ওপেন সোর্সভিত্তিক অনলাইন ডিজিটাল শিক্ষার প্ল্যাটফর্ম মুডলের বৈশ্বিক সম্মেলন মুডলমুটের আয়োজক দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশ যুক্ত হয়েছে। গতকাল শনিবার ঢাকায় প্রথমবারের মতো মুডল মুটের আয়োজন করে দেশের তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও মুডলের অংশীদার ব্রেইন স্টেশন ২৩।
দিনভর নানা আলোচনায় এটি উঠে এসেছে যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন আর ভবিষ্যতের কোনো ধারণা নয়; এটি এরই মধ্যে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মক্ষেত্রের শেখার বাস্তব অবকাঠামোর অংশ হয়ে উঠছে। এটি একদিকে যেমন ব্যক্তিনির্ভর শিক্ষা, গড়পড়তা মানের কর্মীদের উচ্চতর স্তরে উন্নয়নে সুযোগ সৃষ্টি করছে একই সঙ্গে শিক্ষক-প্রশিক্ষকদেরও প্রশাসনিক কাজের ভার কমিয়ে মূল লক্ষ্যে কাজ করার পর্যাপ্ত সময়ও তৈরি করছে। এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে দেশ-বিদেশের শিক্ষা-প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, মানবসম্পদ ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপক, প্রযুক্তি উদ্যোক্তা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। মহাখালীর ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে ফিলিপিন ও অস্ট্রেলিয়া থেকে দুজন বিশেষজ্ঞ অনলাইনে যুক্ত হয়ে তাঁদের উপস্থাপনা তুলে ধরেন।
দিনব্যাপী সম্মেলনের মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রের শিখনব্যবস্থার বৃহৎ পরিসরের রূপান্তর।’ সম্মেলনের বক্তা ও আলোচকেরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে শিখন ব্যবস্থাপনা সিস্টেম (এলএমএস)-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা, দক্ষতা মূল্যায়ন, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনা এবং বৃহৎ পরিসরে কর্মী উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে এবং ক্রমাগত তার পরিসর বাড়িয়ে চলেছে সেটি তুলে ধরেন।
সকালে ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাইসুল কবীর সম্মেলনের সূচনা করেন। উদ্বোধনী পর্বে মুডলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্কট অ্যান্ডারবার্গ ভিডিও বার্তার মাধ্যমে দেখান, কীভাবে এআই ধীরে ধীরে মুডলের মূল প্ল্যাটফর্মের অংশ হয়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষা এবং বৃহৎ পরিসরে কর্মী শিখনকে আরও কার্যকর করে তুলছে। পাশাপাশি তিনি তুলে ধরেন, ডোমেইন জ্ঞান ও প্রস্তুতি ছাড়া এআই ব্যবহার করা হলে, সেটি শেষ পর্যন্ত বৌদ্ধিক সমর্পণে (কগনিটিভ সারেন্ডার) পরিণত হতে পারে। এ ব্যাপারে তিনি সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
সম্মেলনে ফিলিপিনের নেফিলা ওয়েব টেকনোলজির প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেরিল ভিলারোমান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মুডলভিত্তিক এই সমৃদ্ধ শিক্ষা ব্যবস্থার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা মোহাম্মদ মিজানুর রহমান এআই সক্ষম শিখন অবকাঠামো গড়ে তোলার প্রযুক্তিগত দিক, বিদ্যমান এলএমএসে এআই যুক্ত করার কৌশল, তথ্যনিরাপত্তা এবং স্কেলযোগ্য অবকাঠামোর নানা দিক আলোচনা করেন। পরে ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর মুডল দলের তৈরি এআই-সমৃদ্ধ বিভিন্ন ফিচারের উপস্থাপন করা হয়।
করপোরেট খাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে আরএকে সিরামিকসের প্রধান মানবসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ রিয়াদ হোসেন তাঁর উপস্থাপনায় বলেন, কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ এবং প্রশিক্ষণের মূল্যায়নে এআই নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। মুডলের মতো এআই সমৃদ্ধ সিস্টেমের ব্যবহার মাঝারি ও বড় প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে এখন আরও বেশি সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
সমাপনী অধিবেশনে মুডলের টেকনিক্যাল আর্কিটেক্ট এ কে এম সাফাত মুডলভার্সের ভবিষ্যৎ এবং আগামী দিনে মুডলে কী কী বিষয়ে জোর দেওয়া হবে, তা তুলে ধরেন। সেখানে তিনি বিশ্বব্যাপী মুডলের ডেভেলপারদের জন্য নির্দেশনা দেন। সেখানে মুডলের এশিয়া-প্যাসিফিক ও কানাডা অঞ্চলের চ্যানেল ম্যানেজার ম্যাক্স এসপ্লে মুডলের সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন দেশে স্থানীয় অংশীদারদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন।
সম্মেলনে যোগ দিতে সিলেট থেকে এসেছেন মুডল ডেভেলপার সাকিব হাসান। তিনি বলেন, এ ধরনের সম্মেলন নিয়মিত হলে সেটি তাঁর মতো আরও মুডল ডেভেলপারদের দক্ষতার উন্নয়ন ও নতুন সুযোগের সৃষ্টি করবে। ‘এআই শিখুন’ প্রতিষ্ঠানের তরুণ উদ্যোক্তা আবদুল্লাহ আল ফাহিম জানান, এই সম্মেলন থেকে আগামী দিনের পথচলার জন্য বেশ কিছু বিষয় ভালোভাবে বুঝতে পেরেছেন।
সম্মেলনের বিভিন্ন পর্বে আলোচনায় অংশ নেন লিংক থ্রি টেকনোলজিসের পরিচালক রাকিবুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক শফিউল আলম খান, ঢাকা ব্যাংকের কর্মকর্তা সাকলায়েন, ভেঞ্চার স্টুডিও বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী আদিল ফয়সল, বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের সভাপতি মুনির হাসানসহ অনেকে।
আয়োজক ব্রেইন স্টেশন ২৩-এর এসবিইউ প্রধান তাহমিনা খান জানান, বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো মুডল মুটের আয়োজন শুধু একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের সফল বাস্তবায়ন নয়; বরং এটি দেশের ডিজিটাল শিক্ষা আন্দোলন, এআইনির্ভর দক্ষতা উন্নয়ন এবং ওপেন সোর্স এডটেক ইকোসিস্টেমের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবেই বিবেচিত হবে।