নিজের গড়া প্রতিষ্ঠানে আসাদুল্লাহ আল গালিব
নিজের গড়া প্রতিষ্ঠানে আসাদুল্লাহ আল গালিব

নাশতার ৩০ টাকা বাঁচানো গালিব কুয়েট প্রকৌশলী, অতঃপর লাখ ডলারের নায়ক

ভোরবেলা ধানের শীষে জমে থাকা শিশিরবিন্দুর মতো স্বচ্ছ এক স্বপ্ন নিয়ে বড় হওয়া ছেলেটি আজ বিশ্বজয়ের গল্প শোনাচ্ছেন। যে হাতে একসময় লাঙল ধরা বাবার কষ্টের ঘাম মুছে দেওয়ার সংকল্প ছিল, সেই হাতে আজ ধরা দিয়েছে বিশ্বখ্যাত প্ল্যাটফর্মগুলোর শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট। এটি কেবল একজন প্রকৌশলীর ফ্রিল্যান্সার হওয়ার সাধারণ গল্প নয়; এটি এক অদম্য তরুণের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই এবং শূন্য থেকে শিখরে ওঠার এক জীবন্ত মহাকাব্য। খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) থেকে পাস করে বিসিএস বা করপোরেট চাকরির নিশ্চিত আরাম ছেড়ে তিনি বেছে নিয়েছেন অনিশ্চিত কিন্তু স্বাধীন এক পথ, যেখানে আজ আসাদুল্লাহ আল গালিব লাখ ডলার আয়ের নায়ক। বর্তমানে মাসে দেড় থেকে দুই লাখের বেশি টাকা আয়ের মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের ভাগ্যই বদলাননি, বরং তরুণ প্রজন্মের কাছে হয়ে উঠেছেন এক অনুপ্রেরণার নাম।

একবেলা না খেয়ে জমানো ৩০ টাকার লড়াই

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বাসুপাড়া গ্রাম। এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্ম আসাদুল্লাহ আল গালিবের। বাবা মো. আবদুস সামাদ মণ্ডল আর মা আয়েশা বেগমের টানাটানির সংসার। ঘরে ধান উঠলে হাসি ফুটত, না উঠলে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ। কিন্তু অভাব থাকলেও মেধায় কমতি ছিল না আসাদুল্লাহর। ২০১২ সালে এসএসসি এবং ২০১৪ সালে রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুল থেকে জিপিএ–৫ পেয়ে যখন তিনি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন, তখন বাবার খুশির সীমা ছিল না।
কিন্তু সেই হাসির আড়ালে ছিল জমি বন্ধক আর ঋণের বোঝা। কুয়েটের প্রথম বর্ষে পা দিয়েই গালিব উপলব্ধি করেন, বাবার ওপর আর চাপ দেওয়া সম্ভব নয়। শুরু হলো এক নির্মম কৃচ্ছ্রসাধন। প্রতিদিনের সকালের নাশতা বাদ দিলেন তিনি। লক্ষ্য—প্রতিদিন ৩০ টাকা বাঁচানো, মাস শেষে ৯০০ টাকা! এই সামান্য কটি টাকাই তখন তাঁর কাছে ছিল রাজকীয় সম্পদ। দুপুরে প্রথম খাবার খেয়ে ক্লাস শেষে ছুটতেন টিউশনিতে। কখনো একটু ভালো খাবারের আশায় অতিরিক্ত দিন পড়াতেন ছাত্রদের। এর মধ্যে পছন্দের হীরা খাতুনকে বিয়েও করলেন, যে ছিলেন স্কুলজীবনের সহপাঠী। চাপ আরও বেড়ে গেল। চিন্তুা করলেন দায়িত্ব অনেক, চাকরির পিছে না ঘুড়ে কিছু একটা করতে হবে। এমন অভাব অনটনের মধ্যে পড়েও স্বপ্ন দেখতে শুরু করলেন।

এই ‘কিছু একটা’ করার জেদটাই তাঁকে বদলে দিল। ঘরে হয়তো তখন চাল বাড়ন্ত, পকেটে হাতে গোনা কয়েকটা টাকা, কিন্তু মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছিল বিশাল সব আইডিয়া। চাকরির সাক্ষাৎকারের জন্য জুতা ক্ষয় না করে তিনি সময় দিতে শুরু করলেন নিজের পরিকল্পনায়। দিন-রাত এক করে পড়াশোনা, বাজার যাচাই আর ছোট ছোট পদক্ষেপ। পরিচিতজনেরা অনেকেই বাঁকা চোখে তাকাতেন, বলতেন, ‘পড়াশোনা শেষ করে শেষে কিনা এসব? এই অভাবের দিনে পাগলামি না করে একটা ছোটখাটো চাকরি তো নিতে পারো!’

পুরোনো ল্যাপটপ আর অদম্য জেদ

প্রকৌশলের কঠিন পড়াশোনার মধ্যেই গালিবের মনে দানা বাঁধে নতুন কিছু করার ইচ্ছা। বাবা কষ্ট করে একটি লো-কনফিগারেশনের ল্যাপটপ কিনে দিয়েছিলেন। সেটাই ছিল তাঁর তুরুপের তাস। ক্যাম্পাসের বড় ভাইদের কাছে গিয়ে বলতেন, ‘আমাকে কাজ শেখান, আমি প্রয়োজনে ফ্রিতে কাজ করব।’ প্রায় এক বছর নামমাত্র পারিশ্রমিকে দিন-রাত এক করে শিখেছেন ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের অলিগলি।

ইংরেজির দক্ষতা বাড়াতে ছোটবেলার শিক্ষক আরাফাত হোসেনের কঠোর শাসন আজ তাঁকে আন্তর্জাতিক গ্রাহকের সামনে আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে। এক ঘণ্টার ভিডিও কলে আধো আধো ইংরেজিতে কথা বলে যখন প্রথম তিন ডলার আয় করেছিলেন, গালিবের মনে হয়েছিল, তিনি যেন হিমালয় জয় করেছেন।

আসাদুল্লাহ আল গালিব

চাকরির পিঞ্জর ভেঙে স্বপ্নের ডানা

কুয়েট থেকে লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে অ্যাপেক্স ফুটওয়্যারে ইন্টার্নশিপ ও চাকরি শুরু করেন গালিব। পাশাপাশি বিসিএস ও সরকারি ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষায় এক এক করে ধাপ পার হচ্ছিলেন। কিন্তু কারখানার চার দেয়ালের ধরাবাঁধা নিয়ম আর সীমিত বেতন তাঁর সৃজনশীলতাকে শ্বাসরুদ্ধ করে দিচ্ছিল। তিনি দেখলেন, মেধাবী প্রকৌশলীরা দিন–রাত খাটছেন, কিন্তু স্বাধীনতা নেই।

ঠিক তখনই গালিব জীবনের সবচেয়ে বড় ঝুঁকিটি নিলেন। সরকারি চাকরির মোহ ত্যাগ করে ফ্রিল্যান্সিংকে নিলেন পূর্ণকালীন পেশা হিসেবে। সেই শুরু। স্কিল আপারের শামীম হোসাইনের ভিডিও দেখে ফেসবুক অ্যাডস আর ওয়েব অ্যানালিটিকসে নিজেকে দক্ষ করে তুললেন। ১৯টি প্রকল্প নিজে নিজে অনুশীলন করে যখন মাঠে নামলেন, তখন আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

সফলতা ও লাখ ডলারের নায়ক

পরিশ্রমের ফল আসতে দেরি হয়নি। মাসে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা আয় ছাড়িয়ে গেল দ্রুতই। আপওয়ার্কে অর্জন করলেন ‘টপ রেটেড প্লাস’ ব্যাজ, ছাড়িয়ে গেলেন এক লাখ ডলার আয়ের মাইলফলক। এরপর ফাইভআরেও বাজিমাত! ২০২৫ সালের মধ্যেই সেখানে ২০ হাজার ডলার আয় এবং ‘ফাইভআর প্রো ভেরিফায়েড’ স্বীকৃতি অর্জন করেন। বাংলাদেশে হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন এই কঠিন স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে আসাদুল্লাহ আল গালিব একজন।

ব্যক্তিগত গণ্ডি পেরিয়ে আগামীর লক্ষ্য

আজ গালিব একা নন, তাঁর দলে কাজ করছেন ১০-১২ জন দক্ষ তরুণ। নিজের একটি ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সি গড়ে তুলেছেন, যা বিশ্ববাজারে সেবা দিচ্ছে। তাঁর লক্ষ্য এখন আকাশছোঁয়া—নিজের সফলতায় থেমে না থেকে অন্তত এক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করা।

গালিব প্রথম আলোকে বলেন, ‘জিপিএ–৫ বা বুয়েট-কুয়েটের ট্যাগই শেষ কথা নয়; বরং সততা, সঠিক মেন্টর নির্বাচন আর প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি থাকলে গ্রামের সাধারণ কৃষক পরিবার থেকেও বিশ্ব জয় করা সম্ভব। আমি চাকরিজীবী হতে চাইনি, চেয়েছি কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হতে। আমার স্বপ্ন শুধু নিজের জন্য নয়, আমার দেশের মানুষের জন্য।’