আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্পের পরিচালক রেজা সেলিম
আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্পের পরিচালক রেজা সেলিম

সাক্ষাৎকার

সরকার উদ্যোগ নিলে ক্যানসার চিকিৎসা সহজলভ্য করা সম্ভব—রেজা সেলিম

বাংলাদেশে গ্রামে তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে যাওয়া এবং এ নিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে চর্চা করার পুরোধা ব্যক্তি রেজা সেলিম। আড়াই দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করছেন ‘উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি’ ধারণায়। প্রথম আলোর মুখোমুখি হয়েছেন আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প ও আমাদের গ্রাম ক্যানসার রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক রেজা সেলিম। তিনি গ্রামে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার, ক্যানসার প্রতিরোধে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, জ্ঞানমেলা ইত্যাদি নিয়ে কথা বলেছেন। ঢাকার ইকবাল রোডে আমাদের গ্রামের ঢাকা সমন্বয় অফিসে ৪ সেপ্টেম্বর সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন পল্লব মোহাইমেন

প্রশ্ন

আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প দিয়ে শুরু। শুরুর কথা কিছু বলুন।

রেজা সেলিম: আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প বা আইসিটি ফর ডেভেলপমেন্ট। ২০০০–০১ সালের দিকে আমাদের যে ভিশন ছিল মানুষের কাছে তথ্যপ্রযুক্তি প্রচারিত হোক এবং তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধাগুলো যাতে সাধারণ মানুষ পায়। অবকাঠামোর চিন্তা একদিকে, আরেকটা চিন্তা ছিল কম্পিউটার মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুবিধা কীভাবে দেওয়া যায় আর তা সাশ্রয়ী উপায়ে। আপনার তো মনে আছে, তখন কম্পিউটার মানে অনেক দাম। ইন্টারনেট ছিল ডায়ালআপ (টেলিফোনের মাধ্যমে)। এই খরচগুলো কীভাবে কমানো যায়, কী বুদ্ধিতে এটাকে এই সাশ্রয়ী রাখা যায়—এসব চিন্তা নিয়েই তো উন্নয়ন। মূল ফোকাস ছিল ই–রেডিনেস। কারণ, আমরা বুঝতে পারছিলাম যে তথ্যপ্রযুক্তির বিশাল সম্ভাবনা আছে।

প্রশ্ন

তথ্যপ্রযুক্তির বিশাল সম্ভাবনা আছে, তা বুঝলেন কীভাবে?

রেজা সেলিম: সে সময় একটা বিতর্ক ছিল, কম্পিউটারের সম্ভাবনা কি শুধু করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, না এটি সাধারণ মানুষের কাছেও পৌঁছাবে। ২০০০ সালে জাপানের ওকিনাওয়াতে বিশ্বের ক্ষমতাশালী আটটি দেশের জি–৮ সম্মেলন হয়। এখানে ডট ফোর্স (ডিজিটাল অপরচ্যুনিটি টাস্কফোর্স) গঠন করা হয়। ওকিনাওয়া ঘোষণায় পৃথিবীর আটটি বড় ধনী দেশ তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপারে সিদ্ধান্তে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের প্রস্তাবে এবং জাপানের সমর্থনে একটা সিদ্ধান্ত হয়। ডিজিটাল প্রযুক্তি মানে তথ্যপ্রযুক্তির যে সম্ভাবনা, সেটা উন্নয়নের জন্য হবে। তখনো কারও কাছে ধারণাটা পরিষ্কার ছিল না। প্রযুক্তিবিদদের কাছেও পরিষ্কার ছিল না। এটা মানুষের জন্য (প্রো–পিপল); অর্থাৎ মানুষকেন্দ্রিক করার জন্য বিতর্ক শুরু হয়। এই ডিজিটাল অপরচ্যুনিটি টাস্কফোর্স করে বলা হয় যে ২০০১ সালের জি–৮ সম্মেলনে (ইতালির রেনোয়া শহরে) একটি প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। ডট ফোর্সের সচিবালয় ছিল বিশ্বব্যাংকে। পৃষ্ঠপোষক ছিল কানাডা। জি–৮–এর কনসালটেশনে আমি যুক্ত ছিলাম। প্রথমে কানাডায় জিকে-১ (গ্লোবাল নলেজ) ও পরে মালয়েশিয়ায় জিকে–২ বৈঠক হয়। সেই বৈঠক দুটিতে ‘উন্নয়নের জন্য আইসিটি (তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি) ’ ধারণার সুপারিশ করা হয়। এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জাতিসংঘের যুক্ততা প্রয়োজন ছিল। তাই জাতিসংঘের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ) এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়। তারপর জাতিসংঘের তথ্যসমাজ শীর্ষ সম্মেলন (ডব্লিউএসআইএস) হয় ২০০৩ সালে জেনেভায় ও ২০০৫ সালে তিউনিসে। জিকেপির দক্ষিণ এশিয়ার সমন্বয়কারী হিসেবে ও বাংলাদেশ সরকারের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্যসচিব হিসেবে এই পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গে আমি যুক্ত ছিলাম। বিষয়টা জানতাম, এ কারণে ২০০১ সাল থেকে আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প করা সহজ হয়েছে।

প্রশ্ন

আমাদের গ্রাম উন্নয়নের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি প্রকল্প রামপালে কেন?

রেজা সেলিম: রামপাল যাওয়ার মূল কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী মাহমুদুল হক। তাঁর গ্রাম বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলার শ্রীফলতলা। সেখানে আর আমার বাড়ি কুমিল্লার গ্রামে কাজ শুরু করলাম। তারপর দেখলাম, কুমিল্লার গ্রাম বাগেরহাটের গ্রামের চেয়ে তুলনামূলক অগ্রসর। তাই বাগেরহাটের রামপালই বেছে নিলাম। রামপাল ঢাকা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে, তখন ২০০০ সালের দিকে যশোর-খুলনা হয়ে সেখানে যেতে সময় লাগত ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা।

প্রশ্ন

শুরুতে আপনারা কম্পিউটারে কী কী করতেন?

রেজা সেলিম: ডেটা এন্ট্রি করে ডেটাবেজ করতাম। এতে গ্রামের একটা ডেটাবেজ তৈরি হলো। কোথায় কী আছে, স্বাস্থ্যগত বিভিন্ন তথ্যের ডেটাবেজ। ছেলে–মেয়েরা তখন কম্পিউটার শিখতে আসত। এক্সেল, ওয়ার্ড শিখত। মাইক্রোসফট অ্যাকসেস শিখে ওরা ওদের নিজেদের পরিবারের নিজেদের প্রতিবেশীদের ডেটা নিয়ে আসত। একটা নির্দিষ্ট ফরম্যাটে সে ডেটা নিয়ে ওরা এন্ট্রি করতে এবং অনুশীলন করে শিখত। ফলে আমাদের একটা বড় ডেটাবেজ তৈরি হয়। এই ডেটা থেকে নিয়ে আমরা জ্ঞানকেন্দ্রে বা নলেজ সেন্টারের ধারণা উন্নয়ন করি। স্কুলেও কম্পিউটার প্রশিক্ষণ দিতাম। তথ্যপ্রযুক্তি–সুবিধা সম্প্রসারণের জন্য স্কুলগুলোকে ল্যাবরেটরি করে দিতে সহায়তা করতাম। কম্পিউটার শিক্ষক এনে দিতাম। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া—পুরো আন্দোলনটাই এভাবে হয়েছে। সবাই যেন কম্পিউটার ব্যবহার করতে পারে, এটাই ছিল উদ্দেশ্য। বাবা–মায়েদের বোঝাতাম কম্পিউটারের গুরুত্ব। তরুণ ছেলে–মেয়েদের তখন ধারণা হলো, হয়তো কম্পিউটারে শিখলে একটা চাকরি হবে। কারণ, তখন কম্পিউটার টাইপরাইটারকে প্রতিস্থাপন করেছে। আমরা এর আরও যে সুবিধা–সম্ভাবনা আছে, সেটা মানুষের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

আমাদের গ্রাম ক্যানসার রিসার্চ সেন্টারের সামনে রেজা সেলিম
প্রশ্ন

ক্যানসার রিসার্চ সেন্টার করতে গেলেন কেন?

রেজা সেলিম: আমি দীর্ঘদিন হেলথ কমিউনিকেশন নিয়ে কাজ করেছি। আমার ব্যক্তিগত উৎসাহ ছিল স্বাস্থ্যতথ্য নিয়ে। গ্রামের মানুষের স্বাস্থ্যগত তথ্যও আমরা জোগাড় করেছি। ফলে আমাদের কাছে একটা স্বাস্থ্যতথ্যের একটা ডেটাবেজও গড়ে ওঠে। এ ধরনের তথ্য পাওয়া এবং এগুলোকে গবেষণার ছকে বিশ্লেষণ করে মানুষকে সহায়তা করা যায় কি না, এ চিন্তা থেকেই আমরা রামপালে স্তন ক্যানসার সেন্টারে নিরীক্ষার কাজ শুরু করি। ইন্টারনেটে ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও ক্যানসার বিশেষজ্ঞ রিচার্ড লাভের সঙ্গে পরিচয় হয়। তিনি আসেন, বাংলাদেশে আমাদের কার্যক্রম দেখেন। দেখার পর তিনি আমাদের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তিনি বললেন, ‘এই কাজে আমি তোমাদের সঙ্গে থাকতে চাই।’ ২০০৬ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে স্তন ক্যানসার প্রকল্পটা শুরু হয়। রামপাল থেকেই ঢাকা ও যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসকেরা যুক্ত হতেন ভিডিও কনফারেন্সে। ভিডিও কনফারেন্সের জন্য বিটিসিএলের সহায়তা পেয়েছি। ২০০৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত ৩০ হাজার নারীর তথ্য আছে আমাদের ইএমআরে (ইলেট্রনিক মেডিক্যাল রেকর্ড)। আলট্রাসাউন্ডের ছবিও আছে। এই ইএমআরে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে মানা হয়। রোগীর সম্মতিও নেওয়া হয়। সরকারি বা গবেষণার কাজে বিএমআরসির (বাংলাদেশ মেডিক্যাল রিসার্চ কাউন্সিল) নৈতিক নিয়ম অনুযায়ী পুরো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসি মেনে ইএমআর দেওয়া হয়। ইএমআর সফটওয়্যার তৈরি করেছে আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউট তাদের ভিডিও কনফারেন্সিং–সুবিধা আমাদের ব্যবহার করতে দেয়। মাইক্রোসফট করপোরেশন সফটওয়্যার প্রযুক্তি দিয়ে আমাদের সহায়তা করে। ফলে রামপালের গ্রামের নারীও বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা পান।

স্তন ক্যানসার কেন্দ্রের অভিজ্ঞতা, গ্রহণযোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার কারণ ২০১২ সালে অসংক্রামক রোগনির্ণয় ও ক্যানসার রিসার্চ সেন্টার গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০১৪ সালে জমি পাই রামপালেই। এটা কিন্তু কোনো ক্যানসার হাসপাতাল নয়, ক্যানসারসহ অন্যান্য অসংক্রামক রোগ শনাক্ত ও প্রতিরোধের উপায় খুঁজে বের করার একটি সমাজভিত্তিক স্বাস্থ্য গবেষণাগার। ২০২৫ সালে এটা পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছে। এই অক্টোবরে এর পূর্ণাঙ্গ সেবা চালু হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত হলে বড় শহরের হাসপাতালে রোগীকে যাতে যেতে না হয়, সেটাই আমাদের উদ্দেশ্য। আর টেলিমেডিসিন–সুবিধা পুরোপুরি ব্যবহার হচ্ছে। আমাদের এখানে ক্যানসার প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করে কেমোথেরাপি পর্যন্ত দেওয়া হবে। রেডিওথেরাপি ব্যয়বহুল, তাই পরে যুক্ত হতে পারে।

প্রশ্ন

আপনার গ্রাম তো কুমিল্লায়, বাগেরহাট গেলেন কেন?

রেজা সেলিম: অধ্যাপক মাহমুদুল হকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে। অপেক্ষাকৃত দুর্গম ছিল রামপাল। আজ থেকে ৩২ বছর আগে যখন আমরা কাজ শুরু করেছি, তখন এখানে শিক্ষার হার ছিল ২৯ শতাংশ। এখন ৭০ শতাংশের বেশি। কুমিল্লায় আমার নিজের গ্রামের সঙ্গেও আমি গভীরভাবে সম্পৃক্ত।

প্রশ্ন

তখন এবং এখন কী পরিবর্তন দেখেন আপনাদের কাজে?

রেজা সেলিম: প্রথম ও এখনো একটা স্বপ্নের তাড়না কাজ করছে। যখন এখানে (রামপাল) ই–মেইল চালু হলো, তখন মানুষ বিশ্বাসই করেনি যে কোনো চিঠি তাৎক্ষণিকভাবে, মানে এখনই ঢাকায় যাবে। এটা তাদের কাছে বিস্ময় ছিল। আমরা একবার এসএমএস পাঠানোর কর্মশালা করেছিলাম। এক ঘণ্টার একটা কর্মশালা। ওই একবারই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল। এরপর তারাই অন্যদের শিখিয়েছে। আমাদের গ্রামের ৩০ হাজার ক্যানসারের যে রোগী, তাদের মধ্যে চার থেকে সাড়ে চার হাজার রোগীর সঙ্গে আমি ব্যক্তিগতভাবে ছিলাম। এত রোগী দেখে যা বুঝেছি, আমাদের এখানে চিকিৎসায় ভয়ের (ফিয়ার) মডেল দেখানো হয়। সঠিকভাবে ও সঠিক সময়ে ক্যানসার নির্ণয় করলে বেশির ভাগ রোগী ভালো হয়। প্রতিরোধযোগ্য রোগকে আগেই প্রতিকার করা যায়। আমাদের সরকারের উচিত প্রতিবছর নারীদের স্তন ক্যানসার ও জয়ায়ুমুখের ক্যানসার পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা। ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ন্ত্রণে রক্তের সিবিসি ও চেস্ট এক্স–রে করা। রক্তের সিবিসি ও চেস্ট এক্স–রে করতে একেকজনের এক হাজার টাকা করে খরচ হবে। ক্যানসার চিকিৎসা সহজলভ্য ও সহজগম্য করা সম্ভব। এটা আমার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝি। অন্য রোগের বেলাতেও একই কথা। উচ্চ রক্তচাপের ওষুধের দাম কিন্তু বেশি নয়। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে কম বয়সে উচ্চ রক্তচাপ বাড়ছে। অনেকেরই কম বয়সে স্ট্রোক করে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে থাকছে। লবণপানির এলাকায় এসব নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হওয়া উচিত।

তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করছি, এখন এআইও ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০ বছর হলো মাইক্রোসফট আমাদের সহায়তা করছে, আমাদের সঙ্গে আছে। বাংলাদেশে যেখানে চিকিৎসকেরা রোগী দেখেন দুই–তিন মিনিটে, সেখানে আমাদের গ্রাম সেন্টারে রোগীর সঙ্গে চিকিৎসক কমপক্ষে এক ঘণ্টা কথা বলেন। আপনি যদি ভালো করে রোগীর সব তথ্য না জানেন, তাহলে কেমন করে সঠিক চিকিৎসা দেবেন? অনলাইনেও আমরা চিকিৎসাসেবা দিই। ভার্চ্যুয়াল কেয়ার এই দেশে সাশ্রয়ী চিকিৎসাসেবার অন্যতম মডেল হতে পারে, তার নমুনা আমরা এরই মধ্যে তৈরি করেছি। এসবই আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। প্রযুক্তির ব্যবহার করে গ্রামের মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া আমার কাছে একটি মায়ার জগৎ হয়ে ধরা পড়েছে।

প্রশ্ন

জ্ঞানমেলার আয়োজন হতো একসময়। জ্ঞানমেলার শুরুটা কীভাবে? কত বছর করেছেন? এখন কেন হয় না?

রেজা সেলিম: জ্ঞানমেলার শুরুটা ২০০৪ সালে রামপালের শ্রীফলতলা হাইস্কুলের মাঠে।। প্রথম মেলায় বিটিআরসির প্রথম চেয়ারম্যান সৈয়দ মার্গুব মোর্শেদ এসেছিলেন। ২০২২ সাল পর্যন্ত করেছি। এ বছর আবার হবে আশা করি। মন্ত্রী, রাষ্ট্রদূত, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা আসতেন এ মেলায়। গ্রামের মানুষের ওপর তথ্যপ্রযুক্তির প্রভাবটা বোঝা যেত মেলায়। দুপুরের পর গ্রামের নারী, মেয়েদের ঢল নামত। কিন্তু একটাও ইভ টিজিংয়ের ঘটনা ঘটেনি। আমরা জ্ঞানমেলায় স্কুল ও স্কুলের শিক্ষক–শিক্ষার্থীদের যুক্ত করতাম। শিক্ষকেরাই আয়োজক কমিটিতে থাকেন। রামপালের মানুষ অন্য অনেক এলাকার চেয়ে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ভালো করে। গ্রামের অনেক তরুণ আউটসোর্সিংয়ের কাজ করেন। শ্রীফলতলা হাইস্কুল মাঠেই আমরা ১০টি জ্ঞানমেলা করেছি।

রামপালে আমাদের গ্রাম পরিদর্শন করছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বন পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম (ডানে)
প্রশ্ন

আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার কম। বিশেষ করে ঢাকার বাইরে। এটাকে কীভাবে বাড়ানো যায়? আর কোনটা গ্রহণ করা উচিত, কোনটা নয়?

রেজা সেলিম: জাতিসংঘের প্রথম তথ্যসমাজ শীর্ষ সম্মেলনে (২০০৩) বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ ছিল। দ্বিতীয় সম্মেলনে (২০০৫) মন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের ভালো ভূমিকা ছিল। কিন্তু পরে অনেক কাজে ওভারল্যাপিং হয়েছে। যত বেশি অবকাঠামো করেছি আমরা, তত সুবিধা পায়নি মানুষ। একটা দেশে কিন্তু মোবাইল ইন্টারনেটের ব্যবহার কিছু নয়। ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট দরকার। সারা দেশে অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক আছে, কিন্তু ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট নেই। তারপর ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে ট্যাব দেওয়া হয়েছে, তারপর সেগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। শত শত অ্যাপ তৈরি হয়েছে, কিন্তু বেশির ভাগেরই ব্যবহার নেই বা কার্যকারিতা নেই। বেশির ভাগ মানুষ এখনো গ্রামে থাকে। আশা করি সরকার গ্রামে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে বাস্তবসম্মত উদ্যোগ নেবে। শুধু স্বাস্থ্যসেবা নয়, জনসেবার সব খাতেই তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার গ্রামমুখী হওয়া দরকার।

প্রশ্ন

আমাদের গ্রাম ক্যানসার রিসার্চ সেন্টারে ক্যানসারের চিকিৎসা পুরোপুরি হবে?

রেজা সেলিম: প্রথম দিকে হয়তো সব চিকিৎসা হবে না, তবে রোগনির্ণয় হবে। কেমোথেরাপি দেওয়া হবে। আপাতত রেডিওথেরাপি দেওয়া যাবে না। আমরা চেষ্টা করছি এবং সরকারের সহযোগিতা চেয়েছি। খুলনা বিভাগেই কোনো রেডিওথেরাপি নেই। বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে রেডিওথেরাপির এই সংকট উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য অন্তত ১টি করে রেডিওথেরাপি মেশিন থাকা প্রয়োজন। সেই হিসাবে ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে কমপক্ষে ১৭০ থেকে ২০০টি রেডিওথেরাপি মেশিন দরকার। কিন্তু বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি খাত মিলিয়ে সচল ও অচল সব ধরনের মেশিন হিসাব করলে এর সংখ্যা ৩০–এর মতো হবে।

প্রশ্ন

আমাদের গ্রামের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?

রেজা সেলিম: প্রথমত, মানুষকে রোগের ভয়ভীতি থেকে মুক্তি দেওয়া। দ্বিতীয়ত, মানুষ যেন তার বাড়িতে বসে বা গ্রাম থেকে বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা পায়, এটা নিশ্চিত করতে চাই। তাকে যেন অকারণে বা ছোটখাটো অসুখে কোনো বড় হাসপাতালে, বড় চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে না হয়। আমরা তার রোগ নির্ণয় করে দেব। তৃতীয়ত, সরকারের ওপর চাপ কমানো। বড় হাসপাতালগুলোতে রোগীরা প্রয়োজন ছাড়া না গেলে এমনিতেই চাপ কমবে। চিকিৎসার খরচ কমানোর চেষ্টা করা এবং ধারাবাহিক গবেষণা করে দেখা যে কী করে চিকিৎসা ব্যয় কমানো যায়। এর মাধ্যমে যে ডেটা তৈরি হবে, এই ডেটাগুলো দিয়ে একটা বড় ডেটা ডিপোজিটরি হবে। ডেটা ব্যাংকের মতো—যেটি দিয়ে আমাদের দেশের শিক্ষিত সমাজ, চিকিৎসক সমাজ, চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা সহায়তা পাবে। আর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের একটা হাব হিসেবে কাজ করবে।

প্রশ্ন

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

রেজা সেলিম: আপনাকেও ধন্যবাদ।