তারুণ্যের হাত ধরে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি আরও শক্তিশালী অবস্থানে যাবে, এমনটা বোঝা যাচ্ছে গত বছরের নানা আয়োজন, নানা ঘটনা দেখে। আর প্রযুক্তির এই মহাযজ্ঞে এগিয়ে আছেন তরুণেরাই। তথ্যপ্রযুক্তির নানা খাতে জড়িত কয়েকজন তরুণ জানিয়েছেন ২০১৬ সালে তাঁদের প্রত্যাশা—
তথ্যপ্রযুক্তির স্ফুলিঙ্গ এবার দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে
এস এম আশ্রাফ আবির
পরিচালক
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস)
বছরের বিদায়লগ্নে একটা সংবাদ দেখেই মনটা ভালো হয়ে গেল, আমাদের দেশের ই-কমার্স উদ্যোগ চালডাল ডট কম ফোর্বস সাময়িকীর এই বছরের সেরা ১০ উদ্যোগের মধ্যে একটি বলে ফিচার করেছে। চালডালের মতো উদ্যোগ আমাদের অনুপ্রেরণা জাগায়। ২০১৫ সালে বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির যে স্ফুলিঙ্গ দেখেছি আমরা, ২০১৬ সালে তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়বে বলে আমার বিশ্বাস। নতুন এই বছর আমাদের দেশের তথ্যপ্রযুক্তির জন্য ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। গত কয়েক বছরে সারা দেশে তথ্যপ্রযুক্তির যত কাজ হয়েছে, তা থেকে আমরা তরুণেরা একটা বিষয় অন্তত শিখতে ও বুঝতে পেরেছি যে পণ্য তৈরির বিষয় ছাড়া আমরা বিলিয়ন ডলারের বিশ্ববাজারে কখনোই পৌঁছাতে পারব না।
মোবাইল ফোনভিত্তিক সেবা, ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি, মেশিনলার্নিং বা ইন্টারনেট অব থিংসের দুনিয়ায় আমরা এখন। তার থেকে বড় কথা, আমরা এই প্রযুক্তিগুলো উদ্ভাবনে অবদান রাখছি। বাংলাদেশে স্মার্টফোনের বিশাল বাজার তৈরি হয়েছে। ইন্টারনেট ব্যবহার বাড়ছে। আমরা যারা তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছি, আমাদের জন্য এই বিশাল স্মার্ট জনগোষ্ঠী অনেকটা আশীর্বাদের মতো। আমাদের কন্টেন্ট উদ্ভাবন, প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এই নতুন বছরেই। বেসিস গত বছরে যারা নতুন সদস্য হয়েছে, তাদের সিংহভাগ প্রতিষ্ঠান হয় ই-কমার্স বা মোবাইল অ্যাপ বা গেমভিত্তিক। বেসিসের ওয়ান বাংলাদেশের অন্যতম লক্ষ্য দেশের প্রযুক্তির বাজার ১ বিলিয়ন ডলারের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বাজারে উন্নীত করা। এ জন্য সরকারকে একটা বড় ভূমিকা রাখতে হবে।
২০১৬ সালটি হবে আরও চ্যালেঞ্জিং
সাদেকা হাসান
প্রতিষ্ঠাতা
আমার দেশ আমার গ্রাম
২০১৫ উদ্যোক্তা, ই-কমার্সসহ নারীদের জন্যও ভালো একটি বছর ছিল। বিভিন্ন পর্যায়ের নানা ধরনের সহযোগিতার বিষয়গুলো বেড়েছে। সরকারি পর্যায় থেকে শুরু করে অন্যান্য বিভিন্ন উদ্যোগগুলো ২০১৫ সালে বেশ বেড়েছে। আরেকটি বিষয় হয়েছে মানুষের সচেতনতা বা ই-কমার্স, উদ্যোক্তাদের সহায়তা ইত্যাদি বিষয়গুলো আগের চেয়ে বেড়েছে। এ হিসেবে বলা যায় ২০১৬ সালটি হবে আরও চ্যালেঞ্জিং। অবশ্যই ভালো করার দারুণ সুযোগ তৈরি হবে। কাজের পরিমাণ যেমন বাড়বে তেমনি উদ্যোক্তা কিংবা ই-কমার্স নিয়ে কাজের পরিমাণও বাড়বে। নতুন যাঁরা উদ্যোক্তা হতে চান বিশেষ করে নারীদের এ বছর এগিয়ে আসার দারুণ একটা ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। এ বছরকে সঠিক কাজে লাগাতে পারলে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে ভালো কিছু করার বিষয়টি আরও সহজ হয়ে যাবে।
নতুন বছর হোক উত্পাদন আর কাজ সৃষ্টির বছর
শফিউল আলম
প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা,
বিল্যান্সার
২০১৬ শুরু হতে পারে ‘বাংলাদেশ নাউ—আউটসোর্সিং অ্যান্ড স্টার্টআপ’ স্লোগানে। আমাদের তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক নানা আয়োজন, অগ্রগতি ছিল ২০১৫ সালে। ২০১৬ সালটি হোক শুধুই বাস্তবায়ন আর অর্জন। একটি সম্মিলিত উদ্যোগে তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে পারলে এগিয়ে যাওয়াটা সহজ হবে। শুরুটা হতে পারে ইন্টারনেট অবকাঠামো নিয়ে, যার সাহায্যে সবখানে সমান মূল্যে (৩০০ টাকায়) উচ্চগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট-সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সব শিক্ষা উপকরণ ডিজিটাল ও বাংলায় করে বিনা মূল্যে তৈরি করা এবং বিতরণ করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
কম দক্ষতাসম্পন্ন কাজের আউটসোর্সিংকে (বিশেষ করে নন-ভয়েস) সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে আন্তর্জাতিক একটি বাজার তৈরি করা এবং হাইটেক পার্কগুলোতে ছোট ছোট কোম্পানিগুলোকে তিন বছরের জন্য বিনা মূল্যে ইজারা প্রদান করাও যেতে পারে। এতে আগামী ১০ বছরের মধ্যে তৈরি পোশাক শিল্পের চেয়ে বড় শিল্প খাত হিসেবে গড়ে উঠতে পারে এটি। সব মিলিয়ে ২০১৬ সাল হোক উৎপাদন আর কাজ সৃষ্টির বছর।
এবার লক্ষ্য বিশ্ব আসরে ভালো করা
সাদিক মো. নাফিস
কম্পিউটার প্রোগ্রামার
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে ২০১৫ সালটা আমাদের অনেক ভালো ছিল। ২০১৪ সাল থেকেই আমাদের পরিকল্পনা ছিল ২০১৫ সালে আঞ্চলিক প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় সেরা হব। আমরা আমাদের লক্ষ্য পূরণ করতে পেরেছি। এবার ২০১৬ সালে আমরা প্রোগ্রামিংয়ের সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা এসিএম আইসিপিসিতে অংশ নেব। এবার লক্ষ্য এ বিশ্ব আসরে ভালো করা। এই নিয়ে দুবার আমরা এসিএম আইসিপিসিতে যোগ দেব। তাই সর্বোচ্চ ভালো করার চেষ্টা থাকবে। আমাদের দেশে প্রোগ্রামিংয়ের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায় বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এসে প্রোগ্রামিং শেখানোর কাজটি শুরু হয়।
রাশিয়া, চীনসহ যে দেশগুলোর শিক্ষার্থীরা প্রোগ্রামিংয়ে ভালো করছে, তারা স্কুল পর্যায় থেকেই প্রোগ্রামিংয়ে শেখা শুরু করে। আমাদের দেশেও স্কুল পর্যায় থেকে প্রোগ্রামিংয়ের বিষয়টি শুরু করতে পারলে সফলতা আসবে। যেহেতু প্রোগ্রামিংয়ে গণিত এবং যুক্তির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, তাই এ বিষয়গুলোতে ছোটবেলা থেকেই জোর দিলে প্রোগ্রামিংয়ে ভালো করা সম্ভব। এ বছর আন্তর্জাতিক আসরে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ ভালোটা করতে চাই।
প্রযুক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে কাজ করতে চাই
ফারাহ নাজিফা
লিড, গুগল ওমেন টেকমেকারস বাংলাদেশ
২০১৫ সালে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের অংশগ্রহণে আন্তর্জাতিক নারী দিবসসহ অন্যান্য কার্যক্রম করেছে গুগল ওমেন টেকমেকারস বাংলাদেশ। প্রযুক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং পর্যাপ্ত রিসোর্স রাখার বিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। গত বছর আমরা প্রথম ওমেন টেক ফেস্ট করেছি বাংলাদেশে। এ ছাড়া ছিল সারা দেশে গুগল অ্যান্ড্রয়েড স্টাডি জ্যাম। এতে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনা মূল্যে অ্যান্ড্রয়েড ডেভেলপমেন্ট প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এ আয়োজনে নারীদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। সব মিলিয়ে ২০১৫ সালে আমরা নানা ধরনের উদ্যোগ নিয়েছি নারীদের জন্য।
একই ভাবে ২০১৬ সালেও আমরা প্রযুক্তি, ইলেকট্রনিকস, হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার রোবট ইত্যাদি প্রযুক্তির ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ব্যাপারে কাজ করতে চাই। ফ্রিল্যান্সিংয়ে নানা ধরনের কাজ করে নিজেদের দক্ষতা ও জ্ঞান বাড়ানোর বিষয়েও নারীদের কাজ করা উচিত। অ্যান্ড্রয়েড ডেভেলপমেন্ট, ওয়েব ডেভেলপার, নকশাকারী, উদ্যোক্তা, ই-কমার্স, কারিগরি-বিষয়ক লেখা ইত্যাদি খাতেই যাতে আমাদের দেশের নারীদের উপস্থিতি এবং অংশগ্রহণ বাড়ে, সে ব্যাপারে এ বছরে আরও কাজ করবে ওমেন টেকমেকারস বাংলাদেশ।
গেমস খাতের উন্নয়ন দরকার
মাশা মুস্তাকিম
প্রকল্প প্রধান
হিরোজ অব ৭১
২০১৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের প্রথম গেম হিরোজ অব ৭১ মুক্তি পেয়েছে। আমরা বেশ সাড়া পেয়েছি। বলা যায় আমাদের প্রথম গেম তৈরির বছর ছিল ২০১৫।
২০১৬ সালে আমরা আরও কিছু কাজ করতে চাই। তবে কিছু বিষয় আসলে নজর দেওয়া উচিত, বিশেষ করে গেম তৈরিতে। বাংলাদেশে যেহেতু এখনো গেম তৈরির বিষয়টি সেভাবে শুরু হয়নি, তাই অনেক ধরনের সমস্যা রয়ে গেছে। এটাও যে একটা বড় খাত হতে পারে সেটি সেভাবে এগিয়ে যায়নি। পাশাপাশি এ খাতে কাজ করার ক্ষেত্রেও যে পড়াশোনার প্রয়োজন আছে, চিন্তাভাবনা ও সেটির বাজার তৈরি করার বিষয় আছে সেটিও এখনো দাঁড়ায়নি। এ জন্য সচেতনতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। পাশাপাশি আমাদের দেশে এখনো সফটওয়্যার বা গেম যে কিনে ব্যবহার বা খেলতে হয়, সেটিও গড়ে ওঠেনি। পাইরেসির বড় একটি সমস্যা রয়েছে। এ বিষয়গুলোকে গুরুত্ব সহকারে যদি ২০১৬ সালে দেখে কাজ করা যায়, তাহলে এ খাত অনেক এগিয়ে যেতে পারে। আমাদের পাশের দেশেই ইন অ্যাপ পার্সেজ বিষয়টি বেশ জনপ্রিয় এবং সেটি একটি ব্যবসায়িক মডেলও। আমাদের এখনো দেশীয় মুদ্রায় সেটি কেনারও কোনো ব্যবস্থা নেই। দেশীয় নির্মাতাদের তৈরি গেমস খেলতে দেশের মানুষই আগ্রহী, তবে এর কোনো সঠিক ব্যবসায়িক মডেল না থাকায় বিষয়টা এগোচ্ছে না। ২০১৬ সাল হোক তার শুরুটা।