সাইবার অপরাধ
সাইবার অপরাধ

টেলিগ্রাম অ্যাপের অন্ধকার ও সাইবার ব্ল্যাকমেল

ডিজিটাল–বিপ্লবের এই যুগে আমাদের হাতের স্মার্টফোনটি যেমন পৃথিবীর জানালা খুলে দিয়েছে, তেমনি এর পেছনে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার জগৎ। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কেবল বিনোদন বা তথ্যের মাধ্যম নয়, বরং এক শ্রেণির অপরাধী চক্রের জন্য হয়ে উঠেছে ‘ডিজিটাল টর্চার সেল’। বিশেষ করে টেলিগ্রাম অ্যাপকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ইমেজ-বেজড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ (আইবিএসএ) ও ব্ল্যাকমেল এখন এক ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে।

অন্ধকার গলি

সাইবার অপরাধীদের শিকার হওয়ার গল্পগুলো প্রায় একই সুতোয় গাঁথা। প্রবাসী স্বামীর সঙ্গে ভিডিও কলে একান্ত মুহূর্ত কাটানো নববধূ ‘সুজানা’ (ছদ্মনাম) কিংবা কর্মস্থল থেকে দূরে থাকা কাবিন করা স্বামী-স্ত্রীর সংবেদনশীল ছবি আদান-প্রদান—সবই এখন হ্যাকারদের নিশানায়।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীরা মনে করেন ‘এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন’ তাঁদের রক্ষা করবে। কিন্তু অপরাধীরা এখন সরাসরি অ্যাপ হ্যাক না করে ব্যবহারকারীর ফোনটিরই নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে। রিমোট অ্যাকসেস ট্রোজান (র‍্যাট) নামের ম্যালওয়্যারের মাধ্যমে আপনার অজান্তেই ফোনের ক্যামেরা বা স্ক্রিন রেকর্ড হচ্ছে দূর থেকে। কোনো আকর্ষণীয় লিংকে ক্লিক করা বা তৃতীয় পক্ষের অ্যাপ নামানোই হতে পারে আপনার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।

যেভাবে কাজ করে এই ‘ডিজিটাল ফানেল’

সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক জেনিফার আলমের মতে, এই অপরাধগুলো হুট করে ঘটে না। এটি একটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত বিপণন কৌশল বা ‘মার্কেটিং ফানেল’-এর মতো কাজ করে।

১. টোপ: ফেসবুকের মিম গ্রুপ বা টিকটকের কমেন্ট বক্সে ‘এআই ডিপফেক’ দিয়ে তৈরি করা বিকৃত ছবির টিজার ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

২. ভাইরাল করার শর্ত: ফ্রি গ্রুপে যুক্ত হওয়ার পর শর্ত দেওয়া হয় যে ভিডিওর বাকি অংশ দেখতে হলে আরও ৫-১০ জন বন্ধুকে যুক্ত করতে হবে। এর ফলে কোনো খরচ ছাড়াই অপরাধীদের সদস্যসংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ে।

৩. প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন: ৩০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন প্যাকেজের মাধ্যমে ‘ভিআইপি’ বা ‘লাইফটাইম’ ব্যবহার করার প্রলোভন দেখানো হয়। বিকাশ, রকেট বা নগদের মতো এমএফএস ব্যবহার করে এই অবৈধ লেনদেন চলে।

৪. চূড়ান্ত মরণফাঁদ (ব্ল্যাকমেল): একবার টাকা দিয়ে গ্রুপে ঢুকলে ব্যবহারকারী নিজেই ঝুঁকির মুখে পড়েন। আবার ভুক্তভোগী যখন তাঁর ছবি সরাতে অনুরোধ করেন, তখন শুরু হয় লাখ লাখ টাকার দাবি।

প্যাকেজ যখন ফাঁদ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষক মেহেদি হাসানের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অপরাধী চক্রগুলো পেশাদার প্রতিষ্ঠানের মতো বিভিন্ন ‘প্যাকেজ’ অফার করে। বেসিক প্যাকেজ ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা, ভিআইপি বা প্রিমিয়াম ৮০০ টাকা থেকে ২ হাজার টাকা ও লাইফটাইম প্যাকেজ ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা।

সুরক্ষায় যা করণীয়: বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের পাশাপাশি অপরাধের ধরন বদলালেও সচেতনতাই প্রধান ঢাল। ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিচের পদক্ষেপগুলো জরুরি বলছেন জেনিফার আলম।

• সংবেদনশীলতা বর্জন: ইন্টারনেটে কোনো কিছুই পুরোপুরি ব্যক্তিগত নয়। তাই একান্ত ছবি বা ভিডিও শেয়ার করার আগে শতবার ভাবুন।

• টু-ফ্যাক্টর অথেন্টিকেশন: আপনার সোশ্যাল মিডিয়া ও ই–মেইলে অবশ্যই দুই স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু রাখুন।

• সন্দেহজনক লিংক: ‘ভিডিওটি দেখতে ক্লিক করুন’ বা ‘১০ মিনিট পর ডিলিট হয়ে যাবে’—এমন প্রলোভন দেখানো লিংকে কখনোই ক্লিক করবেন না।

• আইনি পদক্ষেপ: ব্ল্যাকমেলের শিকার হলে ভয় পেয়ে টাকা দেবেন না। টাকা দিলে ব্ল্যাকমেল থামে না, বরং বাড়ে। দ্রুত নিকটস্থ থানা বা সাইবার ক্রাইম ইউনিটে যোগাযোগ করুন।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. হায়দার তানভীরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, টেলিগ্রামসহ বিভিন্ন সাইবার মাধ্যমে কারও ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেল করা ‘সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫’-এর অধীন গুরুতর অপরাধ। তিনি আরও বলেন, ‘সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি বা তথ্য ব্যবহার করে ভয় দেখানো বা প্রকাশের হুমকি দেওয়া সরাসরি গোপনীয়তা লঙ্ঘন ও সাইবার হয়রানি। উক্ত অধ্যাদেশের ২৩, ২৪ ও ২৫ ধারা অনুযায়ী এসব কর্মকাণ্ড শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ছাড়া এ ধরনের কার্যক্রম দণ্ডবিধির ৩৮৪ ধারা অনুযায়ী চাঁদাবাজি হিসেবে গণ্য হতে পারে। যদি অশ্লীল ছবি বা ভিডিও প্রচার করা হয়, তবে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।’

ভুক্তভোগীদের করণীয় সম্পর্কে তানভীরুজ্জামান পরামর্শ দেন, হয়রানির শিকার হলে প্রথমেই চ্যাট হিস্ট্রি, স্ক্রিনশট ও অভিযুক্ত ব্যক্তির আইডি লিংক সংরক্ষণ করতে হবে। লেনদেন হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট নম্বরের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করতে হবে। এসব প্রমাণসহ দ্রুত নিকটস্থ থানায় জিডি বা অভিযোগ দায়ের করা উচিত। থানা মামলা গ্রহণ না করলে আইনজীবীর মাধ্যমে সরাসরি আদালতে মামলা করার পথও খোলা রয়েছে।

ডিজিটাল দুনিয়ায় আমাদের সামান্য অসতর্কতা সারা জীবনের কান্নার কারণ হতে পারে। সামাজিক লজ্জা বা ভয়ের চেয়েও বড় সত্য হলো—আপনি অপরাধী নন, আপনি ভুক্তভোগী। অপরাধীদের আড়াল না করে আইনের আওতায় আনাই এই অন্ধকার জগৎ থেকে বের হওয়ার একমাত্র পথ।