের শিরোপাখরা ভাঙার আশা টমাস ডুলির

ডুলির সাক্ষাৎকার

নাম–পরিচয় দিয়ে দলে ঢোকা যাবে না—ডুলির সাফ কথা

আগামী নভেম্বরে ঢাকায় বসছে ছেলেদের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। জাতীয় ফুটবল দলের কোচ হিসেবে টমাস ডুলির প্রথম বড় কোনো টুর্নামেন্ট। গতকাল প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন সাফে বাংলাদেশের ২৩ বছরের শিরোপাখরা ভাঙার কথা, প্রতিপক্ষ নিয়ে ভাবনা, বাংলাদেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎসহ আরও অনেক কিছু—সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জহির উদ্দিন।

প্রশ্ন

‎সাফ নিয়ে নিশ্চয়ই পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছেন?

টমাস ডুলি: এটা বড় বড় কথা বলার সময় নয়। তবে লক্ষ্যটা পরিষ্কার—সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নেমে শিরোপার জন্য লড়াই করা।

প্রশ্ন

সর্বোচ্চ প্রস্তুতি বলতে কী বোঝাচ্ছেন?

নিজেদের মাঠে টুর্নামেন্ট—এটা বিশাল সুবিধা, আর তা কাজে লাগাতেই হবে। ২৩ বছর ধরে এই শিরোপার জন্য অপেক্ষা চলছে, এবার লক্ষ্য একটাই—চ্যাম্পিয়ন হওয়া। সান মারিনোর বিপক্ষে জয়টা আমাদের ভালো ভিত গড়ে দিয়েছে। সামনের কয়েক মাসে কৌশল ও দক্ষতার ঘাটতিগুলো মেটাতে হবে, সেট পিসে ভালো করা দরকার, দলের বোঝাপড়াটাও বাড়াতে হবে। পাশাপাশি ম্যাচ খেলে মানসিকভাবে তৈরি হতে হবে।

প্রশ্ন

গ্রুপে শ্রীলঙ্কা ও ভুটান আছে। নিষেধাজ্ঞা উঠলে নেপালও থাকতে পারে। সব মিলিয়ে গ্রুপটা কেমন মনে হচ্ছে?

ডুলি: প্রতিপক্ষ কে, সেটা বড় কথা নয়। চ্যাম্পিয়ন হতে হলে সহজ–কঠিন ভুলে যান। শিরোপা জিততে হলে সামনে যে-ই আসুক, তাকে হারাতে হবে। প্রতিটা ম্যাচে জেতার মানসিকতা নিয়ে নামতে হবে।

ডুলির অধীনে বাংলাদেশ দলের অনুশীলন সেশন। ছবিটি পুরোনো
প্রশ্ন

এই কদিনে বাংলাদেশ ফুটবল নিয়ে আপনার ধারণা কেমন হলো?

ডুলি: সবচেয়ে মুগ্ধ করেছে খেলোয়াড়দের আবেগ আর নিষ্ঠা। মাঠে দরকারের সময় তারা সব উজাড় করে দেয়, লড়াই করে, দলের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেয়। মাঠের বাইরে দারুণ বিনয়ী, আন্তরিক, দলকেন্দ্রিক। সবাই শিখতে চায়, অন্যকে সম্মান দেখায়, মানসিকতাও ইতিবাচক। হৃদয় দিয়ে খেলা আর বিনয়—এই মিশেলটাই তাদের শেখার জন্য উপযুক্ত করে তুলেছে, আর এটাই আমাকে বাংলাদেশ ফুটবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী করছে।

প্রশ্ন

দায়িত্ব নেওয়ার সময় বলেছিলেন ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ে ১৫০-১৬০-এর মধ্যে উঠতে চান। তার জন্য কী ধরনের পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে চান?

‎ডুলি: কয়েকটি জায়গায় জোর দিতে হবে। এমন প্রতিপক্ষের সঙ্গে খেলতে হবে, যা প্রস্তুতি আর র‍্যাঙ্কিং—দুটোতেই কাজে দেয়। বাছাইপর্ব আর আঞ্চলিক টুর্নামেন্টের মতো গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ জিততে হবে। কারণ, ওখানে পয়েন্ট বেশি। ম্যাচে ভুল কমাতে হবে, কৌশলগত শৃঙ্খলা রাখা জরুরি, সেট পিসে আরও কার্যকর হওয়া দরকার। একটা স্থিতিশীল মূল স্কোয়াড দাঁড় করাতে হবে, যাতে খেলোয়াড়দের মধ্যে বোঝাপড়া গড়ে ওঠে। মাঠের বাইরেও কাজ করার আছে। দেশ ও বিদেশ দুই জায়গা থেকেই প্রতিভা খোঁজা, একাডেমিকে শক্তিশালী করা, প্রশিক্ষণ-স্পোর্টস সায়েন্স-ভিডিও বিশ্লেষণ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো। সব মিলিয়ে কোচিংয়ে ধারাবাহিকতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও দরকার।

প্রশ্ন

প্রবাসী ফুটবলারদের নিয়ে আপনার ভাবনাটা কী?

ডুলি: যাদের বাংলাদেশের সঙ্গে সত্যিকারের রক্তের সম্পর্ক নেই, তাদের কথা আলাদা। কিন্তু যাদের বাবা-মা, দাদা-দাদি বা নানা-নানির সূত্রে বাংলাদেশের নাগরিকত্বের যোগসূত্র আছে, তাদের অবশ্যই দেশের হয়ে খেলার সুযোগ করে দেওয়া উচিত। প্রতিন্দ্বিতাপূর্ণ লিগে বেড়ে ওঠা খেলোয়াড়েরা সাধারণত উন্নত প্রশিক্ষণ, কৌশলগত জ্ঞান আর পেশাদারত্ব নিয়ে আসে। তারা ভালো করলে তরুণেরা ফুটবলে আগ্রহী হন, বিনিয়োগ-স্পনসর বাড়ে, ঘরোয়া লিগও শক্তিশালী হয়। ফিলিপাইনের কথা বলি। শুরুতে আমরা অনেক আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় নিয়েছিলাম দলের মান বাড়াতে। স্থানীয়দের মান বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদেশভিত্তিক খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভরতা কমেছে, নির্বাচন হয়ে ওঠে পুরোপুরি মেধাভিত্তিক। বাংলাদেশেও একই নীতি প্রয়োজন। প্রবাসী খেলোয়াড়কে স্থানীয়দের চেয়ে ভালো হতেই হবে, জায়গা অর্জন করতে হবে পারফরম্যান্স দিয়ে।

পরিচয় পর্বে বাংলাদেশের পতাকা হাতেই হাজির হয়েছিলেন ডুলি
প্রশ্ন

কিন্তু বর্তমান দুর্বল ঘরোয়া কাঠামো দিয়ে কি জাতীয় দলে ভালো ফুটবলার পাওয়া সম্ভব?

ডুলি: না। আমার তাই চাওয়া, জাতীয় দল থেকে শুরু করে বয়সভিত্তিক সব দল একই দর্শন মেনে চলুক, যাতে খেলোয়াড়েরা ছোটবেলা থেকেই একই পদ্ধতি আর নীতিতে বেড়ে ওঠে।

প্রশ্ন

এটা বাস্তবে করবেন কীভাবে?

ডুলি: সারা দেশের জন্য আমি একটা অভিন্ন কোচিং কারিকুলাম চালু করতে চাই। প্রতিভা খুঁজতে আঞ্চলিক উন্নয়ন কেন্দ্র দরকার। অনূর্ধ্ব-১৫ থেকে সিনিয়র দল পর্যন্ত থাকবে স্বচ্ছ একটা পথ, নির্দিষ্ট মান অর্জন করলেই কেবল পরের ধাপে ওঠা যাবে। কোচদের প্রশিক্ষণ, ভিডিও বিশ্লেষণ, আধুনিক প্রযুক্তি আর ক্লাবগুলোকে যুব উন্নয়নে উৎসাহ দেওয়ার মতো উদ্যোগও থাকা উচিত।

প্রশ্ন

স্থানীয় পর্যায়ে নতুন প্রতিভা উঠে আসছে না। এ নিয়ে কী বলবেন?

ডুলি: অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের মূল্য অনেক। ভালো নেতৃত্ব দলের জন্য জরুরি, তাঁরা দীর্ঘদিন খেলতেই পারেন। তবে নতুনদের উঠে আসাটাও জরুরি। আমি মনে করি, ৬ থেকে ১১ বছর পর্যন্ত বয়সটা খেলা উপভোগের সময়। এ সময় ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়। ১১ থেকে ১৪—দক্ষতা গড়ার সবচেয়ে জরুরি সময়। এই সময়ে দরকার সঠিক প্রশিক্ষণ। ১৫ থেকে ২০—কৌশলগত শিক্ষা, শারীরিক সক্ষমতা, সিদ্ধান্ত নেওয়া আর খেলা বোঝার ক্ষমতা বাড়ানোর সময়। আমি সব সময় চারটা স্তম্ভের কথা বলি—প্রযুক্তিগত, কৌশলগত, শারীরিক আর মানসিক। অনেকে প্রথম তিনটাতেই জোর দেন, কিন্তু আসল পার্থক্য গড়ে দেয় মানসিক দৃঢ়তা। এই চারটি একসঙ্গে গড়ে তুলতে পারলেই খেলোয়াড়েরা পেশাদার পর্যায়ে দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারবে।

কিংসের অনুশীলন গ্রাউন্ডে কোচিং স্টাফদের সঙ্গে ডুলি। সান মারিনো ম্যাচের আগে
প্রশ্ন

কাবরেরার সময় দল নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক ছিল। আপনার নির্বাচন পদ্ধতি কেমন হবে?

‎ডুলি: আমার কাছে নির্বাচন মানে পারফরম্যান্স; বয়স, উচ্চতা বা খ্যাতি নয়। অনুশীলন আর ম্যাচে যে ভালো করবে, সে-ই সুযোগ পাবে। নাম-পরিচয় দিয়ে দলে ঢোকা যাবে না, যোগ্যরাই জায়গা পাবে। স্বীকার করছি, দেশের সব খেলোয়াড়কে এখনো আমি চিনি না, শুরুতে হয়তো এক-দুজন চোখ এড়িয়ে যেতে পারে। তবে নিয়মিত স্কাউটিং চলছে, যাকেই যোগ্য মনে হবে, তাকে পরের ক্যাম্পে ডাকা হবে।