
বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি উন্নয়নে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় অগ্রগতি হলেও ব্যাটারিগুলোর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে অনেকেরই। তাই ধারণক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি খরচ কমাতে নির্মাতারা নতুন প্রজন্মের ব্যাটারি উপাদানের ব্যবহার শুরু করেছেন। তবে বাস্তবে দেখা গেছে, এসব উন্নত ব্যাটারিও অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশার তুলনায় দ্রুত কার্যক্ষমতা হারাচ্ছে। কোথাও কোথাও নিরাপত্তাঝুঁকির কথাও উঠে আসছে। নতুন এক গবেষণায় এ সমস্যার কারণ শনাক্তের দাবি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের আর্গন ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি এবং ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর প্রিৎসকার স্কুল অব মলিকুলার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের গবেষকেরা।
গবেষকদের তথ্যমতে, ব্যাটারির নকশায় দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করা কিছু ধারণাই দ্রুত কার্যক্ষমতা হারানোর জন্য দায়ী। ব্যাটারির ক্ষয়ের মূল কারণ লুকিয়ে আছে ক্যাথোডে। চার্জ ও ডিসচার্জের সময় শক্তি সঞ্চয় ও ছাড়ার কাজ করা এ অংশের ভেতরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে যে অভ্যন্তরীণ চাপ তৈরি হয়, সেটিই ধীরে ধীরে ব্যাটারির গঠন দুর্বল করে দেয়। এই চাপ চোখে দেখা যায় না, তবে এর ফলে ক্যাথোড উপাদানের ভেতরে অতি সূক্ষ্ম ফাটল তৈরি হয়। এই ক্ষয়প্রক্রিয়া এত দিন যেভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছিল, বাস্তবে তা ভিন্ন। এমনকি ‘সিঙ্গেল ক্রিস্টাল’ ক্যাথোডেও একই ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছে, যদিও এগুলোকে এত দিন ব্যাটারির ফাটল সমস্যার কার্যকর সমাধান হিসেবে ধরা হতো।
প্রচলিত লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারিতে সাধারণত নিকেলসমৃদ্ধ পলিক্রিস্টালাইন ক্যাথোড ব্যবহার করা হয়। এসব ক্যাথোড বহু ক্ষুদ্র স্ফটিক কণার সমন্বয়ে তৈরি। প্রতিবার চার্জ ও ডিসচার্জের সময় কণাগুলো সামান্য করে প্রসারিত ও সংকুচিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে এ প্রক্রিয়া চলতে থাকলে কণাগুলোর সংযোগস্থলে চাপ তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে সেখানে ফাটল ধরে। এই ফাটলের মধ্য দিয়ে তরল ইলেকট্রোলাইট ক্যাথোডের ভেতরে ঢুকে পড়ে। এতে অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক বিক্রিয়া শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে ব্যাটারির ধারণক্ষমতা কমে যায়। এ সমস্যা এড়াতেই গবেষকেরা সিঙ্গেল ক্রিস্টাল ক্যাথোডের দিকে ঝুঁকেছিলেন। সিঙ্গেল ক্রিস্টাল ক্যাথোডে ভেতরে কোনো স্ফটিক সংযোগস্থল না থাকায় ধারণা করা হয়েছিল, এতে ব্যাটারি আরও টেকসই হবে।
নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, পলিক্রিস্টাল ও সিঙ্গেল ক্রিস্টাল ক্যাথোডে ক্ষয়ের ধরন আলাদা হলেও ফলাফল প্রায় একই। গবেষকেরা উন্নত ইমেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেখেছেন, চার্জের সময় একটি সিঙ্গেল ক্রিস্টাল কণার সব অংশ একসঙ্গে সক্রিয় হয় না। কোথাও রাসায়নিক প্রতিক্রিয়া দ্রুত ঘটে, কোথাও ধীরে। এই অসম প্রতিক্রিয়ার ফলে একই স্ফটিকের ভেতরেই অসম প্রসারণ ও সংকোচন তৈরি হয়। এর থেকেই সৃষ্টি হয় অভ্যন্তরীণ চাপ ও ফাটল।
গবেষণায় ক্যাথোডে ব্যবহৃত ধাতুর ভূমিকা নিয়েও নতুন তথ্য উঠে এসেছে। সাধারণত ব্যাটারির ক্যাথোডে নিকেল, ম্যাঙ্গানিজ ও কোবাল্টের মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। প্রচলিত ধারণায় কোবাল্টকে ফাটলের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত করা হতো, আর ম্যাঙ্গানিজকে ধরা হতো তুলনামূলক নিরাপদ ও কম খরচের উপাদান হিসেবে। তবে গবেষকেরা দেখেছেন, সিঙ্গেল ক্রিস্টাল কাঠামোর ক্ষেত্রে ম্যাঙ্গানিজ যান্ত্রিক ক্ষতি বাড়াতে পারে। বিপরীতে কোবাল্ট অভ্যন্তরীণ চাপ কমিয়ে ক্যাথোডের স্থায়িত্ব বাড়াতে সহায়তা করে।
গবেষকদের মতে, কোন উপাদান ব্যাটারির জন্য উপকারী হবে, তা নির্ভর করে ক্যাথোডের স্ফটিক কাঠামোর ওপর। অর্থাৎ একই উপাদান ভিন্ন কাঠামোয় ভিন্ন ফল দিতে পারে।
সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস