যেভাবে গুগলে বাংলা খবর

গুগলের অফিসে বসে কথা বলছেন প্রথম বাংলাদেশি গুগলার শিশির খান (ডানে) ও দেড় বছর আগে যোগ দেওয়া নিয়াজ আহমেদ l ছবি: প্রথম আলো
গুগলের অফিসে বসে কথা বলছেন প্রথম বাংলাদেশি গুগলার শিশির খান (ডানে) ও দেড় বছর আগে যোগ দেওয়া নিয়াজ আহমেদ l ছবি: প্রথম আলো

‘২০% টাইম’ বলে দারুণ একটা কথা চালু আছে গুগলে। অর্থাৎ, গুগলকর্মীদের যে-কেউ তাঁদের নির্দিষ্ট কাজের বাইরে ২০ শতাংশ সময় (সপ্তাহে এক দিন) পছন্দমতো অন্য যেকোনো একটা প্রকল্পে ব্যয় করতে পারবেন। হতে পারে সেটা নিজেরই আইডিয়া বা নিজের পছন্দের অন্যের কোনো আইডিয়া। এর জন্য কোনো জবাবদিহিও নেই। ‘উদ্ভাবন করো নিজের মতো! দারুণ কিছু হয়ে গেলে সেটা মর্যাদা পাবে নতুন প্রকল্পের।’ আর এই ২০% সময়ের হাত ধরেই গুগলে একে একে জন্ম নিয়েছে জিমেইল, গুগল ম্যাপস, গুগল টক, অ্যাডসেন্স, গুগল ট্রানজিট ও গুগল নিউজের মতো ঐতিহাসিক সব প্রকল্প।

গুগল সংবাদে বাংলায় পাওয়া যাচ্ছে খবর

২০০২ সালের সেপ্টেম্বরে এই ২০%-এর আওতায় গুগলের গবেষক কৃষ্ণ ভারতীর হাত ধরে প্রথম আলোর মুখ দেখে গুগল নিউজ। এরপর নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাঝে পেরিয়ে যায় চার বছর। ২০০৬ সালের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে গুগলের এই সংবাদসেবা চালু হওয়ার পর এতে একে একে যুক্ত হতে থাকে বিভিন্ন ভাষার সংবাদ। জনপ্রিয়ও হয় দারুণ। কিন্তু এ তালিকায় বাংলা ছিল না। এবার তিন বাংলাদেশি গুগলারের (গুগলের কর্মী) ২০% সময়ের হাত ধরে আলোর মুখ দেখল গুগলের বাংলা সংবাদসেবা। ৯ সেপ্টেম্বর news.google.com.bd ঠিকানায় চালু হওয়ার পর এখানে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১০০টিরও বেশি সংবাদমাধ্যমের নানা ধরনের বাংলা সংবাদ। এ নিয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিতও তিন বাংলাদেশি গুগলার। তাঁদের মধ্যে গুগলের কারিগরি প্রোগ্রাম ব্যবস্থাপক শিশির খান ও পার্টনার টেকনোলজি ম্যানেজার নিয়াজ আহমেদ কাজ করেন গুগলের ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেন ভিউয়ের প্রধান কার্যালয়ে আর সফটওয়্যার প্রকৌশলী আবদুল্লাহ আল-নাঈম কাজ করেন গুগলের পেনসিলভানিয়ার পিটসবার্গ অফিসে।
‘আসলে বাই ডিফল্ট বাংলাদেশে মানুষ খুবই রাজনীতিসচেতন। আমাদের টিভি খুললে খবর, পত্রিকায় খবর, ওয়েবসাইটে খবর। এ খবরই আমাদের অন্যতম বিনোদন। আমি নিজেও খুব খবর ভালোবাসি। প্রতিদিন প্রায় ৩০টা দেশি-বিদেশি খবরের কাগজে তো চোখ বুলানো হয়ই। এদিকে গুগল চায় তাদের পণ্য সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ুক আর আমরা এখানে যারা গুগলে কাজ করি, তারাও চাই এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের জন্য কিছু একটা করতে। কাজেই যখন গুগল নিউজের এই সুযোগ আমাদের হাতে এল, আমরা সেই সুযোগ কাজে লাগালাম।’ গুগলের প্রধান কার্যালয় গুগলপ্লেক্সের একটা সভাকক্ষে বসে এই প্রকল্পে নিজের সম্পৃক্ততার কথা বলছিলেন শিশির খান।
আলাপচারিতায় নিয়াজ বলেন, ‘বাংলাদেশেই আমার বেড়ে ওঠা। সেখান থেকে এ লেভেল শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে এসে আরও পড়াশোনা করে গুগলে যোগ দিয়েছি দেড় বছর হলো। দেশের খবরের জন্য সারাক্ষণই অনলাইনে ঢুঁ মারি। আমরা গুগলে যারা বাংলাদেশি আছি, তারা পরস্পরের সংস্পর্শে থাকি বেশ ভালোভাবেই। তাই গুগল নিউজে বাংলাদেশকে যুক্ত করার এই প্রকল্পের কথা যখন শিশির খান আমাকে জানালেন, আমি খুব আগ্রহ নিয়ে এটায় কাজ শুরু করলাম। এর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আমাদের অনলাইন সংবাদের ইউআরএল (ওয়েব ঠিকানা) বিন্যাসের ত্রুটি। এটা পুরোটাই একটা স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। ম্যানুয়ালি আমরা কিছুই করি না। তাই কোনো সংবাদপত্র যদি তাদের খেলার খবর বিনোদন বিভাগে দিয়ে রাখে, তাহলে সেটা বড় সমস্যা হয়ে যায়। এ ত্রুটি কাটিয়ে ওঠার জন্যই আমরা পরিশ্রম করেছি।’

একপর্যায়ে ভিডিও কনফারেন্সে যোগ দেন আবদুল্লাহ আল-নাঈম

ততক্ষণে গুগল হ্যাংআউটের মাধ্যমে বড় পর্দায় পিটসবার্গ থেকে আমাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন নাঈম। তিনি বললেন, ‘এ প্রকল্পটা যখন করি, তখন মাথায় ছিল আমার বাবার কথা। তিনি খবরের জন্য একবার পত্রিকা, আরেকবার টিভি ইত্যাদি সাহায্য নিতেন। এখন তিনি একটা জায়গায় সব খবর দেখতে পান। এটা আমার জন্য বেশ আনন্দের।’
অন্যান্য ভাষার গুগল নিউজের সঙ্গে আমাদের উৎকর্ষের জায়গা বিচারে শিশির খান বলেন, ‘সারা বিশ্বের ৪৫টি দেশের ২৮ ভাষায় এখন গুগল সংবাদসেবা পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের খবরের উৎসগুলো পৃথিবীর অন্যান্য সংবাদমাধ্যমগুলোর মতো এত দ্রুত হালনাগাদ দিতে পারে না। ফলে গুগল নিউজ ইংরেজিতে যখন দেখবেন একটু পরপরই হালনাগাদ হচ্ছে, সেখানে বাংলা সংবাদগুলো ততটা দ্রুত হচ্ছে না। তাই এর মান বাড়ানোর দায়িত্বটা কিন্তু আমাদের নিজেদেরই। এটা গুগল করে দেবে না। আর এর ব্যবহারকারীরাও চাইলে নানাভাবে সাজিয়ে নিজের পছন্দের খবর দেখতে পারবেন, অ্যাপ আর ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক বাংলা খবরের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন। পুরোপুরি যন্ত্রনির্ভর এ সেবার ব্যবহার যত বাড়বে, তত এর মান বাড়বে এবং ব্যবহারকারীরা দ্রুত বেশি বেশি সংবাদ পেতে থাকবেন।’

তাঁরা জানান, যেকোনো প্রকাশক ইচ্ছা করলে গুগল নিউজ পাবলিশার সেন্টারে নিজেদের সংবাদের ওয়েবসাইটের ঠিকানা জমা দিতে পারবেন এই ঠিকানায় গিয়ে: https://goo.gl/QwF2QD। যত বেশি মৌলিক সংবাদ উৎস এর সঙ্গে যুক্ত হবে, তত বেশি সংবাদও যুক্ত হতে থাকবে।

এই তিন গুগলারের ইচ্ছে আছে ভবিষ্যতে সরাসরি বাংলাদেশের মানুষের কাজে লাগে—এমন বেশ কয়েকটি প্রকল্পে কাজ করার। আর সবাই মিলে প্রযুক্তির উন্নয়নের পথে বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার।