
১৯৬৩ সালে সোভিয়েত নভোচারী ভ্যালেন্টিনা তেরেশকোভা প্রথম নারী হিসেবে মহাশূন্যে পাড়ি জমান। তিন দিন পৃথিবীর কক্ষপথ প্রদক্ষিণ করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, মহাকাশ অভিযানে নারীরাও পুরুষদের সমান ভূমিকা রাখতে পারেন। কিন্তু তেরেশকোভার সেই সাফল্যের প্রায় দুই দশক পর ১৯৮২ সালে মহাকাশে যাওয়ার সুযোগ পান সোভিয়েত নারী নভোচারী সভেতলানা সাভিৎস্কায়া। এই দীর্ঘ বিরতিই বলে দেয় যে মহাকাশ অভিযানে নারীদের উপস্থিতি কতটা কণ্টকাকীর্ণ ছিল।
দশকের পর দশক ধরে মহাকাশ গবেষণায় কেবল পুরুষ পাইলট এবং প্রকৌশলীদেরই একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল। ২০২০ সালের জুন মাস পর্যন্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মহাকাশে যাওয়া মোট নভোচারীর মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র ১২ শতাংশ। যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই হার বাড়ছে, তবে এখনো তা সমতার চেয়ে অনেক দূরে। গবেষণায় দেখা গেছে, নারীরা মহাকাশ ভ্রমণের শারীরিক ও মানসিক ধকল পুরুষদের মতোই সমানভাবে সইতে পারেন। এমনকি কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি মিশনের জন্য নারীরা পুরুষদের চেয়ে বেশি উপযুক্ত হতে পারেন।
শত বাধা পেরিয়ে যে নারীরা মহাকাশে পৌঁছেছেন, তাঁদের প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল একেকটি ইতিহাস। ১৯৮৩ সালে প্রথম মার্কিন নারী নভোচারী হিসেবে স্যালি রাইড যখন মহাকাশে যান, তাঁকে অদ্ভুত সব প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল। এমনকি মহাকাশে মেকআপ লাগবে কি না, এমন প্রশ্নের মুখোমুখিও হয়েছিলে তিনি।
১৯৯৫ সালে আইলিন কলিন্স প্রথম নারী শাটল পাইলট হয়ে প্রমাণ করেন, মহাকাশযানও নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন নারীরা। এরপর পেগি হুইটসন মহাকাশে ৬৭৫ দিন কাটিয়ে রেকর্ড গড়েন, যা প্রমাণ করে যে নারীদের জন্য একাধিক মহাকাশ মিশন এখন নিয়মিত বিষয় হতে পারে। ২০১৯ সালে জেসিকা মেয়ার ও ক্রিস্টিনা কোচ যখন প্রথম অল-ফিমেল স্পেসওয়াক সম্পন্ন করেন, তখন তাঁরা পৃথিবীকে বুঝিয়ে দেন মহাকাশ স্টেশন মেরামতের কাজেও লিঙ্গ কোনো বাধা নয়।
সিয়ান প্রক্টর প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবে ২০২১ সালে মহাকাশে যান। তাঁর ভাষ্যে, ‘মহাকাশ মানে কেবল রকেট বা প্রযুক্তি নয়, এটি আমাদের পরিচয় বহন করে কাদের পাঠানো হচ্ছে। কাদের গল্প সবার সামনে তুলে ধরা হচ্ছে তা গুরুত্বপূর্ণ।’
এখন পর্যন্ত মহাকাশে ভ্রমণ করা ছয় শতাধিক ব্যক্তির মধ্যে মাত্র ১৩ শতাংশ নারী, যাঁদের সিংহভাগই মার্কিন নাগরিক। যদিও সামগ্রিক হার এখনো কম, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মহাকাশে এবং আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে নারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তাঁরা এখন নিয়মিতভাবে বিভিন্ন মিশনে অংশ নিচ্ছেন।
সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্তরসূরি হিসেবে ১৯৯১ সাল থেকে রাশিয়া (রসকসমস) এখন পর্যন্ত তিনজন নারীকে মহাকাশে পাঠিয়েছে। ইলেনা কন্ডাকোভা ১৯৯৪ সালে রাশিয়ার প্রথম নারী নভোচারী হিসেবে তিনি ইতিহাস গড়েন। ইলেনা সেরোভা: ২০১৪ সালে প্রথম রুশ নারী হিসেবে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন ভ্রমণ করেন। ইউলিয়া পেরেসিল্ড ২০২১ সালে মহাকাশ স্টেশনে চলচ্চিত্রের শুটিংয়ের মাধ্যমে প্রথম রুশ অভিনেত্রী হিসেবে মহাকাশে যান। আন্না কিকিনা বর্তমানে রাশিয়ার একমাত্র সক্রিয় নারী নভোচারী, যিনি ২০২২ সালে স্পেসএক্সের মাধ্যমে মহাকাশ স্টেশনে যান। কানাডা এখন পর্যন্ত দুজন নারীকে মহাকাশে পাঠিয়েছে। রবার্টা বন্ডার ১৯৯২ সালে প্রথম কানাডীয় নারী হিসেবে মহাকাশে যান। জুলি পায়েট ১৯৯৯ সালে মহাকাশে যান এবং পরবর্তী সময় ২০১৭ সালে কানাডার ২৯তম গভর্নর জেনারেল হিসেবে শপথ নেন। জেনিফার সিডি-গিবনস বর্তমানে আর্টেমিস-২ মিশনের বিকল্প নভোচারী হিসেবে কাজ করছেন।
চিয়াকি মুকাই ১৯৯৪ সালে প্রথম জাপানি ও এশীয় নারী হিসেবে মহাকাশে যান। তিনি দুবার মহাকাশ ভ্রমণের রেকর্ড গড়েছেন। নাওকো ইয়ামাজাকি ২০১০ সালে দ্বিতীয় জাপানি নারী হিসেবে মহাকাশে যান। ক্লডি হাইনিয়েরে ১৯৯৬ সালে মহাকাশ স্টেশনে যাওয়া প্রথম ইউরোপীয় নারী। সামান্থা ক্রিস্টোফোরেত্তি ২০১৪ এবং ২০২১ সালে মহাকাশ ভ্রমণে যান। তিনি ইতালির প্রথম নারী নভোচারী। চীন এখন পর্যন্ত তিনজন নারীকে মহাকাশে পাঠিয়েছে। লিউ ইয়াং ২০১২ সালে প্রথম চীনা নারী হিসেবে মহাকাশ ভ্রমণ করেন। ওয়াং ইয়াপিং ২০১৩ এবং ২০২১ সালে মহাকাশে যান। তিনি প্রথম চীনা নারী হিসেবে মহাকাশে হাঁটার রেকর্ড গড়েন। ওয়াং হাওজে ২০২৪ সালে মহাকাশে যাওয়া চীনের প্রথম নারী মহাকাশ প্রকৌশলী এবং সংখ্যালঘু মাঞ্চু জাতিগোষ্ঠীর প্রথম নারী নভোচারী।
হেলেন শারম্যান প্রথম ব্রিটিশ নাগরিক ও বেসরকারি অর্থায়নে মহাকাশে যাওয়া প্রথম নারী। সারা সাবরি ২০২২ সালে প্রথম মিশরীয় এবং প্রথম আফ্রিকান নারী হিসেবে মহাকাশ ভ্রমণ করেন। ২০২৫ সালের এপ্রিলে ব্লু অরিজিন অভিযানের মাধ্যমে প্রথমবার সম্পূর্ণ নারী ক্রু নিয়ে একটি সাব-অরবিটাল মিশন পরিচালিত হয়। এতে কেটি পেরি, লরেন সানচেজসহ মোট ছয়জন নারী অংশ নেন। মার্কিন নভোচারী সুনিতা উইলিয়ামস ৩টি মিশনে ৬০৮ দিন মহাকাশে কাটানোর জন্য বিখ্যাত। বোয়িং স্টারলাইনার সমস্যার কারণে তিনি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে ৯ মাস কাটান। ভারতীয় মার্কিন নভোচারী কল্পনা চাওলা ২০০৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি টেক্সাসের ওপর স্পেস শাটল কলম্বিয়া দুর্ঘটনায় মারা যান। তিনি ছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত প্রথম মহিলা, যিনি মহাকাশে উড়েছিলেন।
সূত্র: ইউরোপীয় স্পেস এজেন্সি ও জাতিসংঘ