বা ং লা ১ ম প ত্র

২০১৪ সালের এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি

.

সৃজনশীল প্রশ্ন  পরার্থে
প্রিয় শিক্ষার্থীরা, আজ বাংলা ১ম পত্রের পরার্থে কবিতার প্রেক্ষাপট ও মূলভাব নিয়ে আলোচনা করা হলো।
প্রেক্ষাপট: সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব মানুষ। শুধু দৈহিক আকৃতিতেই যে মানুষ শ্রেষ্ঠ তা নয়, বরং তার চিন্তাকর্মে, মেধা-মননে, আচার-আচরণে ইত্যাদি সব দিক দিয়ে বিভিন্ন প্রজাতি থেকে সে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু এর মধ্যেও কিছু মানুষ আছে, যারা সংকীর্ণ স্বার্থপরতা, লোভ-লালসা, হতাশা-গ্লানি-দুঃখবোধ ইত্যাদিতে ডুবে থাকে। অনিন্দ্যসুন্দর মানবজীবনকে নিরর্থক করে দেয়। কবি তাদের উদ্দেশে মানবজীবন সার্থক ও সুন্দর করতে মানুষের জীবনদর্শন-সম্পর্কিত একটি কবিতা লিখেছেন। যার নাম ‘পরার্থে’। কবিতাটি কামিনী রায়ের কবিতাবলি নামের গ্রন্থ থেকে সংকলিত হয়েছে।
বিষয়বস্তু: এই পৃথিবীতে বহুবিচিত্র মানুষের জীবন। নানা শ্রেণী-পেশার মানুষের বাস এখানে। এদের মধ্যে কিছু মানুষ আছে, যারা সারা জীবন দুঃখ-বিলাসিতায় কাটিয়ে দেয়। অর্থাৎ জীবনের সামান্য বিষাদ-বেদনাকে অনেক বড় করে দেখে জীবনটাকে দুঃখভারাক্রান্ত মনে করে। আবার কিছু মানুষ আছে, যারা নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য বা নিজের সুখের জন্য অন্যের সুখ নষ্ট করে, অন্যের অধিকার হরণ করে। আবার কিছু মানুষ আছে, যারা সমাজবদ্ধ সব মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক না রেখে সংকীর্ণ সীমাবদ্ধতার মধ্যে বসবাস করে। অর্থাৎ নিজেকে নিয়েই কেবল ব্যস্ত থাকে, সমাজের অন্যান্য লোকের সঙ্গে প্রীতি ও মৈত্রীর সম্পর্ক রাখে না। এ কবিতায় জীবনঘনিষ্ঠ কবি কামিনী রায় মানুষের জীবনের এই বহু বিচিত্র প্রবণতাকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, ব্যক্তিগত সুখ ভোগের চেয়ে পরের কল্যাণে জীবন উৎসর্গ করার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা। এটাই এই কবিতার মূল ভাব/ মূল চেতনা/ মূল সুর/ মূল বিষয়বস্তু/ ভাববস্তু/ প্রতিপাদ্য বিষয়/ উপজীব্য বিষয়/ কবির অনুধ্যান/ সারকথা/ মর্মকথা। কবি আরও দেখিয়েছেন, স্বার্থবুদ্ধি বা স্বার্থপরতা মানুষকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। বরং শুভবুদ্ধি, সহযোগিতা, সহভাগিতার মাধ্যমে সমাজে প্রত্যেক ব্যক্তির সঙ্গে মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের সুসম্পর্ক স্থাপন করা যায়। আর এমনিভাবে অন্যের সুখে সুখে, দুঃখে দুঃখী হয়ে নিজের দুঃখ-বেদনা ভুলে অন্যের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করলেই প্রকৃত সুখ পাওয়া যায়, তথা মানবজীবন সার্থক হয়।
দুঃখ-বিলাসী মনোভাব: এ কবিতায় কবি দেখিয়েছেন: দুর্লভ এই মানবজনমকে অধিকাংশ মানুষ নষ্ট করে দিচ্ছে। তারা শুধু সুখের পেছনে ছুটে বেড়াতে চায়। তাদের একটাই চাওয়া—ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য। যদি সেটা কোনোভাবে বিঘ্নিত হয়ে সামান্যতম বেদনাবোধও আসে, তাহলে তারা পাগলপ্রায় হয়ে সেই দুঃখবোধকে জনসমক্ষে প্রচার করতে থাকে, দুঃখবোধ নিয়ে আফসোস বা অনুতাপ করতে থাকে। কিন্তু কবি মনে করেন, কখনোই ব্যক্তিগত দুঃখবেদনাকে লোকজনের কাছে জানিয়ে তাদের কাছ থেকে করুণা ভিক্ষা করা উচিত নয়। কারণ, তাতে দুঃখ হালকা হয়ে যায়, অন্যলোক দুর্বলতার সুযোগ নেয় এবং ব্যক্তিত্বেরও হানি ঘটে। আর তা ছাড়া শুধু ‘দুঃখ দুঃখ’ করে আফসোস করারও দরকার নেই। কারণ, মানবজীবন শুধু দুঃখভারাক্রান্ত নয়, সুখ-দুঃখের সম্মিলিত রূপেরই ফসল। (যাতনা যাতনা কিসেরি যাতনা...জগৎভরে)
লুকানো বিষাদের তাৎপর্য/ গভীর কোনো দুঃখ থেকে মহৎ কিছুর সৃষ্টি হয়: কবি মনে করেন, মানবজীবনে প্রাপ্ত বিভিন্ন বিষাদ-বেদনাকে জগৎভরে লোকজনকে না জানিয়ে তা অন্তরে পুষে রাখা দরকার। কবির ভাষায়, এটাই লুকানো বিষাদ। আর এভাবে মনের মধ্যে দুঃখ-শোক লুকিয়ে রাখলে সেই শোক একসময় জমাট হয়ে শক্তিতে পরিণত হবে। যে শক্তি আমাদের মহৎ কিছু সৃষ্টিতে সাহায্য করবে। কবি তাই বিষাদ-বেদনাকে মনের গহিনে লুকিয়ে রাখতে বলেছেন। কবি এই লুকানো বিষাদকে অন্ধকার অমাবস্যার রাতে তারার মিটিমিটি আলোর স্নিগ্ধতার সঙ্গে তুলনা করেছেন। অমাবস্যার ঘোর অন্ধকারে যখন চাঁদের আলো থাকে না, তখন মানুষের চলার একমাত্র অবলম্বন হয় তারার মিটিমিটি আলো। তেমনি মানুষের জীবনও যখন দুঃখ-বিষাদে ভরপুর হয়, তখন লুকানো বিষাদ বা গভীর কোনো দুঃখবোধ মানুষকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা দেয়, নব-উদ্যমে জীবনপথে চলতে সাহায্য করে, মানুষের অন্তরাত্মাকে গভীর স্বস্তিতে ভরে তোলে। (লুকানো বিষাদ আঁধার অমায়...শান্তির প্রায়)। শুধু তা-ই নয়, মানুষের জীবনে যখন অপার শূন্যতাবোধ দেখা দেয়, নৈরাশ্য এসে গ্রাস করে তখনো মানুষের চেতনার ভেতরে একধরনের আশার সঞ্চার থাকে। ইংরেজ কবি আলেকজান্ডার পোপ বলেছেন, Hope springs eternal in the human breast. অর্থাৎ মানুষের চিত্তে আশার জাগরণ চিরন্তন। কবি তাই মানুষকে নিরাশ হতে নিষেধ করেছেন। (দুরাশার ভেরি, নৈরাশ চিৎকার, আকাঙ্ক্ষার রব ভাঙে না তায়)
মানবমনের শ্রেষ্ঠত্ব: কবি কামিনী রায় আলোচ্য কবিতায় মানবমনের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলেছেন। মনের মধ্যেই স্রষ্টার বসবাস। সেই পবিত্র অন্তরাত্মা এত ঠুনকো নয় যে সামান্য আঘাতেই তা ভেঙে যাবে। কবি তাই দুর্বল চিত্তের মানুষকে শক্তি-সাহস জুগিয়েছেন এই বলে যে জীবনে বাধা-বিপত্তি, দুঃখ-বেদনা আসবেই, কিন্তু তাই বলে কখনোই মানসিকভাবে ভেঙে পড়া যাবে না। (মানবের মন এত কি অসার, এত সহজে নুইয়ে পড়ে)
অন্যের কল্যাণে আত্মদান: এ ছাড়া কবি অন্যের সুখে সুখী হতে বলেছেন। অন্যের হাসিমাখা মুখ দেখে নিজের দুঃখ-বেদনাগুলো ভুলে যেতে বলেছেন। অন্যের কল্যাণে নিয়োজিত হয়ে নিজের দুঃখ-বেদনা ভুলে থাকতে হবে। তাহলে জীবন আনন্দমুখর হবে। সবশেষে কবি অন্যের কল্যাণের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। আর এটাই মানবধর্ম। স্বার্থপরতা, লোভ-লালসা-হীনম্মন্যতা, দুঃখ-বেদনা ইত্যাদি ভুলে গিয়ে অন্যের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করতে হবে। কারণ, এই পৃথিবীতে কোনো মানুষই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার জন্য আসেনি। আমাদের প্রত্যেকেরই জন্ম হয়েছে অন্যের জন্য। এই দর্শন মনে রাখলেই এই দুর্লভ মানবজন্ম সার্থক হবে।
# পরবর্তী অংশ ছাপা হবে বৃহস্পতিবার

সিনিয়র শিক্ষক, সেন্ট গ্রেগরী হাইস্কুল, ঢাকা