আইবিএম পার্সোনাল কম্পিউটার
আইবিএম পার্সোনাল কম্পিউটার

ফিরে দেখা

পারসোনাল কম্পিউটারের ৪৫ বছর

১৯৮১ সালের আগে চাইলে পারসোনাল কম্পিউটার কেনা যেত। তবে কোনো কট্টর শৌখিন প্রযুক্তিপ্রেমী ছাড়া সাধারণ কারও জন্য তা কেনার বিশেষ প্রয়োজন ছিল না। কারণ, সাধারণ ব্যবহারকারী, শিক্ষার্থী বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানদের কাজের উপযোগী কোনো অ্যাপ্লিকেশন তখন তৈরিই হয়নি। তবে সেই বাধা দূর হয়ে যায় ১৯৮১ সালের ১২ আগস্ট। বিশ্বজুড়ে কম্পিউটিং প্রযুক্তির জগতে এক ঐতিহাসিক বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল আজকের এই দিনে।

১৯৮১ সালের ১২ আগস্ট প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান আইবিএম বাজারে নিয়ে আসে তাদের ঐতিহাসিক ‘আইবিএম মডেল ৫১৫০’। সেই কম্পিউটারকে সংক্ষেপে বলা হতো আইবিএম পিসি। টেলিভিশনের সঙ্গে যুক্ত করা সেই যন্ত্র দিয়ে যেমন টেক্সট প্রসেসিং বা লেখার কাজ করা যেত, তেমনি খেলা যেত গেমও। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কাজকে সহজ করা থেকে শুরু করে নতুন সফটওয়্যার–শিল্পের পথ তৈরির পেছনে ছিল আইবিএমের সেই অবিশ্বাস্য উদ্ভাবন। এটি কম্পিউটারকে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল।

সেই সময়ে অন্যান্য প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের মতো আইবিএমও কেবল বড় বড় প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার বিক্রি করত। তাদের ঝুলিতে পারসোনাল কম্পিউটার বলতে ছিল ৫৯ পাউন্ড ওজনের আইবিএম পোর্টেবল কম্পিউটার। এর দাম ছিল তখনকার হিসাবে প্রায় ৯ হাজার মার্কিন ডলার। তবে ফ্লোরিডার বোকা রাটনে অবস্থিত আইবিএমের জেনারেল সিস্টেমস ডিভিশন ল্যাবের পরিচালক উইলিয়াম লো একটি নতুন সম্ভাবনা দেখতে পান। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, প্রসেসিং ক্ষমতা যদি বাড়ানো যায় আর দাম কমানো যায়, তবে সাধারণ মানুষের কাছে কম্পিউটার এক নিত্যপ্রয়োজনীয় হাতিয়ার হয়ে উঠবে। ১৯৮০ সালে তিনি আইবিএমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ফ্রাংক ক্যারির কাছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও সাধারণ গ্রাহকদের জন্য ১ হাজার ৫০০ ডলারের একটি কম্পিউটারের ধারণা তুলে ধরেন। ক্যারি প্রস্তাবটি শুনে উইলিয়াম লো’কে একটি প্রটোটাইপ বা প্রাথমিক মডেল বানানোর জন্য মাত্র এক মাস এবং বাজারজাতকরণের জন্য এক বছর সময় দেন। ষাটের দশকের বিশালাকার মেইনফ্রেম কম্পিউটারের শক্তিকে সাধারণ পরিবার ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের হাতের মুঠোয় এনে দেওয়ার সেই চ্যালেঞ্জই পাল্টে দেয় ভবিষ্যৎ।

উইলিয়াম লো পদোন্নতি পাওয়ায় পুরো প্রজেক্টের দায়িত্ব দেওয়া হয় ডন এস্ট্রিজকে। গোপন এই প্রজেক্টের কোড নাম রাখা হয়েছিল প্রজেক্ট চেস। কম সময় ও নজিরবিহীন এক চ্যালেঞ্জ হওয়ায় আইবিএমের চিরাচরিত দীর্ঘ নিয়মকানুন সরিয়ে রেখে দ্রুত কাজ করার বিশেষ অনুমতি পান এস্ট্রিজ। হার্ডওয়্যারের দায়িত্বে ছিলেন বিল সিডনেস, সফটওয়্যারের দায়িত্ব নেন জ্যাক সামস, ইন্টারফেস কোড লেখেন ডেভ ব্র্যাডলি এবং ডিস্ক ড্রাইভ ও প্রিন্টারের সঙ্গে সংযোগকারী আইএসএ বাস তৈরি করেন মার্ক ডিন ও ডেনিস মোয়েলার। আর বাজারজাতকরণ বা মার্কেটিংয়ের নেতৃত্ব দেন এইচ এল স্পার্কি স্পার্কস।

আইবিএমের গবেষকেরা সবকিছু নিজেরা তৈরি না করে বাজার থেকে তৈরি যন্ত্রাংশ কিনে জোড়া দিয়ে প্রথম যন্ত্র তৈরি করেন। আইবিএম এর আগে তাদের বিক্রি করা সব পণ্যের প্রতিটি যন্ত্রাংশ নিজেরাই নকশা করে তৈরি করত। তবে লেখক জেমস কর্টাডা তাঁর আইবিএ বইয়ে উল্লেখ করেছেন, একটি নতুন পণ্য বাজারে আনতে সাধারণ নিয়মে চার থেকে পাঁচ বছর সময় লাগত। কিন্তু উদীয়মান পারসোনাল কম্পিউটারের বাজার তখন দ্রুতগতিতে এগোচ্ছিল। তখন অত সময় নষ্ট করার সুযোগ ছিল না। দলটি মাত্র ৪.৭৭ মেগাহার্টজের ইনটেল ৮০৮৮ প্রসেসর বেছে নেয়, যা ১ মেগাবাইট মেমোরি পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। অপারেটিং সিস্টেমের জন্য তারা চুক্তিবদ্ধ হয় মাইক্রোসফটের সঙ্গে, যা পরবর্তী সময়ে বিখ্যাত এমএস-ডিওএস নামে আত্মপ্রকাশ করে। প্রিন্টারের জন্য ডট-ম্যাট্রিক্স সরবরাহ করে এপসন। তখন সবচেয়ে চমকপ্রদ সিদ্ধান্ত ছিল, আইবিএম কম্পিউটারের সার্কিট ডিজাইন ও সোর্স কোড উন্মুক্ত করে দেয়। অন্যদের পিসির জন্য সফটওয়্যার বা আনুষঙ্গিক যন্ত্রাংশ বানানোর সুযোগ দেয়।

সেই সময় মাদারবোর্ড ডিজাইন করতে সময় লাগে মাত্র ৪০ দিন, আর চার মাসের মধ্যে একটি কার্যক্ষম প্রটোটাইপ তৈরি হয়ে যায়। সিয়ার্স, রোবাক অ্যান্ড কোম্পানি এবং কম্পিউটারল্যান্ডের মতো বড় বড় বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান এটি বিক্রির জন্য চুক্তি সই করে।

১৯৮১ সালের ১২ আগস্ট নিউইয়র্কের ওয়ালডর্ফ হোটেলে ডন এস্ট্রিজ বহুল প্রতীক্ষিত আইবিএম পিসি উন্মোচন করেন। ১৫৬৫ ডলার মূল্যের পিসিতে ১৬ কিলোবাইট র‍্যাম ছিল, কোনো ডিস্ক ড্রাইভ ছিল না। এতে সফটওয়্যার হিসেবে ছিল স্প্রেডশিটের জন্য ভিজিক্যালক এবং ওয়ার্ড প্রসেসিংয়ের জন্য ইজিরাইটার। ডিসপ্লে, দুটি ডিস্ক ড্রাইভ, প্রিন্টারসহ পূর্ণাঙ্গ সেট কিনতে দাম পড়ত প্রায় ৩ হাজার ডলার।

পারসোনাল কম্পিউটারটি সাধারণ মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করতে লর্ড, গেলার, ফেদেরিকো, আইন্সটাইন নামের বিজ্ঞাপনী সংস্থা এক কালজয়ী ক্যাশ–ইন ক্যাম্পেইন চালু করে। তারা চার্লি চ্যাপলিনের বিখ্যাত দ্য লিটল ট্র্যাম্প চরিত্রকে বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করে। বিজ্ঞাপনে দেখানো হয়, অ্যাসেম্বলি লাইনের চাপে দিশাহারা এক ছোট ব্যবসায়ী ট্র্যাম্প যখনই আইবিএম পিসি ব্যবহার করা শুরু করেন। সঙ্গে সঙ্গে ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে ওঠে শান্ত সিফনি এবং তার জীবনের সব বিশৃঙ্খলা নিমেষে গুছিয়ে যায়। এই বিজ্ঞাপন বেশ আলোচিত হয়। তখন সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পারসোনাল কম্পিউটারটির নাম পৌঁছে যায়।

১৯৮২ সালের শেষের দিকে প্রতি সপ্তাহে নতুন নতুন খুচরা বিক্রেতা এতে যুক্ত হচ্ছিল। ব্যবসার পিক আওয়ারে প্রতি এক মিনিটে একটি করে আইবিএম পিসি বিক্রি হতে শুরু করে! নিউজউইক ম্যাগাজিনে এই সাফল্যকে আখ্যা দিয়ে বলা হয়, আইবিএমের দারুণ সাফল্য। টাইম ম্যাগাজিন তাদের প্রথাগত বছরের ম্যান অব দ্য ইয়ারের বদলে কম্পিউটারকে বেছে নিয়ে পিসিকে মেশিন অব দ্য ইয়ার ঘোষণা করে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমস লিখেছিল, আইবিএম যে গতি ও সীমানায় সফল হয়েছে, তা আইবিএম নিজেকেসহ পুরো বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছে।

আইবিএমের উন্মুক্ত নকশার সুযোগ নিয়ে বাজারে জোয়ার আসে। চালুর এক বছরের মধ্যে আইবিএম পিসির জন্য ৭৫০টির বেশি সফটওয়্যার প্যাকেজ তৈরি হয়ে যায়। অন্য অনেক প্রতিষ্ঠান আইবিএমের প্রকাশিত ব্লুপ্রিন্ট দেখে তাদের নিজস্ব কম্পিউটার বানাতে শুরু করে, যেগুলো ইতিহাসে আইবিএম কম্প্যাটিবল বা আইবিএম-বান্ধব পিসি হিসেবে পরিচিত লাভ করে।

পরবর্তী এক দশকে আইবিএম এমন সব পারসোনাল কম্পিউটার বাজারে আনে, যেগুলোর গতি ছিল মূল পিসির চেয়ে ১০ গুণ বেশি, মেমোরি ১৬ কিলোবাইট থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১৬ মেগাবাইটে এবং ধারণক্ষমতা বেড়ে যায় প্রায় ১০ হাজার গুণ। ‘পিসি’ শব্দটি সাধারণ পরিভাষায় রূপ নেয় আর ইনটেলের এক্স৮৬ আর্কিটেকচারভিত্তিক প্রসেসর বাজার দখল করে ফেলে।

১৯৮৩ সালে কমপ্যাক প্রথম আইবিএমের পিসি আর্কিটেকচার নকল করে নিজেদের ক্লোন পিসি বাজারে ছাড়ায়। ধীরে ধীরে পারসোনাল কম্পিউটারের বাজারে আইবিএমের একচ্ছত্র আধিপত্য কমতে শুরু করে। ২০০৫ সালে পারসোনাল কম্পিউটারের যুগ শুরুর ২৪ বছর পর কম্পিউটার উৎপাদন যখন পুরোপুরি একটি সাধারণ পণ্যে পরিণত হয়, তখন আইবিএম তাদের সম্পূর্ণ পিসি বিভাগ চীনের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান লেনোভোর কাছে ১৭৫ কোটি ডলারে বিক্রি করে দেয়।

সূত্র: কম্পিউটার হিস্টোরি ও আইবিএম