ভক্সওয়াগন ক্লাবের সদস্যরা
ভক্সওয়াগন ক্লাবের সদস্যরা

ভিন্টেজ গাড়ি ভালোবাসেন তাঁরা

শখ থেকে সংগ্রহ

ভক্সওয়াগন ক্লাব অব বাংলাদেশ ভিন্টেজ গাড়িপ্রেমীদের জন্য একটি মিলনমেলা। ক্লাবটির সাধারণ সম্পাদক দিদারুল ইসলাম নিজেই একজন বিশিষ্ট সংগ্রাহক। তাঁর সংগ্রহে রয়েছে ১১টি ভক্সওয়াগন বিটলস ও ২টি ভক্সওয়াগন বাস, যেগুলোর মধ্যে কিছু এখনো রাস্তায় চলাচল করে। ক্লাবেরসদস্য সংখ্যা ৯ হাজারের বেশি, যার মধ্যে ৬০ জনের কাছে প্রায় ২০০টি গাড়ি সক্রিয়ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ছাড়া দেশে আরও ৩০০-৪০০টি ভিন্টেজ ভক্সওয়াগন বিভিন্ন ব্যক্তির সংগ্রহে রয়েছে।

দিদারুল আলম বলেন, ‘আমি প্রায় ৩০ বছর ধরে গাড়ি সংগ্রহ করছি। এসব গাড়ি আমরা শুধু সংগ্রহই নয়, পুনরায় চালানোর জন্য বিদেশ থেকে যন্ত্রপাতি এনে ঠিক করছি। গাড়ি রীতিমতো রাস্তায় চালাচ্ছি আমরা। পুরোনো গাড়ির আবেগ আসলে অন্য রকম। আমি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে গাড়ি সংগ্রহ করেছি। ময়মনসিংহ, রাজশাহী থেকে শুরু করে চট্টগ্রাম থেকে পছন্দের পুরোনো ভক্সওয়াগন সংগ্রহ করে মেরামত করে আবার নতুনের মতো ঠিক করেছি। আমরা ভক্সওয়াগন ক্লাব অব বাংলাদেশ নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের আয়োজন করে থাকি। সব আয়োজনে ভিন্টেজ গাড়ির প্রদর্শনী, র‍্যালি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়, যা নতুন প্রজন্মকে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করে তোলে।’

পুরোনো ভক্সওয়াগন গাড়ি

ভিন্টেজ গাড়ি সংগ্রহে নারীরাও পিছিয়ে নেই। ফাতেমাতুজ জান্নাত, একজন নারী সংগ্রাহক, যাঁর সংগ্রহে রয়েছে ১৯৭০ সালের একটি ভক্সওয়াগন বিটলস। তিনি এই গাড়িকে শুধু একটি যানবাহন নয়, বরং একটি ইতিহাসের অংশ হিসেবে দেখেন। অন্যদিকে ফয়সাল তানভীর, ১৯৯০-এর দশকের শৈশব কাটানো একজন সংগ্রাহক, বর্তমানে ১৯৬৮ মডেলের একটি ভক্সওয়াগন চালান। তাঁর মতে, এই গাড়িগুলো তাঁর শৈশবের স্মৃতিকে জীবন্ত করে তোলে। তিনি বলেন, ‘আমি ১৯৯০ দশকের শৈশব কাটানো মানুষ। আমি নিজে এখন একটা ভক্সওয়াগন ১৯৬৮ মডেলের গাড়ি চালাই। আহমেদ কবীর নামের আমার পরিচিত এক বড় ভাইয়ের আগ্রহেই আমি গাড়ি-সংগ্রাহক হয়েছি। খুব আগ্রহ নিয়ে ঢাকার রাস্তায় পুরোনো গাড়ি চালাই।’

ঢাকার রাস্তায় পুরোনো ভক্সওয়াগন গাড়ি

তরুণদের মধ্যে আগ্রহ

ঢাকার তরুণ উদ্যোক্তা ওয়াইজ রহিমের জীবনের এক অনন্য ভালোবাসার নাম ভিন্টেজ গাড়ি। বলা যায়, মাত্র সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই তাঁর হাতেখড়ি হয় গাড়ি মেরামতে। চাচাতো ভাই ফারাজ রহিমের সঙ্গে মিলে দাদার রেখে যাওয়া একটি ১৯৬৬ মডেলের ফিয়াট গাড়ি মেরামতের অভিজ্ঞতা তাঁকে এই জগতে নিয়ে আসে। তখনই জন্ম নেয় গাড়ির প্রতি এক অদম্য আকর্ষণ, যা সময়ের সঙ্গে বেড়েছে বহুগুণ। সেই ছোটবেলার আগ্রহকে পেশাদার উদ্যোগে পরিণত করেছেন ওয়াইজ। বন্ধু মুস্তাভি ইরতেজা বাশারের সঙ্গে মিলে সম্প্রতি ঢাকায় আয়োজন করেছেন একটি ব্যতিক্রমধর্মী ভিন্টেজ গাড়ির প্রদর্শনী। এতে অংশ নিয়েছে ১০-১৫টি দুর্লভ পুরোনো গাড়ি, যা দেখতে ভিড় জমিয়েছেন অন্তত আট হাজার দর্শক। পুরোনো গাড়ির যান্ত্রিক শব্দ, ওজন, গতি ও ঐতিহাসিক গল্প যেন দর্শকদের এক ভিন্ন সময়ের অভিজ্ঞতায় পৌঁছে দেয়। ওয়াইজ রহিম বলেন, ‘আমার গাড়ি নিয়ে ভীষণ আগ্রহ। পুরোনো গাড়ি চালানোর দারুণ মজা। এসব গাড়িতে সময়ের ছাপ আছে, ইতিহাস আছে। সেই আগ্রহ থেকেই ২০২৫ সালে তিনি কিনেছেন একটি ১৯৮৯ মডেলের টয়োটা করোলা জিটি। এটি সেই সময়ের একমাত্র গাড়ি, যা কারখানা থেকে সরাসরি বাংলাদেশে আনা হয়েছিল। এখনো গাড়িটি আসল ইঞ্জিনেই চলছে। ওয়াইজ বলেন, ‘এই গাড়ি চালাতে গেলে একরকম ভালো লাগা তৈরি হয়, যা নতুন গাড়িতে পাই না।’

গাড়ি সংগ্রহে আছে চ্যালেঞ্জ

আজকের ডিজিটাল যুগে যেখানে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় গাড়ি প্রতিনিয়ত রূপ বদলাচ্ছে, সেখানে ওয়াইজ রহিমের মতো তরুণেরা পুরোনো গাড়ির ঐতিহ্যকে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। শুধু নিজের শখ পূরণ করছেন না, বরং একটি হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরছেন এই সব সংগ্রাহক। ভিন্টেজ গাড়ি সংগ্রাহকদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো উচ্চ হারে কর ও আমদানি শুল্ক। বাংলাদেশে ২০ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ির ওপর ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত গ্রিন ট্যাক্স আরোপের প্রস্তাব রয়েছে। এ ছাড়া আমদানি নীতিমালায় পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ি আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এই নীতিগুলো ভিন্টেজ গাড়ি সংগ্রহ ও সংরক্ষণকে কঠিন করে তোলে। ভিন্টেজ গাড়ি সংগ্রহ ও সংরক্ষণকে সহজ করতে নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন। অনেক দেশেই ২৫ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ির ওপর কর রেয়াত দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও এমন নীতিমালা প্রণয়ন করলে সংগ্রাহকেরা উৎসাহিত হবেন এবং এই ঐতিহ্য সংরক্ষিত থাকবে।