
যে ১০–১২ জন মানুষের হাত দিয়ে এ দেশের তথ্যপ্রযুক্তি আন্দোলনের শুরু, আবদুল্লাহ এইচ কাফি তাঁদের একজন। বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি ও বেসিসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য তিনি। বর্তমানে এশিয়ান–ওশেনিয়ান কম্পিউটিং ইন্ডাস্ট্রি অর্গানাইজেশন—অ্যাসোসিওর আজীবন সভাপতি। ক্যাননের পরিবেশক জেএএন অ্যাসোসিয়েটসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুল্লাহ এইচ কাফি প্রথম আলোকে বলেছেন দেশের তথ্যপ্রযুক্তির বিবর্তন ও বর্তমান অবস্থা নিয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন পল্লব মোহাইমেন।
আপনি অ্যাসোসিওর আজীবন চেয়ারম্যান। আগে চেয়ারম্যান ছিলেন। আজীবন চেয়ারম্যানের কাজটা কী?
আবদুল্লাহ এইচ কাফি: অ্যাসোসিওর আজীবন চেয়ারম্যান, তার দায়িত্ব আছে। কিন্তু কম। সংস্থার চেয়ারম্যান তো আছে। আজীবন চেয়ারম্যান উপদেশ দেয়। আমাকে দিয়েই অ্যাসোসিওর গঠনতন্ত্রে ২৩–১ ধারা তৈরি হয়েছে। আগে দুই মেয়াদে অ্যাসোসিওর চেয়ারম্যান ছিলাম। অন্যরা ভাবল একে (আমাকে) তো রাখতেই হবে। সদস্য দেশ থেকে মনোনীত করতে হয়। অ্যাসোসিওতে ২০–২২টি দেশ। এর মধ্যে কোরিয়া, জাপান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া শক্তিশালী। ২০২২ সালে গঠনতন্ত্র সংশোধন করা হলো। আমাকে আজীবন চেয়ারম্যান করা হলো। আমার পর থাইল্যান্ডের বুনরাকও আজীবন চেয়ারম্যান হয়েছেন।
অ্যাসোসিও যে উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেটা কি যথাযথভাবে পূরণ হচ্ছে?
আবদুল্লাহ এইচ কাফি: সারা পৃথিবীতে কম্পিউটার জগতে পরিবর্তন আসছে। ১৯৮৪ সালে অ্যাসোসিও প্রতিষ্ঠিত হয়। উদ্দেশ্য ছিল এই অঞ্চলের প্রতিটি দেশের সঙ্গে প্রতিটি দেশের যোগাযোগ স্থাপন। দেখা গেল, কয়েকটি দেশ ছাড়া আমরা সবাই সহযোগী সদস্য। মালয়েশিয়া যখন চেয়ারম্যান হলো, তখন ২০০০ সালে ইমারজিং দেশগুলোকে আনা হলো। এখন তো সরাসরি সদস্যপদ পায় দেশগুলো। তো বলা যায়, অ্যাসোসিও যে উদ্দেশ্যে গঠিত হয়েছিল তা অনেকটাই পূরণ হয়েছে।
অ্যাসোসিওতে বাংলাদেশ তথা বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস) কী ভূমিকা রাখছে?
আবদুল্লাহ এইচ কাফি: বিসিএস বাংলাদেশ থেকে অ্যাসোসিওর সদস্য। আমি কিন্তু বিসিএসকে প্রতিনিধিত্ব করি না, অ্যাসোসিওর আজীবন চেয়ারম্যান হওয়ার পর আমার কাছে সবাই সমান। নিজ নিজ মার্কেটকে আন্তর্জাতিক মার্কেট হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু বিসিএসে ধারাবাহিকতা নেই। অন্য দেশের মতো ধারাবাহিকতা নেই।
বাংলাদেশের কম্পিউটার অঙ্গনের শুরুটা কেমন ছিল? শুরুর দিকের কোন কোন ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ বলে আপনার কাছে মনে হয়?
আবদুল্লাহ এইচ কাফি: এটা আমার জন্য বেশ নস্টালজিক বিষয়। কেউই বুঝত না কম্পিউটার কী, ইন্টারনেট তো ছিলই না। আমরা ১০–১২ জন ঘুরে বেড়াতাম, মানুষজনকে সচেতন করতাম। যেটা করার কথা সরকারের। মিডিয়া (গণমাধ্যম) সহযোগিতা করেছে। এ দেশের প্রযুক্তির বিকাশে মিডিয়ার ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। আমাদের প্রতিটি কথা তারা ‘বাইবেল’ হিসেবে ধরে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আমাদের সবার স্বার্থেই করতে হয়েছে। ১৯৯৩ সালে কম্পিউটার মেলা করলাম। সরকার তখন আমাদের ডাকল। নীতিনির্ধারকদের ছেলেমেয়েরা কম্পিউটারের কথা বলেছে। তারা বলায় কাজ হয়েছে। আমরা চেয়েছি একটা কিছু হবে। সচেতনতা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি জগৎ আগে কেমন ছিল? এখন কেমন দেখেছেন?
আবদুল্লাহ এইচ কাফি: এখন অনেক বড়। প্রতিটা মুহূর্তেই পরিবর্তন হচ্ছে। তখন জ্ঞান অর্জন করতে চেষ্টা করত। এখনকার জগৎ আসলে সহজ। আগে ডেডিকেশন অনেক বেশি ছিল। এখন কম। কারণ, সহজে সব তথ্য মেলে।
আপনাদের জেএএন অ্যাসোসিয়েটস শুরু থেকে এখন পর্যন্ত শুধু ক্যাননের ডিজিটাল পণ্য বিপণন করছে, যেখানে বেশির ভাগ কোম্পানি একাধিক ব্র্যান্ডের পণ্য বিপণন করে। সেখানে শুধু একটি ব্র্যান্ড নিয়ে আপনারা কাজ করছেন। কেন?
আবদুল্লাহ এইচ কাফি: যারা অনেক ব্র্যান্ড পরিবেশন করে তাদের যোগ্যতা আছে। কিন্তু আমি চেয়েছি, একটা ব্র্যান্ডে ফোকাস দিতে। একটা ব্র্যান্ডে ঝুঁকি আছে, কিন্তু ফোকাসড হওয়া ভালো। এতে ক্রেতাকে ভালো সার্ভিস দেওয়া যায়।
আপনি আগে ফ্লোরা লিমিটেডে চাকরি করতেন। সেখান থেকে বেরিয়ে জেএএন অ্যাসোসিয়েটস প্রতিষ্ঠা করলেন। সে সময়ের কথা বলুন। জেএএন অ্যাসোসিয়েটস প্রথম কোন পণ্য বাজারজাত করেছিল?
আবদুল্লাহ এইচ কাফি: ফ্লোরা অফিস ইকুইপমেন্ট বিক্রি করত। ১৯৮৩ সালে একদিন ফ্লোরার প্রতিষ্ঠাতা এম এন ইসলাম সাহেবের সঙ্গে দেখা। উনি লোক খুঁজছেন। নতুন ব্র্যান্ড আনবেন। আমি তখন বিদেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করছি। ভাবলাম যাওয়ার আগে কিছুদিন কাজ করে যাই। এপসন ব্র্যান্ড নিয়ে এলাম। এই ফ্লোরাতে কাজ শুরু করলাম। এরপর ১৯৯২ জেএএন অ্যাসোসিয়েটস শুরু করলাম। তখন আমার সামনে চারটা ব্র্যান্ড—ফুজিৎসু, এনইসি, ক্যানন ও এইচপি। আমার মনে হলো ক্যানন জাপানের কোম্পানি। ব্যবসার এথিকস ভালো। ক্যাননের পরিবেশক হলাম। প্রথম পণ্য ছিল ক্যানন বিজেসি ২১০এসপি বাবলজেট প্রিন্টার। এরপর ছিল ক্যানন বিজেসি ২৫৫এসপি বাবলজেট প্রিন্টার। এভাবেই শুরু।
বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির আপনি প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং সভাপতিসহ সব পদেই আপনি ছিলেন। এটা একটা বিরল উদাহরণ। এই সময়ে এসে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি কি যথাযথভাবে তার দায়িত্ব পালন করছে?
আবদুল্লাহ এইচ কাফি: তখন আমরা যারা কম্পিউটার সমিতি করতাম, তাদের পাওয়ার খুব একটা কিছু ছিল না। অমুক সভাপতি, আমরা মেনে নিতাম। তখন কেউই সমিতির টাকা খরচ করতাম না। সভাতেও একেক দিন একেকজন খরচ করত। দেশে বা বিদেশে কোনো আয়োজন থাকলে, নিজের পকেট থেকেই খরচ করতাম। আমি ২৬ বছর বিসিএসে সক্রিয় নেই। নেতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে বিসিএসে। যে কষ্টটা তখন আমরা করেছি, এখন সেই কষ্ট করতে হয় না। সচেতনতা বেড়েছে, কিন্তু পরিবর্তন হয়নি সেভাবে।
আপনি বেসিসেরও একজন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। গত দেড়–দুই বছরে বেসিসে একধরনের অচলাবস্থা বিরাজ করছে। এটা কেন এবং এ থেকে উত্তরণের উপায় কী বলে আপনি মনে করেন?
আবদুল্লাহ এইচ কাফি: এই সংগঠন ধীরে ধীরে পলিটিক্যাল হয়ে গেল। প্রথম ১৬–১৭ বছর খুব কাছ থেকে বেসিসের সঙ্গে ছিলাম। একে অন্যের প্রতি সম্মান ছিল। কারও হয়তো কোনো কথায় হাসাহাসি করেছি; কিন্তু বিরোধিতা করি নাই। এখন বেসিসের সদস্যরা ঐক্যবদ্ধ নয়। এত দিনে বিদেশে একটা ব্র্যান্ডিং হওয়া উচিত ছিল। সেটা হয়নি। অচলাবস্থা নিরসনে এখন জাতীয় নির্বাচন হওয়া দরকার।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার কি দেশের তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নে কাজ করছে? আপনার ভাবনা কী?
আবদুল্লাহ এইচ কাফি: এমন তো কিছু দেখছি না যে তথ্যপ্রযুক্তির কাজ হচ্ছে। মার্কেটেও দেখছি না কেউ ভালো বলছে। ব্যবসা খারাপ। এই সরকারের কাজ দেখে মনে হচ্ছে না, আইটি একটি থার্স্ট সেক্টর।
আপনার বাড়ি কুষ্টিয়ায়। সেখানকার সঙ্গে কি আপনার যোগাযোগ আছে? সেখানে কী কী করেছেন?
আবদুল্লাহ এইচ কাফি: যোগাযোগ আছে। সেখানে আমার বাবার নামে একটা কলেজ আছে। গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান আমাকে করে রেখেছে। বোনের নামে একটা হেলথ সেন্টার করা আছে। আর মসজিদও আছে একটা। এগুলো আমরা চালাই।
আপনার ‘আবর্ত: এনালগ থেকে ডিজিটাল বাংলাদেশ ও আমরা’ বইটিতে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তির ধারাবাহিক ইতিহাস উঠে এসেছে। আমরা কি অ্যানালগ থেকে সত্যিই ডিজিটাল হয়ে উঠতে পেরেছি?
আবদুল্লাহ এইচ কাফি: আমি আমার জার্নিটা লিখেছি। বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের খুব কাছ থেকে আমরা দেখেছি। আমরা বলতে, আমরা যে কজন ছিলাম, জনগণ—তাদের বুঝিয়েছি। একটা জায়গায় তো এসেছি অ্যানালগ থেকে।
অবসরে কী করেন?
আবদুল্লাহ এইচ কাফি: বই পড়ি, পত্রিকা পড়ি। এখন দর্শনের বই বেশি পড়ি। পড়ার সময় কেউ থাকলে পড়তে পারি না।
আপনাকে ধন্যবাদ।
আবদুল্লাহ এইচ কাফি: আপনাকেও ধন্যবাদ।