কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) স্পর্শে দ্রুত বদলে যাচ্ছে আমাদের ডিজিটাল জীবনের গতিপথ। অফিশিয়াল কাজকর্ম থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত জীবনের বিনোদন—সবখানেই এখন এআইয়ের পদচারণ। তবে এই যে সুবিধার বিশাল দুয়ার উন্মোচিত হলো, তার আড়ালেই ওত পেতে আছে সাইবার অপরাধের নানা ফাঁদ। একটুখানি অসচেতনতাই ডেকে আনতে পারে ডেটা চুরি বা অ্যাকাউন্ট হ্যাকড হওয়ার মতো মারাত্মক ঝুঁকি। তাই এআইয়ের সুবিধার সঠিক ও নিরাপদ ব্যবহারে ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ম (সিকিউরিটি প্রটোকল) মানা এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।
সংবেদনশীল তথ্য শেয়ার না করা: এআই চ্যাটবট বা বিভিন্ন টুলে পাসওয়ার্ড, ব্যাংক ও আর্থিক তথ্য, জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা সংবেদনশীল ব্যক্তিগত ছবি ও ভিডিও আপলোড করা থেকে বিরত থাকুন। মনে রাখবেন, আপনার দেওয়া তথ্যগুলো এআই মডেলের প্রশিক্ষণের জন্য তাদের সার্ভারে সংরক্ষিত হতে পারে।
ফিশিং ও স্ক্যাম থেকে সাবধান: সাইবার অপরাধীরা এখন এআই ব্যবহার করে অত্যন্ত নিখুঁত ফিশিং ই–মেইল, মেসেজ বা ভয়েস ক্লোনিং (ডিপফেক) তৈরি করছে। অপরিচিত বা সন্দেহজনক উৎস থেকে আসা কোনো লিংকে ক্লিক করার আগে তা ভালোভাবে যাচাই করে নিন।
ম্যালওয়্যার ও ভুয়া অ্যাপ এড়ানো: এআইয়ের সুবিধার জন্য থার্ড পার্টি অনির্ভরযোগ্য অ্যাপ বা ব্রাউজার এক্সটেনশন ইনস্টল করা বিপজ্জনক। ভুয়া অ্যাপের মাধ্যমে ডিভাইসে ম্যালওয়্যার বা র্যানসমওয়্যার ছড়িয়ে পড়তে পারে।
শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ও টু–ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন: ব্যবহৃত এআই অ্যাকাউন্টগুলোয় শক্তিশালী ও ইউনিক পাসওয়ার্ড ব্যবহার করুন। সুরক্ষার অতিরিক্ত স্তর হিসেবে অবশ্যই টু–ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন চালু রাখুন।
‘হ্যালুসিনেশন’ বা ভুলের ঝুঁকি: এআই অনেক সময় ভুল বা কাল্পনিক তথ্যকেও অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করে। প্রযুক্তির ভাষায় যাকে বলা হয়, ‘হ্যালুসিনেশন’। তাই আইনি, চিকিৎসা বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত তথ্যের ক্ষেত্রে অন্ধভাবে এআইয়ের ওপর নির্ভর না করে মূল উৎস থেকে সত্যতা যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে নৈতিকতা, নিরাপত্তা ও সঠিক মানদণ্ড বজায় রাখতে কিছু মূল ‘গার্ডরেল’ বা নির্দেশিকা মেনে চলার পরামর্শ দেন বিশ্লেষক জেনিফার আলম। এগুলো অনুসরণ করলে এআইয়ের ব্যবহার অনেকটাই নিরাপদ রাখা সম্ভব—
১. স্বচ্ছতা ও প্রকাশ: এআই ব্যবহার করে তৈরি যেকোনো কনটেন্ট, ছবি বা ভিডিও প্রকাশের সময় এটি যে এআই দিয়ে নির্মিত, তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা উচিত।
২. তথ্য যাচাই: এআই থেকে পাওয়া যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের সত্যতা নিজেকে যাচাই করে নিতে হবে।
৩. গোপনীয়তা রক্ষা: এআই টুলে কারও ব্যক্তিগত বা স্পর্শকাতর তথ্য (যেমন: নাম, ফোন নম্বর, মেডিক্যাল রেকর্ড ইত্যাদি) ইনপুট দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
৪. কপিরাইট ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ: অন্যের তৈরি কনটেন্ট বা আর্টওয়ার্ক এআই দিয়ে হুবহু কপি করা থেকে বিরত থাকুন। সৃজনশীলতায় মৌলিকত্ব বজায় না রাখলে আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে পারেন।
৫. মানবিক দায়বদ্ধতা: এআই দিয়ে তৈরি যেকোনো কাজের চূড়ান্ত দায়ভার ব্যবহারকারীর। ফলে ব্যক্তি, সমাজ বা দেশের শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট করতে পারে, এমন ক্ষতিকর কোনো কনটেন্ট তৈরি করা যাবে না।
৬. পক্ষপাতিত্ব পরিহার: এআই যেন কোনো নির্দিষ্ট জাতি, ধর্ম বা বর্ণের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রেখে প্রম্পট তৈরি করা উচিত। অন্যের ধর্মীয় ও সামাজিক অনুভূতির প্রতি সম্মান দেখানো আবশ্যক।
৭. নিরাপত্তা ও আইনের বাধ্যবাধকতা: হ্যাকিং, ম্যালওয়্যার তৈরি বা কোনো বেআইনি কাজে এআইয়ের ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ।
সঠিক ও সচেতন ব্যবহার যেমন কাজকে সহজ ও গতিশীল করবে, তেমনি রক্ষা করবে ডিজিটাল নিরাপত্তা। এরপরও যেকোনো ধরনের সাইবার বা তথ্য নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিতে পড়লে দ্রুত নিকটস্থ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বা সাইবার হেল্পলাইনের সহায়তা নেওয়া উচিত।