মিলি আক্তার
মিলি আক্তার

‘আমাদের বাড়িতে টেলিভিশন নেই, তাই...’

ময়মনসিংহের নান্দাইলের মেয়ে ১৯ বছর বয়সী মিলি আক্তার। নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারে বড় হওয়া মিলির হাতে অনুশীলন শেষে নাশতা খাওয়ার টাকাটা পর্যন্ত থাকত না। সেই তিনিই এশিয়ান কাপে চীনের মতো দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ নারী দলের পোস্ট সামলেছেন, করেছেন সাত–আটটি দুর্দান্ত সেভ। পরশু সিডনিতে ২ গোলের হারের পরও তাই মিলিকে নিয়েই সব আলোচনা, তিনি যেন হঠাৎ করেই বাংলাদেশ নারী ফুটবলের নতুন মুখ হয়ে উঠেছেন। প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ৫ ফুট ৬ উঞ্চি উচ্চতার এই গোলকিপার বলেছেন জীবনযুদ্ধের সব বাধা ডিঙিয়ে কীভাবে তিনি আজ এই জায়গায়—

প্রশ্ন

চীনের সঙ্গে দারুণ খেললেন আপনি। এরপর আজকের (কাল) দিনটা কেমন কাটল?

মিলি আক্তার: খুব ভালো। সিডনি অপেরা হাউস আর এর আশপাশে ঘুরে বেড়িয়েছি আমরা।

প্রশ্ন

২০২৪ সালে ভুটানের বিপক্ষে জাতীয় দলের জার্সিতে খেলেছিলেন। তাহলে কালকের ম্যাচটাকে নিজের প্রথম আন্তর্জাতিক ম্যাচ বললেন কেন?

মিলি: ভুটানের সঙ্গে ৬০ মিনিট খেলেছিলাম, তবে ওটা ছিল প্রীতি ম্যাচ। আর কালকেরটা প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ। দুটির মধ্যে পার্থক্য আছে। সে জন্যই বলা।

প্রশ্ন

ওয়েস্টার্ন স্টেডিয়ামের মতো বড় মঞ্চে এমন নৈপুণ্য দেখাবেন ভাবতে পেরেছিলেন?

মিলি: আত্মবিশ্বাস ছিল, সুযোগ পেলে ভালো করব। মনে কিছুটা ভয় কাজ করলেও আস্তে আস্তে তা কাটিয়ে উঠি।

প্রশ্ন

গোলকিপার কীভাবে হলেন?

মিলি: ছোটবেলায় প্রাইমারি স্কুলে ছেলেদের সঙ্গে খেলার সময় কেউ গোলকিপার হতে চাইত না, তখন আমি গোলকিপার হিসেবে দাঁড়াতাম। একবার পেনাল্টি ঠেকিয়ে দেওয়ার পর থেকেই আমি গোলকিপার হিসেবে খেলা শুরু করি।

চীনের বিপক্ষে বেশ কয়েকটি দুর্দান্ত সেভ করেছেন মিলি আক্তার
প্রশ্ন

২০২৪ সালে নেপালে সিনিয়র সাফজয়ী দলে ছিলেন। গত বছর ঢাকায় সাফ অনূর্ধ্ব-২০ টুর্নামেন্টে সেরা গোলকিপার হয়েছেন। এবার এশিয়ার মঞ্চ মাতালেন প্রথম ম্যাচে। সামনে লক্ষ্য কী?

মিলি: আস্তে আস্তে আরও বড় হতে চাই। জাতীয় দলে টিকে থাকার স্বপ্ন দেখি। খেলাটা ধরে রাখতে কঠোর পরিশ্রম করব। আগামী ম্যাচে সুযোগ পেলে আশা করি আর ভয় লাগবে না।

প্রশ্ন

রুপনা কী বললেন চীন ম্যাচের পর?

মিলি: ম্যাচ শেষে এসে জড়িয়ে ধরে বলেছেন, ‘ভালো খেলছ’, উৎসাহ দিয়েছেন অনেক।

প্রশ্ন

বাফুফের ক্যাম্প থেকে আপনি বাদ পড়েছিলেন। তখন কি ভেবেছিলেন আবার ফিরতে পারবেন?

মিলি: এক বছর ছিলাম না ক্যাম্পে। পারফরম্যান্স খারাপ হয়ে গিয়েছিল। তবে ক্যাম্প থেকে বাদ পড়েও কখনো হাল ছাড়িনি। ছাড়িনি বলেই ২০২৪ সালে ডাক পেয়ে ভুটানে খেলতে যাই।

প্রশ্ন

ক্যাম্প থেকে বাদ পড়ার দিনগুলো কেমন ছিল?

মিলি: অনেক হতাশার। ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার চৌরাস্তা এলাকায় আমাদের বাড়িতে চলে যাই তখন। সেখানকার পাঁচরুখী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের হয়ে বঙ্গমাতা টুর্নামেন্ট খেলে আমি উঠে আসি।

মিলি আক্তারের কারণে বাংলাদেশের বিপক্ষে বেশ কবার গোলবঞ্চিত হয়েছে চীন
প্রশ্ন

আপনার বাবা-মা কি চীনের বিপক্ষে ম্যাচটা দেখেছেন?

মিলি: আমাদের বাড়িতে টেলিভিশন নেই, তাই বাবা (শামসুল হক) একটি অফিসে গিয়ে খেলা দেখেছেন। বাবা-মা একা থাকেন।

প্রশ্ন

পরিবারে আর কে কে আছে?

মিলি: আমরা চার বোন, আমাদের কোনো ভাই নেই। আমি সবার ছোট। তিন বোনেরই বিয়ে হয়ে গেছে। বাবা আগে ধানের ব্যবসা, কলার চাষ, গরু কেনাবেচাসহ অনেক কাজ করতেন। তাঁর বয়স ৫০ বছরের বেশি হওয়ায় আমি তাঁকে আর কাজ করতে দিই না।

প্রশ্ন

আপনি কি ফুটবলার হওয়ার স্বপ্নই দেখতেন?

মিলি: ছোটবেলা থেকে ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। তবে এখন আমি সেনাবাহিনীতে (আর্মি) চাকরি করছি এবং ওখানকারই গোলকিপার।

প্রশ্ন

আপনার এই পর্যায়ে আসার পেছনের গল্পটা বলুন।

মিলি: আমাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। বাবা অনেক কষ্ট করে আমাকে ফুটবল মাঠে যাতায়াতের জন্য দিনে ২০ টাকা করে দিতেন। কষ্ট করে মাঠে যেতাম, আবার আসতাম। কোনো সময় ক্লাস করতাম, আবার করতাম না। মাঠে প্র্যাকটিস শেষে সবাই নাশতা খেলেও আমি খেতাম না। আমার কাছে টাকা থাকত না।

প্রশ্ন

খেলোয়াড় হওয়ার পথে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা কি পার হতে হয়েছে?

মিলি: আমাদের বাড়িতে যাতায়াতের রাস্তা নিয়ে অনেক বড় সমস্যা। রাস্তা এতই সরু যে কোনো অসুস্থ মানুষকে নিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা নেই, গাড়িও ঢোকে না। বাড়ি থেকে প্র্যাকটিস করতে পারছিলাম না বলে আমরা ভাড়াবাড়িতে উঠি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী আমাদের বাড়ির রাস্তা এবং বাসার সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি তো এখন নেই।