দীর্ঘ সময় একটানা হেডফোন ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সম্পর্কে জানা জরুরি
দীর্ঘ সময় একটানা হেডফোন ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সম্পর্কে জানা জরুরি

হেডফোন ব্যবহারে সময় ‘৬০-৬০’ নিয়ম মানছেন তো

স্মার্টফোনের সঙ্গে হেডফোন বা ওয়্যারলেস ইয়ারবাডের ব্যবহার এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। যাতায়াতের সময় গান শোনা, ভিডিও দেখা, অনলাইন বৈঠকে অংশ নেওয়া বা ফোনে কথা বলা—সব ক্ষেত্রেই বাড়ছে হেডফোনের ব্যবহার। তবে দীর্ঘ সময় একটানা হেডফোন ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সম্পর্কে জানা জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় উচ্চ শব্দে হেডফোন ব্যবহার করলে কানের ভেতরের সংবেদনশীল কোষ ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। শুরুতে বিষয়টি বোঝা না গেলেও একসময় তা স্থায়ী শ্রবণসমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ ঝুঁকি কমাতে চিকিৎসক ও শ্রবণবিশেষজ্ঞরা ‘৬০-৬০’ নিয়ম অনুসরণের পরামর্শ দিচ্ছেন। এ নিয়মের মূল কথা হলো, হেডফোনের সর্বোচ্চ শব্দমাত্রার ৬০ শতাংশের বেশি ভলিউমে একটানা ৬০ মিনিটের বেশি গান বা অডিও শোনা যাবে না। এরপর কিছু সময় বিরতি নিতে হবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শব্দের মাত্রা ও ব্যবহারের সময় এই দুই বিষয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে কানের ওপর চাপ অনেকটাই কমে যায়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যানুযায়ী, দীর্ঘ সময় উচ্চমাত্রার শব্দের সংস্পর্শে থাকলে ‘নয়েজ-ইনডিউসড হিয়ারিং লস’ বা শব্দজনিত শ্রবণক্ষমতা হ্রাসের ঝুঁকি তৈরি হয়। মানুষের কানের ভেতরে থাকা সূক্ষ্ম সংবেদনশীল কোষ শব্দকে বৈদ্যুতিক সংকেতে রূপান্তর করে মস্তিষ্কে পাঠায়। অতিরিক্ত জোরে শব্দের কারণে এসব কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে তা আর আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। ফলে একবার শ্রবণক্ষমতা কমে গেলে সেটি স্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ৮০ ডেসিবেলের নিচের শব্দ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। সাধারণ কথোপকথনের শব্দ প্রায় ৬০ ডেসিবেল, কলিং বেলের আওয়াজ ৮০ ডেসিবেল এবং ব্যস্ত সড়কের শব্দ প্রায় ৮৫ ডেসিবেল পর্যন্ত হতে পারে। আবার চিৎকার করে কথা বললে শব্দের মাত্রা ৯০ ডেসিবেল ছাড়িয়ে যায়। বিমান উড্ডয়নের সময় সেই মাত্রা পৌঁছাতে পারে ১৪০ ডেসিবেলে।

শ্রবণবিশেষজ্ঞদের মতে, শ্রবণক্ষমতা হ্রাসের পেছনে সাধারণত তিনটি কারণ সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে। এগুলো হলো অতিরিক্ত শব্দ, দীর্ঘ সময় ধরে সেই শব্দ শোনা এবং নিয়মিতভাবে উচ্চমাত্রার শব্দের মধ্যে থাকা। কখনো খুব জোরে শব্দ তাৎক্ষণিক ক্ষতি করতে পারে। আবার অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ ভলিউমে গান শোনার কারণে ধীরে ধীরে সমস্যা তৈরি হয়। প্রথম দিকে তেমন কোনো উপসর্গ না থাকলেও পরে কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ, অস্পষ্টভাবে শোনা বা কানে চাপ অনুভূত হওয়ার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ৬০ শতাংশ ভলিউম ব্যবহারের পরামর্শটি কোনো আনুমানিক ধারণা নয়। বর্তমানে অনেক স্মার্টফোন ও হেডফোনের সর্বোচ্চ শব্দমাত্রা ১০০ থেকে ১১০ ডেসিবেল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। সে ক্ষেত্রে ভলিউম ৬০ শতাংশে রাখলে শব্দের মাত্রা সাধারণত ৭৫ থেকে ৮৫ ডেসিবেলের মধ্যে থাকে, যা তুলনামূলক নিরাপদ বলে বিবেচিত হয়। তবে ভলিউম যত কম রাখা যায়, কানের জন্য ততই ভালো। নয়েজ-ক্যানসেলিং প্রযুক্তিসমৃদ্ধ হেডফোন ব্যবহারেরও বাড়তি সুবিধা রয়েছে। এ ধরনের হেডফোন বাইরের শব্দ কমিয়ে দেয়। ফলে কম ভলিউমেও পরিষ্কারভাবে গান বা অডিও শোনা সম্ভব হয়। এতে অযথা ভলিউম বাড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না।

অনেক স্মার্টফোনে সরাসরি ভলিউমের শতাংশ বা ডেসিবেল দেখা যায় না। সে ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা ভলিউম ধাপে ধাপে বাড়িয়ে মাঝামাঝি পর্যায়ে রাখার পরামর্শ দেন। আরেকটি সহজ উপায় হলো, হেডফোন ব্যবহার করার সময় পাশের কারও সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে কথা বলা যায় কি না, তা খেয়াল করা। কথা শুনতে যদি হেডফোন খুলতে হয়, তাহলে বুঝতে হবে—শব্দের মাত্রা বেশি।

আইফোন ও অ্যান্ড্রয়েড দুই ধরনের স্মার্টফোনেই এখন শ্রবণসুরক্ষাবিষয়ক বিভিন্ন সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। আইফোনে ‘রিডিউস লাউড অডিও’ সুবিধা চালু করে অতিরিক্ত শব্দ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। অ্যান্ড্রয়েড ফোনেও রয়েছে ‘মিডিয়া ভলিউম লিমিট’ সুবিধা, যা নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি শব্দ হতে বাধা দেয়। এ ছাড়া আইফোনের ‘হেলথ’ অ্যাপ ব্যবহারকারীর হেডফোন ও আশপাশের শব্দমাত্রার তথ্য দেখায়। অতিরিক্ত শব্দ শনাক্ত হলে অ্যাপটি সতর্কবার্তাও পাঠাতে পারে।

সূত্র: বিজিআর