কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি এখনো মানুষের মতো সব কাজ করতে পারে না
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি এখনো মানুষের মতো সব কাজ করতে পারে না

এআই কি ফ্রিল্যান্সিং পেশা শেষ করে দেবে, নাকি নতুন সম্ভাবনা

কিছুদিন আগেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ছিল বিজ্ঞান কল্পকাহিনির বিষয়। আর এখন? সকালে উঠে কাজ শুরু করতে গেলেই দেখা যাচ্ছে, এআই আমাদের হয়ে বিভিন্ন কাজ শুরু করে দিয়েছে। আর তাই ফ্রিল্যান্সিং কাজ করা যেকোনো মানুষকে এখন একটা প্রশ্ন কমবেশি ভাবাচ্ছে, আমার কাজটা কি এআই নিয়ে নেবে? সত্যি বলতে, এই প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। যা বদলে যাচ্ছে, সেটা স্বীকার করে নেওয়াই ভালো।

আগে একটা সাধারণ ব্লগ পোস্ট লিখতে বা একটা ছোট নকশা তৈরি করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগত। এখন একটা এআই টুল কয়েক মিনিটেই নকশার একটা খসড়া বের করে দিতে পারে। এটা অস্বীকার করার কিছু নেই। ফলে যারা শুধু ‘সাধারণ’ কাজ, অর্থাৎ একটু লেখা, ছবি সম্পাদনা বা সহজ ডেটা এন্ট্রির কাজ করতেন, তাঁদের জন্য প্রতিযোগিতাটা সত্যিই কঠিন হয়ে আসছে।

একটা প্রতিষ্ঠান আগে যে কাজের জন্য ১০ জন কর্মী নিয়োগ দিত, এখন হয়তো ২ থেকে ৩ জন কর্মী দিয়েই সেই কাজ করা যাচ্ছে। কারণ, বাকি কাজটা এআই করে দিচ্ছে। কিন্তু এর মানে কি মানুষের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে? একদমই না। বরং উদ্যোক্তারা এখন শুধু একটা কাজ জানা মানুষ নয়, পুরো ব্যবসা সম্পর্কে জানা কর্মী খুঁজছেন।

একজন উদ্যোক্তার কথা ভাবুন। তিনি সারা দিন বিক্রি, অপারেশন, পরিকল্পনা নিয়ে দৌড়াচ্ছেন। তার দরকার এমন একজন মানুষ যে একসঙ্গে বিপণন, তথ্য বিশ্লেষণ, বিজ্ঞাপন পরিচালনা আর এআই টুল ব্যবহার করে পুরো ব্যবসাকে এগিয়ে নিতে পারবেন। অর্থাৎ চাহিদাটা শেষ হয়নি, শুধু চাহিদার ধরনটা পাল্টে গেছে।

ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘ফিউচার অব জবস রিপোর্ট ২০২৫’–এর তথ্যানুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৯ কোটি ২০ লাখ চাকরি পরিবর্তন হবে বা হারিয়ে যাবে। এটা পড়ে ভয় পেলেই হয়তো পুরো প্রতিবেদন পড়া হবে না। কারণ, একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই সময়ে প্রায় ১৭ কোটি নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হবে। মানে শুধু হারানো নয়, সব মিলিয়ে প্রায় ৭ কোটি ৮০ লাখ নতুন কাজ যোগ হবে পৃথিবীতে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলোর দখল নিতে পারলেও কিছু কাজ এখনো পুরোপুরি মানুষের দখলে রয়েছে। আর তাই সমস্যার সমাধান, ক্লায়েন্টের মনের কথা বোঝা, কার্যকর নতুন কৌশল তৈরিসহ সৃজনশীল পরিকল্পনার মতো বিষয়গুলো এখনো মানুষের মতো করতে পারে না এআই, সহজে পারবেও না।

ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটে এখন ক্লায়েন্টরা শুধু ‘টুল চালানো’ কর্মী চাইছেন না। তাঁরা চাইছেন এমন কেউ যে এআই ব্যবহার করে তাঁদের ব্যবসাকে আরও দ্রুত ও লাভজনকভাবে এগিয়ে নিতে পারবে। বিষয়টি অনেকটা এ রকম যে একজন ডিজিটাল বিপণনকর্মী এআই দিয়ে সম্ভাব্য বাজার বিশ্লেষণের পর নিজের মেধা কাজে লাগিয়ে সেটা কাজে লাগাচ্ছেন। অথবা একজন গ্রাফিক ডিজাইনার এআই দিয়ে প্রাথমিক ধারণা নিয়ে পেশাদারভাবে কাজ করছেন বা একজন আধেয় (কনটেন্ট) পরিকল্পনাকারী এআইয়ের মাধ্যমে গবেষণার সময় বাঁচিয়ে সৃজনশীল কাজে বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। অর্ধাৎ এআই এখানে প্রতিপক্ষ নয়, এআই একটা হাতিয়ার।

বাংলাদেশের তরুণদের জন্য বড় সুযোগ

ডিজিটাল বিপণন, এআই টুল, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য বিশ্লেষণ, সফটওয়্যার উন্নয়ন—এই দক্ষতাগুলোর চাহিদা আগামী বছরগুলোতে সবচেয়ে দ্রুত বাড়বে। আর তাই যাঁরা এখন থেকে এআই শিখতে শুরু করবেন, তাঁরা বৈশ্বিক বাজারে অনেক এগিয়ে থাকবেন। ইতিহাস বলছে, প্রযুক্তি সব সময় কিছু কাজের ধরন বদলে দিয়েছে, কিন্তু নতুন কাজও তৈরি করেছে। তাই এআইকে ভয় পেয়ে দূরে সরে থাকলে পিছিয়ে পড়তে হবে। আর এআইকে বুঝে, শিখে, কাজে লাগাতে পারলে এই মুহূর্তই হতে পারে ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট। ফলে এআইয়ে ফ্রিল্যান্সিংয়ের শেষ নয়, বরং যাঁরা এআইকে সঙ্গী বানাতে পারবেন, তাঁদেরই ভবিষ্যৎ ভালো হবে।

শামীম হুসাইন: স্কিলআপারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)