অসুস্থ হলে কোথায় যাবেন, পরীক্ষা করতে কত খরচ হবে, শহরে যাতায়াতের ব্যবস্থা কীভাবে হবে—গ্রামীণ পরিবারের কাছে স্বাস্থ্যসেবার প্রশ্নগুলো প্রায়ই এভাবে আসে। ক্যানসারের আশঙ্কা দেখা দিলে এসব প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয় ভয় ও অনিশ্চয়তা। বাগেরহাটের রামপালে সেই দূরত্ব কমানোর লক্ষ্য নিয়ে নতুন অধ্যায় শুরু করেছে আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্পের উদ্যোগ ‘আমাদের গ্রাম ক্যানসার কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার (এজিসিআরসি)’।
গতকাল শনিবার রামপালের ঝনঝনিয়া কেন্দ্রের ক্যানসার নিরীক্ষা (স্ক্রিনিং) ও মূল্যায়ন সেবার উদ্বোধন করা হয়। রামপাল ও আশপাশের অঞ্চলের মানুষকে সাশ্রয়ী খরচে ক্যানসারের প্রাথমিক পরীক্ষা, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ সেবার সঙ্গে যুক্ত করাই এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। এতে উপস্থিত ছিলেন বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন, পুলিশ সুপার মো. জামিলুর ইসলাম, সিভিল সার্জন এ এস এম মাহবুবুল আলম, জেলা পরিষদের প্রশাসক শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন প্রমুখ। সরকারি প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় মানুষের এই অংশগ্রহণ উদ্যোগটিকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতার একটি সুযোগ তৈরি করেছে।
অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম প্রতিবছর ১০০ জনের ক্যানসার স্ক্রিনিংয়ের ব্যয় বহনের প্রতিশ্রুতি দেন। নিজের এলাকা রামপালের মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে দেওয়া এই প্রতিশ্রুতি আর্থিক সীমাবদ্ধতায় পরীক্ষা করতে পিছিয়ে থাকা মানুষের জন্য সহায়ক হতে পারে।
আমাদের গ্রামের প্রাথমিক কার্যক্রমে রয়েছে পাঁচটি উদ্যোগ—স্তন ক্যানসার স্ক্রিনিং ও মূল্যায়ন, জরায়ুমুখ ক্যানসার স্ক্রিনিং ও মূল্যায়ন, ফুসফুসের ক্যানসার ঝুঁকি নিরূপণ ও মূল্যায়ন, কিডনির ক্যানসার ঝুঁকি নিরূপণ ও মূল্যায়ন এবং শিশুদের ক্যানসার সম্ভাব্য লক্ষণ শনাক্তকরণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় রেফারেল।
এ পাঁচটি উদ্যোগের কাজের ধরন এক নয়। স্তন ও জরায়ুমুখের ক্ষেত্রে স্ক্রিনিং ও মূল্যায়নের ব্যবস্থা রয়েছে। ফুসফুস ও কিডনির ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ঝুঁকি নিরূপণ ও প্রয়োজনীয় মূল্যায়নে। শিশুদের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য সতর্কসংকেত চিহ্নিত করে সময়মতো উপযুক্ত চিকিৎসকের কাছে পাঠানোই প্রধান লক্ষ্য।
সেবাগুলোর মধ্য দিয়ে একজন মানুষ নিজের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে জানতে পারবেন এবং প্রয়োজন হলে পরবর্তী পরীক্ষার বা বিশেষজ্ঞ পরামর্শের পথ খুঁজে পাবেন। প্রাথমিক মূল্যায়নে কোনো সন্দেহ দেখা দেওয়া মানেই ক্যানসার নিশ্চিত হওয়া নয়; বরং সেটি আরও পরীক্ষা ও চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার প্রয়োজন নির্দেশ করে।
আমাদের গ্রামের উদ্যোগ তাই পরীক্ষা করানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মানুষকে ফলাফল বুঝতে সহায়তা করা, পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে জানানো এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যুক্ত করাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
গ্রামের একজন মানুষের চিকিৎসার ব্যয় কেবল পরীক্ষার ফি দিয়ে নির্ধারিত হয় না। শহরে যাতায়াত, সঙ্গে একজন স্বজনের যাওয়া, কর্মদিন হারানো এবং একাধিকবার হাসপাতালে যাওয়ার খরচও পরিবারের ওপর চাপ তৈরি করে। কাছাকাছি প্রাথমিক মূল্যায়নের সুযোগ থাকলে এই চাপ কিছুটা কমতে পারে। রামপাল ও আঞ্চলিক জনগোষ্ঠীর জন্য আমাদের গ্রাম যতটা সম্ভব কম ও সাশ্রয়ী খরচে সেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে এই সুযোগ তৈরি হলে মানুষ সমস্যার আশঙ্কা নিয়েই দীর্ঘদিন অপেক্ষা করার পরিবর্তে পরামর্শ নিতে উৎসাহিত হতে পারেন।
তবে পাঁচটি উদ্যোগে সবার জন্য একই পরীক্ষা প্রযোজ্য হবে না। বয়স, উপসর্গ, আগের স্বাস্থ্যতথ্য ও ব্যক্তিগত ঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় মূল্যায়নের পরামর্শ দেবেন। সেবা গ্রহণের আগে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষা, ফি ও পরবর্তী মূল্যায়নের সম্ভাব্য খরচ সম্পর্কে কেন্দ্র থেকে জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
আমাদের গ্রামের এই কার্যক্রম সরকার ও নীতিনির্ধারকদের জন্যও বিবেচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে। গ্রামীণ এলাকায় মানুষ কীভাবে স্ক্রিনিংয়ের সেবা গ্রহণ করেন, ব্যয় কতটা বাধা হয়ে দাঁড়ায়, সন্দেহজনক ফলাফলের পর কতজন বিশেষজ্ঞের কাছে পৌঁছান এবং কোথায় অনুসরণে ঘাটতি থাকে—এসব তথ্য ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনায় কাজে লাগতে পারে।
রোগীর গোপনীয়তা বজায় রেখে সেবার তথ্য ও ফলাফল নিয়মিত পর্যালোচনা করা হলে বোঝা যাবে, স্থানীয় পর্যায়ে কোন ব্যবস্থা কার্যকর হচ্ছে এবং কোথায় আরও সরকারি বা সামাজিক সহায়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে স্ক্রিনিংয়ের সঙ্গে মূল্যায়ন, রেফারেল ও পরবর্তী যোগাযোগ যুক্ত রাখা গেলে উদ্যোগটির বাস্তব উপকার মূল্যায়ন করা সহজ হবে।
রামপালের এই উদ্বোধন তাই একটি নতুন সেবার সূচনার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টাও। এর সাফল্য ধরা পড়বে তখনই, যখন একজন মানুষ কম খরচে নিজের ঝুঁকি সম্পর্কে জানতে পারবেন, প্রয়োজনীয় চিকিৎসার পথ বুঝবেন এবং সেই পথে এগোতে সহায়তা পাবেন। আমাদের গ্রাম সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার যাত্রা শুরু করেছে।
লেখক: চিকিৎসক ও মেডিক্যাল ডিরেক্টর, আমাদের গ্রাম ক্যানসার কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, রামপাল