
পাঁচ বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে দূরে থেকে অবশেষে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন রুবেল হোসেন। প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এই পেসার বলেছেন ক্যারিয়ারজুড়ে তাঁর অতৃপ্তির কথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তারেক মাহমুদ।
গত পাঁচ বছর আপনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নেই। হঠাৎ অবসরের ঘোষণা দিলেন। এত দিন কি ভেবেছিলেন আবার জাতীয় দলে ফিরতে পারেন?
রুবেল: যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে বাদ পড়ে গেলাম, তার পরও এটি আমার মাথায় আসেনি যে আমি আর জাতীয় দলে ঢুকতে পারব না। তবে এক পর্যায়ে মনে হয়েছে, জাতীয় দলে হয়তো আর সুযোগ হবে না, বয়সও তো হচ্ছে। এরপর বছর দেড়েক ধরে ভাবছিলাম, আমি আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর ঘোষণা করব; কিন্তু সে জন্য একটি ভালো পরিবেশ দরকার ছিল। ক্রিকেট বোর্ডের যে অবস্থা ছিল, ও রকম পরিবেশ ছিল না। দুই–তিন মাস ধরে ভাবছিলাম, এটি আর ঝুলিয়ে রেখে লাভ নেই। তাহলে আমিও সিনিয়রদের মতোই হয়ে যাব।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবসর ঘোষণার পর পরশু বাংলাদেশ–নিউজিল্যান্ড দ্বিতীয় ওয়ানডের আগে মিরপুরে আপনাকে বিদায়ী সংবর্ধনা দেওয়া হলো। কেমন অনুভূতি ছিল?
রুবেল: অবসর ঘোষণার পর তামিম ভাই আমাকে ফোন দিয়ে বলেন, ‘রুবেল, তুই তো অবসর ঘোষণা করলি ফেসবুকে, তো আমরা ক্রিকেট বোর্ড চাইছি, তোকে সুন্দরভাবে সম্মানিত করার জন্য।’ আমি বলেছি, ঠিক আছে ভাই সমস্যা নেই, এটি তো খুব ভালো কথা। বিসিবি যেটি করেছে, আমার খুব ভালো লেগেছে…আমাকে এত সুন্দরভাবে বিদায় দিয়েছে।
মাঠ থেকেই বিদায় নিলেন, তবে মাঠে একটি শেষ ম্যাচ খেলে বিদায় নিলে বোধ হয় বেশি ভালো লাগত…
রুবেল: এটি তো স্বাভাবিক, মাঠে একটি ম্যাচ খেলে বিদায় নেওয়ার স্বপ্ন তো যেকোনো ক্রিকেটারেরই থাকে। সে রকম হলে আমি আরও বেশি খুশি হতাম। তার পরও যেটি হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ। আমাকে খুব সুন্দরভাবে বিসিবি সম্মানিত করেছে। এতে আমি এবং আমার পরিবার খুব খুশি হয়েছি।
বিদায়ী অনুষ্ঠান শেষে ছেলেকে নিয়ে মাঝমাঠে উইকেটের পাশে গিয়ে বসলেন। বোঝাই যাচ্ছিল অনেক আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিলেন…
রুবেল: তামিম ভাই–ই আমাকে বলেছেন, ‘তুই একবার উইকেটে যা।’ আমারও ইচ্ছা ছিল; কিন্তু ম্যাচ চলাকালে যেতে পারব কি না, জানতাম না। পরে গেলাম, উইকেটটি স্পর্শ করে অনুভব করার চেষ্টা করলাম। মিরপুরের এই মাঠ, উইকেট আমার জন্য আসলেই বিশেষ কিছু। সেই অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট থেকে এই মাঠের সঙ্গে আমার সম্পর্ক। এই মাঠ আমার জীবনে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সে জন্যই আমি উইকেটটিকে সম্মান করেছি, চুমু খেয়েছি। ছেলেকে নিয়ে কয়েক সেকেন্ড ওই জায়গায় ছিলাম।
ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলা নিয়ে কী পরিকল্পনা?
রুবেল: প্রিমিয়ার লিগে খেলা নিয়ে কথাবার্তা চলছে। ভালো প্রস্তাব পেলে খেলব; আর খেললেও এক বছর বা সর্বোচ্চ দুই বছর, হয়তো এটিই শেষ বছর হয়ে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মূলত ওয়ানডেটাই ছিল আপনার সংস্করণ। তিন সংস্করণ মিলিয়ে পাওয়া ১৯৩ উইকেটের ১২৯টিই ওয়ানডেতে। টেস্ট, টি–টুয়েন্টি খেলেছেনও কম। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে কতটা সন্তুষ্ট?
রুবেল: আমার মনে হয় ওয়ানডেতে আমার ভালোই সাফল্য আছে। আমার টেস্টে গড় খুবই খারাপ, যেটি নিয়ে আমি খুশি নই। তবে ওয়ানডেতে যদি আরেকটু সুযোগ পেতাম, তাহলে হয়তো আরও কিছু বছর খেলতে পারতাম। ২০২১ সালে শেষ ম্যাচ খেলেছি; তবে আমি মনে করি, সুযোগ পেলে আমি ২০২৩ বা ২০২৪ সাল পর্যন্তও খেলতে পারতাম, ১০০ ভাগ পারতাম। শুধু শেষের দিকে নয়, মাঝখানেও কিছুদিন আমি খেলতে পারিনি। হয়তো কিছু কারণ ছিল, যেগুলো বললে এখন বিতর্ক তৈরি হতে পারে। আল্লাহ–তায়ালা বিদায়ের সময় সুন্দর একটি সেলিব্রেশন করিয়েছেন, সম্মানিত করেছেন। আমিও চাই না এগুলো নিয়ে কিছু বলতে।
প্রায়ই দেখা গেছে আগের ম্যাচে ভালো বোলিং করেও পরের ম্যাচে টিম কম্বিনেশনের কারণে সুযোগ পাননি। তখন কেমন লাগত?
রুবেল: ওয়ানডেই আমার ফেবারিট ক্রিকেট। এটি হয়তো আমি আরও কিছুদিন খেলতে পারতাম; কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে টিম কম্বিনেশন, আবার কিছু সময় সিনিয়রদের কারণেও আমি খেলতে পারিনি। এই জায়গায় একটু কষ্ট লাগে। ধারাবাহিকভাবে খেলার সুযোগ পেলে জাতীয় দলে আমার অবস্থান আরও ভালো থাকতে পারত। টেস্টে আমি অনেক বোলিং করলেও উইকেট পেতাম না। দিন শেষে টেস্টে উইকেটই কাউন্ট হয়। টেস্টে আমার অনেক ভালো স্পেল আছে—মিরপুরের একটি স্পেলে আমি রিভার্স সুইং দিয়ে সাঙ্গাকারাকে নাচিয়ে ফেলেছিলাম। এসব ক্ষেত্রে টিম ম্যানেজমেন্ট হয়তো বাহবা দেয়; কিন্তু দিন শেষে উইকেটটিই দেখে সবাই। সে জন্যই আমার টেস্টের অ্যাভারেজ খুবই খারাপ; আর টেস্টে মিরপুর বা চট্টগ্রামের উইকেট ফ্লাট থাকে, স্পিন–সহায়ক উইকেট হয়। পেসারদের কিছু করার থাকে না। শুধু আমি নই, অন্য পেসারদেরও একই অবস্থা ছিল। শুধু রাজিব (শাহাদাত হোসেন) ভাই মনে হয় শুরু থেকেই ভালো ছিলেন।
চোট ছিল না, ফর্মে ছিলেন—তবু সুযোগ হতো না একাদশে। সে সময়ের সেই অনুভূতিটা বলুন...
রুবেল: খারাপ লাগা তো কাজ করেই ভাই; কিন্তু কিছু করার নেই, এটি হয়তো এভাবেই চলে। এখন আমি কী উত্তর দেব? অনেক কিছু আছে, যা বললে বিতর্ক হবে। আমি তা চাই না।
কখনো কি মনে হয়, জাতীয় দলে আপনি ভুল সময়ে এসেছিলেন। যে কারণে আপনাকে মাশরাফি বিন মুর্তজার ছায়ায় পড়ে থাকতে হয়েছিল…
রুবেল: কথা হচ্ছে, পারফর্ম করলে আপনাকে খেলাতে হবেই। মাশরাফি ভাই আমাদের সেরা বোলার ছিলেন তখন; কিন্তু তিনি তো ২০১১ বিশ্বকাপ খেলতে পারেননি। আমি খেলেছি, শফিউল খেলেছে। মাশরাফি ভাইয়ের টার্নিং পয়েন্ট ২০১৫ বিশ্বকাপ। অ্যাডিলেডের ওই ম্যাচ না হলে মাশরাফি ভাই অতটা হাইলাইটেড হতেন না।
অ্যাডিলেডের সেই ম্যাচ তো আপনার। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আপনিই জিতিয়েছিলেন বাংলাদেশকে…
রুবেল: কিন্তু মাশরাফি ভাই ওইখান থেকেই অধিনায়ক হিসেবে আরও বেশি ফোকাসে আসেন। বোলার হিসেবে মাশরাফি ভাই অবশ্যই ভালো; আবার বাংলাদেশের ওয়ান অব দ্য বেস্ট ক্যাপ্টেন, এটিও স্বীকার করতে হবে; কিন্তু ভালোর তো শেষ নেই।
আপনার বোলিং, উইকেট পাওয়ার পর উদ্যাপন—এগুলোর মধ্যে সব সময় একটি আক্রমণাত্মক ভাব থাকত। বিষয়টি কি এমন, নিয়মিত খেলার সুযোগ পেতেন না বলেই সুযোগ পেলে দেখিয়ে দেওয়ার ক্ষুধাটা বেশি থাকত?
রুবেল: আমি এমন বোলার, চাইলেও আস্তে বল করতে পারব না। একটি উদাহরণ দিই—নাহিদ রানাকে যদি বলেন ১৩০-এ বল করতে ও জীবনেও পারবে না। হয়তো আমার শক্তি কমতে পারে, পেস কমতে পারে; কিন্তু আমি তো জোরেই মারছি! আমার স্ট্রেন্থ হচ্ছে পেস। উইকেট পাওয়ার পরে সেলিব্রেশনের কথা বললেন, এটি ন্যাচারাল। হ্যাঁ, একটি জেদ তো কাজ করবেই। অনেক কিছু হয়েছে আমার সঙ্গে।
একটু কি ধারণা দেবেন সে ব্যাপারে?
রুবেল: ধরুন, আমরা নিউজিল্যান্ডে যাচ্ছি। আমি জানতাম, প্রথম দুটি ম্যাচ আমি খেলব না। ৩ নম্বর ম্যাচে সুযোগ পেলেও পেতে পারি। অর্থাৎ আমি আগে থেকেই জানি যে খেলব না! আবার যখন দেখতাম প্রথম দুই ম্যাচে আমরা হেরে গেছি, বোলাররা খারাপ করেছে, তার পরও আমি তৃতীয় ম্যাচে সুযোগ পাইনি, তখন কষ্টের শেষ থাকত না। আমাদের নাজমুল (নাজমুল হাসান) ভাইয়ের জীবনটিও এভাবেই গেছে। এক–দুই ম্যাচ খেলেই বাদ পড়ে যেতেন। আমার জীবনে আরও একটা ঘটনা আছে, ২০১৯ সালের বিশ্বকাপে। সেটিও আমি বিস্তারিত বলব না। আমি আসলে পরিস্থিতির শিকার। বিশ্বকাপ থেকে আমার দেশে চলে আসার অবস্থা হয়েছিল। ছোট একটি চোট ছিল; কিন্তু ওটা ভালো হয়ে গিয়েছিল, প্র্যাকটিস ম্যাচে বলও করছি। তারপরও…। যা–ই হোক, আমাকে হয়তো ওভাবেই দেখা হয়েছিল। সে জন্য প্রতিটি ম্যাচই আমার জন্য ছিল চ্যালেঞ্জিং। ‘আমাকে ভালো করতে হবে’—এই জিনিসটি আমার ভেতরে সব সময় কাজ করত। আমাকে যেভাবে বলত, আমি সেভাবেই করার চেষ্টা করতাম। বাংলাদেশ দলে আমার আগে স্লগ ওভারে কে বোলিং করতে চাইত? কেউ চাইত না। স্লগ ওভারে বোলিং করা অনেক চ্যালেঞ্জিং। মুস্তাফিজের মতো আমার তো কাটার নেই। আমাকে আমার সীমিত সামর্থ্যের ভেতর থেকে সাফল্য বের করে আনতে হতো। ইয়র্কারের ওপরে আমার বিশ্বাস রাখতে হতো। সেটিতে না হলে স্লোয়ার নইলে বাউন্সার—এই তিনটিই আমার স্ট্রেন্থ।
আপনার বোলিং অ্যাকশন একটু বিচিত্রই ছিল। কিছুটা লাসিথ মালিঙ্গার মতো, আবার ঠিক পুরোপুরি ওই রকম নয়। আপনার বোলিংয়ে অ্যাকশনের ভূমিকা কতটুকু ছিল?
রুবেল: ২০১৯ সালের দিকে এসে অ্যাকশন একটু বদলে যায়। ২০১২ সালে চট্টগ্রামে কাঁধের লিগামেন্ট ছিঁড়ে গিয়েছিল। তখন থেকে বোলিং ড্রিল করতে করতে আস্তে আস্তে অ্যাকশনটা একটু ওপরের দিকে উঠছে; কিন্তু আমার পেস কমেনি। ২০১৫ বিশ্বকাপে আমি ভালো জোরে বল করছি। হাইয়েস্ট স্পিডের ভেতরে আমিও থাকতাম; আর আমার ১২৯টি ওয়ানডে উইকেটের মধ্যে ৬০ থেকে ৭০টি উইকেট পাবেন রিভার্স সুইংয়ে—বোল্ড না হলে ইয়র্কারে। এটি হয়েছে আমার অ্যাকশনের কারণে।
আপনার স্মরণীয় ম্যাচ কোনটি?
রুবেল: অবশ্যই অ্যাডিলেডের ওই ম্যাচ। এটি ছিল বিশ্বকাপের চ্যালেঞ্জিং ম্যাচ, জিতলেই কোয়ার্টার ফাইনাল, অনেক চাপ ছিল। সবকিছু মিলিয়ে এটিই আমার জীবনের সেরা ম্যাচ।
আর যদি জানতে চাই কোন ম্যাচটা ভুলে যেতে চাইবেন?
রুবেল: নিদাহাস ট্রফির ফাইনাল ম্যাচটা আমাকে অনেক কাঁদিয়েছে, দিনেশ কার্তিক যেটিতে মারল। শ্রীলঙ্কায় ওই জেতা ম্যাচটি আমরা হারলাম, ওটি নিয়েই আমার আফসোস। আমি একটু তাড়াহুড়া করেছি, সাকিব ভাইয়ের সঙ্গে আরেকটু কথা বলতে পারতাম। আসলে প্রথম বাউন্ডারি খাওয়ার পরই আমি ঘাবড়ে গিয়েছিলাম।
কিন্তু সবাই তো ২০০৯ সালের মিরপুরের ম্যাচটি নিয়েই বলে, মুরালিধরন যেটিতে আপনাকে মেরে শ্রীলঙ্কাকে ম্যাচ জিতিয়ে দিল…
রুবেল: না, ওটি নয়। ২০০৯ সালের ওই ম্যাচ ছিল মাত্র আমার দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ম্যাচ। অনেক দর্শক ছিল মাঠে, ২৫–২৬ হাজার। এত দর্শকের সামনে আমি নার্ভাস ছিলাম, ফিল্ড প্লেসিং এ–ও ঝামেলা ছিল।
আপনি তো এখন মোটরবাইক ব্যবসায়ী। ক্রিকেটের সঙ্গে কোনোভাবে জড়ানোর ইচ্ছা আছে?
রুবেল: ইচ্ছা আছে, আমি ক্রিকেটের সঙ্গে থাকতে চাই। তাতে মাঠের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে।