আজ মহান মে দিবস। ১৮৮৬ সালে শিকাগোর হে মার্কেটে শ্রমিকেরা বুকের রক্ত ঢেলেছিলেন শ্রমের অধিকারসহ দৈনিক আট ঘণ্টা কর্মঘণ্টার দাবিতে। দেড় শতাব্দী পর যখন আমরা আরও একটি মে দিবস পালন করছি, তখন প্রযুক্তির কেন্দ্রবিন্দু যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকোর সিলিকন ভ্যালিতে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য সেখানের একাধিক প্রতিষ্ঠানে চালু হয়েছে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টার নিষ্ঠুর কর্মসংস্কৃতি। মে দিবসের মূল চেতনা যেখানে ছিল শ্রমিকের বিশ্রাম ও মানবিক জীবন, এআই বিপ্লব সেখানে ফিরিয়ে এনেছে বিরামহীন শ্রমের এক নতুন দাসত্ব।
সান ফ্রান্সিসকোর বিভিন্ন এআই স্টার্টআপে ৯৯৬ নামের একটি ধারণা জনপ্রিয় হচ্ছে। সেখানে সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা, সপ্তাহে ৬ দিন নামের কাজের সংস্কৃতি চলছে। মিথ্রিল নামের একটি এআই স্টার্টআপের সহপ্রতিষ্ঠাতা সঞ্জু লোকুহিতিগে জানিয়েছেন, তিনি সপ্তাহে সাত দিনই গড়ে ১২ ঘণ্টা কাজ করেন। তাঁর ভাষায়, এখানে কাজের সঙ্গে জীবনের কোনো ভারসাম্য নেই। রোববার কোনো ক্যাফেতে গেলেও দেখবেন সবাই কাজ করছে।
অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা অফিসেই জুতা খুলে স্যান্ডেল পরে থাকেন। কারণ, দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা তাদের সেখানেই কাটাতে হয়। সিলিকন ভ্যালির ডগপ্যাচ এলাকার এক স্টার্টআপে দেখা গেছে, কর্মীরা একটি অ্যাপার্টমেন্টে সকাল ৯টা থেকে রাত ৩টা পর্যন্ত কাজ করছেন।
এক দশক আগেও স্টার্টআপ সংস্কৃতি ছিল উদ্দীপনার। কিন্তু এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। এআই বিপ্লবের এই যুগে কর্মীরা কেবল টাকার নেশায় নয়, এখন টিকে থাকার আতঙ্ক থেকে বেশি কাজ করছেন। গুগল বা মেটার মতো বড় বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান তাদের কর্মীদের দেওয়া সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে দিচ্ছে।
২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় আড়াই লাখ প্রযুক্তি খাতের কর্মী চাকরি হারিয়েছেন, যার প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে এআইকে। এক্সিকিউটিভ কোচ মাইক রবিনস বলেন, পাঁচ বছর আগে সফটওয়্যার প্রকৌশলীদের অনেক দাপট ছিল। এখন ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠানের দিকে হেলে পড়েছে। কর্মীরা এখন ক্লান্ত হওয়া বা ব্যক্তিগত সময় নিয়ে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ, তাঁরা জানেন, প্রতিষ্ঠান তাঁদের ছাঁটাই করতে দ্বিধা করবে না।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সিলিকন ভ্যালির এই অস্থিরতা কেবল প্রযুক্তি খাতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। আর তাই এটি পুরো বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি আগাম সতর্কবার্তা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও (আইএমএফ) জানিয়েছে, উন্নত অর্থনীতির ৬০ শতাংশ চাকরি এআইয়ের কারণে বিলুপ্ত বা রূপান্তরিত হবে।
সূত্র: গার্ডিয়ান