বিশ্বের স্মার্টফোন বাজার ২০২৬ সালে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পতনের মুখে পড়তে পারে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল ডেটা করপোরেশন (আইডিসি) প্রকাশিত সাম্প্রতিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক স্মার্টফোন সরবরাহ ১২ দশমিক ৯ শতাংশ কমে ১১২ কোটি ইউনিটে নেমে আসতে পারে। এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে এটি হবে সর্বনিম্ন সরবরাহের হার।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পতন শুধু সাময়িক বাজার মন্দা নয়। এটি স্মার্টফোন শিল্পের কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত। আইডিসির ওয়ার্ল্ডওয়াইড ক্লায়েন্ট ডিভাইসেস বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সিসকো জেরোনিমো বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি কোনো স্বল্পমেয়াদি চাপের ফল নয়। এটি মেমোরি চিপের সাপ্লাই চেইনের ফলে তৈরি সুনামির মতো বিশাল ধাক্কা।
আইডিসির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ডিআরএএম (ডায়নামিক র্যান্ডম অ্যাকসেস মেমোরি) চিপের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিই বাজারে এই অস্থিরতার প্রধান কারণ। আধুনিক স্মার্টফোনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সুবিধা, উন্নত গ্রাফিকস এবং একাধিক অ্যাপ একসঙ্গে চালানোর জন্য উচ্চক্ষমতার মেমোরি অপরিহার্য। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এসব চিপের দাম দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গুগল, মেটা ও মাইক্রোসফটের মতো প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অবকাঠামো ও ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণে বিপুল পরিমাণ মেমোরি চিপ ব্যবহার করছে। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহের বড় অংশ এখন ডেটা সেন্টারমুখী হয়ে পড়েছে। এতে ভোক্তাপর্যায়ের ডিভাইস নির্মাতারা চিপ–সংকটে পড়ছেন এবং উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে স্বল্পমূল্যের অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোন নির্মাতাদের ওপর। বাড়তি উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে অনেক প্রতিষ্ঠানকে পণ্যের মূল্য বাড়াতে হতে পারে। আবার কেউ কেউ কম মুনাফার বাজার থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তও নিতে পারে। অন্যদিকে শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি ও প্রিমিয়াম বাজারে দৃঢ় অবস্থানের কারণে অ্যাপল এবং স্যামসাং তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, চলমান সংকট তাদের বাজার অংশীদারত্ব বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। আইডিসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে স্মার্টফোনের গড় বিক্রয়মূল্য ১৪ শতাংশ বেড়ে ৫২৩ মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা হবে রেকর্ড। উৎপাদন ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে নির্মাতারা উচ্চ মুনাফার প্রিমিয়াম মডেলের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে সামগ্রিক গড় মূল্যও ঊর্ধ্বমুখী।
আইডিসি মনে করছে, ২০২৭ সালে বাজারে ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং ২০২৮ সালে ৫ দশমিক ২ শতাংশ পুনরুদ্ধার হতে পারে। তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে দিয়েছেন, এ পুনরুদ্ধার বাজারকে আগের অবস্থায় পুরোপুরি ফিরিয়ে নেবে না। আইডিসির মোবাইল ফোন ট্র্যাকার বিভাগের জ্যেষ্ঠ গবেষণা পরিচালক নাবিলা পোপাল বলেন, মেমোরি–সংকট সাময়িক পতন নয়। এটি পুরো স্মার্টফোন বাজারের অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্নির্ধারণ করছে। তিনি আরও জানান, ১০০ মার্কিন ডলারের কম দামের স্মার্টফোনের বার্ষিক বাজার প্রায় ১৭ কোটি ১০ লাখ ইউনিট। এই রেঞ্জের এসব ফোন ২০২৭ সালে মেমোরি চিপের দাম স্থিতিশীল হলেও স্থায়ীভাবে অলাভজনক হয়ে পড়তে পারে, অর্থাৎ নিম্নমূল্যের স্মার্টফোনের বাজার ভবিষ্যতে আর আগের মতো টেকসই থাকবে না।
সূত্র: টাইম অব ইন্ডিয়া