পূর্বা চিরান
পূর্বা চিরান

আন্তর্জাতিক নারী দিবস

পাহাড়ের চূড়া থেকে পূর্বা চিরানের আকাশছোঁয়ার গল্প

শহর যখন যান্ত্রিক কোলাহলে ব্যস্ত, বহুদূরে যেখানে মেঘেরা পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে ঘুমায়, সেই কেওক্রাডংয়ের দুর্গম চূড়ায় বসে এক তরুণী বদলে দিচ্ছেন সাফল্যের সংজ্ঞা। চারদিকে সবুজের সমারোহ আর নিস্তব্ধতা, অথচ তাঁর ল্যাপটপের স্ক্রিনে সচল বৈশ্বিক বাজারের (গ্লোবাল মার্কেটপ্লেস) এক ব্যস্ত পৃথিবী। তিনি পূর্বা চিরান। বান্দরবানের রুমা উপজেলায় বাড়ি। আধুনিক সভ্যতার সব সুযোগ-সুবিধা যেখানে পৌঁছাতে হিমশিম খায়, সেখানে কেবল অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি আজ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের এক পরিচিত নাম।

পাহাড়ের বাঁকে সংগ্রামের শুরু

পূর্বার জীবনের গল্পটা মখমল বিছানো ছিল না। শেরপুরে নানির বাড়ি। সেখানে হোস্টেলে থেকে পড়েছেন। ২০১৪ সালে শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক, ২০২০ সালে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী কলেজ থেকে স্নাতক (সম্মান) এবং ২০২২ সালে ভাওয়াল সরকারি কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন তিনি। সমবয়সীরা যখন চেনা ছকে সরকারি চাকরির পেছনে ছুটছিলেন, তখন ছয় ভাই-বোনের মধ্যে বড় এই মেয়ে দেখছিলেন ভিন্ন স্বপ্ন। নকরেক আইটি ইনস্টিটিউটের একটি বিজ্ঞাপন তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। গ্রাফিক ডিজাইনের পাট চুকিয়ে তিনি ফিরে যান তাঁর শিকড়ে—বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ে।

রোদ-বৃষ্টি আর পাহাড় ডিঙানো ফ্রিল্যান্সিং

কেওক্রাডংয়ে নেই বিদ্যুৎ, নেই স্থিতিশীল ইন্টারনেট। কিন্তু পূর্বার ছিল একবুক সাহস। ল্যাপটপে চার্জ দেওয়ার জন্য তাঁকে ভরসা করতে হতো সৌরবিদ্যুতের ওপর। আর ইন্টারনেটের সিগন্যাল খুঁজতে ল্যাপটপ কাঁধে নিয়ে প্রতিদিন পূর্বা চিরানকে উঠতে হতো উঁচু পাহাড়ের চূড়ায়।

ভেবে দেখুন সেই দৃশ্য—কখনো তপ্ত রোদ, কখনো অঝোর বৃষ্টি, আবার কখনো পিচ্ছিল পাহাড়ি পথ। ল্যাপটপের চার্জ শেষ হয়ে গেলে দিনে পাঁচ-ছয়বার পাহাড় বেয়ে নিচে নামতে হতো, আবার চার্জ দিয়ে ওপরে উঠতে হতো। শরীরের ক্লান্তি যখন পাহাড়সমান হয়ে দাঁড়াত, তখন সুদূর যুক্তরাষ্ট্রের কোনো গ্রাহক ‘ফাইভ স্টার’ রিভিউ আর অর্জিত ডলার সেই ক্লান্তি ধুয়ে দিত ঝরনার মতো। পূর্বা চিরান প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাহাড়ে বসেও যে বিশ্ববাজারে কাজ করা সম্ভব, আমি চাই সেই বিশ্বাসটি সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক।’

পূর্বার আছে আকাশছোঁয়া স্বপ্ন

সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজয়

পূর্বা প্রমাণ করেছেন, মেধা আর দক্ষতা থাকলে ভৌগোলিক অবস্থান কোনো দেয়াল হতে পারে না। আজ তাঁর গ্রাহকের তালিকায় রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশ। ফাইভআরের মতো লড়াকু প্ল্যাটফর্মে অর্ধশতাধিক প্রকল্প সফলভাবে শেষ করে তিনি এখন কাজ করছেন নামী বিদেশি এজেন্সির সঙ্গে।

মশাল হাতে আগামীর পথে

পূর্বা শুধু নিজের ভাগ্য বদলেই ক্ষান্ত হননি; তিনি এখন অন্যের জন্য আলোর দিশারি। ইতিমধ্যে শতাধিক পাহাড়ি তরুণ-তরুণীকে তিনি গ্রাফিক ডিজাইন হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। বর্তমানে নকরেক আইটির প্রধান কার্যালয়ে যুক্ত হয়ে কাজ করছেন নতুন প্রজন্মকে দক্ষ করে তুলতে। তাঁর স্বপ্ন—নিজের একটি বড় ডিজিটাল এজেন্সি গড়া, যেখানে কর্মসংস্থান হবে অসংখ্য মানুষের।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে পূর্বা চিরান বলেন, ‘আপনার হাতে যদি একটি ইন্টারনেট সংযোগ আর মনে অদম্য জেদ থাকে, তবে পাহাড়ের চূড়া থেকেও আপনি বিশ্বজয় করতে পারেন। সুযোগের অভাব নয়, বরং ইচ্ছাশক্তির অভাবই মানুষের বড় সীমাবদ্ধতা। প্রতিকূলতা আসবেই, কিন্তু পাহাড়ের মতো অটল থাকলে সাফল্য ধরা দিতে বাধ্য।’