পরামর্শ

সৃজনশীলপ্রশ্নপদ্ধতি এত সহজ

জেএসসির প্রস্তুতি: সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর লেখার নিয়ম অংশ-৪

প্রিয় জেএসসি পরীক্ষার্থী, আমরা বাংলা ১ম পত্রে সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতির খুঁটিনাটি ও অধ্যায়ভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন অধ্যায়ের বিষয়বস্তু, ভাব (theme), পাঠ্য করার প্রেক্ষাপট তথা উদ্দেশ্য ও শিখনফল, সেখান থেকে কীভাবে সৃজনশীল প্রশ্ন হতে পারে তার কিছু নমুনা এবং কিছু প্রশ্নের নমুনা উত্তরসহ আলোচনা করছি। গতকালের পর আজ দেওয়া হলো পরবর্তী অংশ।

উদ্দীপক-৩:
মাঝিপাড়া গ্রামের দরিদ্র মকবুল তিন বিয়ে করেছে। নিজের কোনো আয়-রোজগার নাই। বউদের আয়ে সংসার চলে ওর। ১৫-২০ বছর ধরে চলছে এ অবস্থা। বউরা চাটাই বোনে, ধান ভানে, অন্যের বাড়িতে ঝিগিরি করে আর কখনো বা কোদাল দিয়ে কুপিয়ে জমি চাষ করে। অথচ কারণে-অকারণে বিভিন্ন সময় তাদের নানা রকম গঞ্জনা সইতে হয়। একদিন মকবুল চতুর্থ বিয়ে করতে চাইলে দুই বউ যখন বাধা দিয়েছিল, তখন মকবুল একসঙ্গে দুজনকেই তালাক দিয়ে দেয়। উপায়ান্তর না দেখে অসহায় অবস্থায় তারা দুজনই তাদের এত বছরের তিল তিল করে গড়ে তোলা সংসার ছেড়ে বাধ্য হয়ে বাবার বাড়ি চলে যায়। তার পরও মকবুলের কোনো অনুশোচনা হয় না।
উদ্দীপকটি তৈরির পর শিক্ষক যথারীতি আগের মতো চার স্তরের চারটি প্রশ্ন করলেন। প্রশ্নগুলো হলো:
ক. যুগের ধর্ম কী? (জ্ঞানমূলক প্রশ্ন, মান-১)
খ. কবির চোখে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নেই কেন? (অনুধাবনমূলক প্রশ্ন, মান-২)
গ. উদ্দীপকে ‘নারী’ কবিতার যে ভাবের প্রতিফলন ঘটেছে, তা ব্যাখ্যা করো। (প্রয়োগমূলক, মান-৩)
ঘ. মকবুলের মতো লোকদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে ‘নারী’ কবিতায় কাজী নজরুল ইসলাম যে পরামর্শ দিয়েছেন, তা ব্যাখ্যা করো।
(উচ্চতর দক্ষতামূলক প্রশ্ন, মান-৪)
স্যার এবার পরিতৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। একটি কবিতা থেকেই তিনি ভিন্ন ভিন্ন ভাবের তিনটি উদ্দীপক তৈরি করে ফেলেছেন। শিক্ষকের মনে হচ্ছে আরও অগণিত উদ্দীপক তিনি তৈরি করতে পারবেন। কারণ সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরির রহস্যটি তাঁর জানা হয়ে গেছে। আচ্ছা শিক্ষার্থী তোমরাও কি রহস্যটা বুঝতে পেরেছি? আমার মনে হচ্ছে তোমরাও নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ।
শিক্ষক একটি সৃজনশীল প্রশ্নের একটি নমুনা উত্তর লিখবেন। আমরা সেই উত্তরটিও তোমাদের দেখাব।
হ্যাঁ, আমরা দেখতে পাচ্ছি বিরতির পর শিক্ষক এসে নমুনা উত্তর লিখতে বসলেন। তিনি ৩ নম্বর প্রশ্নের উত্তর লিখবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। উত্তর লেখার আগে তিনি চিন্তন দক্ষতার চারটি স্তর সম্পর্কে নিজেই একটু ভেবে নিলেন। শিক্ষকের জানামতে, জ্ঞানস্তর হলো চিন্তন দক্ষতার সর্বনিম্ন স্তর। এর অর্থ পূর্বের জানা কোনো জিনিস স্মরণ করা। এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর শিক্ষার্থী মুখস্থ করে দেবে। আমাদের পাঠ্যবইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ে লক্ষ লক্ষ তথ্য (information) রয়েছে। সেখান থেকে যেকোনো একটি তথ্য জানতে চাওয়ার নামই জ্ঞানমূলক প্রশ্ন।
মনে রাখতে হবে, একটি তথ্যই একটি জ্ঞান। এই তথ্যগুলো থাকে text (মূল গল্প, কবিতা বা উপন্যাস, নাটক) এবং context (কবি/ লেখক পরিচিতি, পাঠ পরিচিতি, শব্দার্থ, টীকা ইত্যাদি) এ। যেমন ৩ নম্বর প্রশ্নের জ্ঞানমূলক প্রশ্নটি (ক. যুগের ধর্ম কী?) করা হয়েছে text থেকে। এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর বইয়ে উল্লেখ আছে। শিক্ষার্থী তার স্মৃতি থেকে উত্তরটি লিখে দেবে। আর সেই উত্তর সে লিখতে পারে একটি শব্দে বা একটি বাক্যে। তবে একটি বাক্যে লিখলে ভালো। এরপর দেখি, শিক্ষক ভাবছেন অনুধাবনমূলক প্রশ্ন নিয়ে।
অনুধাবন স্তর হলো চিন্তন দক্ষতার দ্বিতীয় স্তর। ‘অনুধাবন’ বলতে কোনো বিষয়ের অর্থ বোঝার ক্ষমতাকে বোঝায়। যা হতে পারে তথ্য, নীতিমালা, সূত্র, নিয়ম, পদ্ধতি, প্রক্রিয়া ইত্যাদি বুঝতে পারা। এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য জ্ঞানস্তরের তুলনায় অধিকতর দক্ষতার প্রয়োজন হয়। অর্থাৎ পাঠ্যবইয়ে বিভিন্ন ঘটনা বা বিষয়বস্তুর বিবরণ দেওয়া থাকে। এ ধরনের প্রশ্নে সরাসরি পাঠ্যবইয়ের অনুরূপ বিবরণ জানতে চাওয়া হয় না। এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীকে বিষয়বস্তু সম্পর্কে নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা বা বর্ণনা দিতে বলা হয়। যেমন ৩ নম্বর প্রশ্নের অনুধাবনমূলক প্রশ্নটি হলো ‘কবির চোখে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নেই কেন?’ এই প্রশ্নের উত্তর বইয়ে সরাসরি উল্লেখ নেই। কবিতাটি পড়ার পরে শিক্ষার্থী বুঝবে যে সভ্যতার উন্নয়নে নারী ও পুরুষ উভয়েই সমান অবদান রেখেছে। কাজেই তাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নেই। এ বিষয়টিই শিক্ষার্থী সুন্দর করে গুছিয়ে বুঝিয়ে দেবে। একেই বলে অনুধাবন। অর্থাৎ কবি-সাহিত্যিক কোন কথা দিয়ে/ কোন বাক্য দিয়ে কী বোঝাতে চান, সেটা বুঝতে পারাই অনুধাবন। অনুধাবনমূলক প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষার্থী জ্ঞান অংশের উত্তর আগে লিখতে পারে আবার অনুধাবন অংশের উত্তরও আগে লিখতে পারে। উত্তর দুই প্যারায় লিখতে পারে, এক প্যারায়ও লিখতে পারে। তাতে নম্বর প্রদানে কোনো তারতম্য হবে না। মোট কথা, এ-জাতীয় প্রশ্নের উত্তরে দেখতে হবে জ্ঞান আর অনুধাবনের উত্তর হয়েছে কি না। যদি হয়ে থাকে, তাহলে শিক্ষার্থী পূর্ণ নম্বরই পাবে। এবার শিক্ষক স্মৃতিচারণ করছেন প্রয়োগমূলক স্তরের।

মাস্টার ট্রেইনার, সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি, বাংলা বিভাগীয় প্রধান, সেন্ট গ্রেগরি উচ্চবিদ্যালয়, ঢাকা

পরবর্তী অংশ ছাপা হবে আগামী শনিবার