
ঘূর্ণিঝড়, আকস্মিক বন্যা, বজ্রপাত কিংবা তীব্র তাপপ্রবাহের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হওয়া বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম প্রধান জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। প্রতিবছর এসব দুর্যোগের কারণে দেশের অর্থনীতিতে শতকোটি ডলারের ক্ষতি হয় এবং চরম বিপদে পড়েন কৃষক, জেলে ও সাধারণ মানুষ। প্রথাগত আবহাওয়া পূর্বাভাসের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে জলবায়ুঝুঁকির এই বাস্তবতায় সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা দিতে এবং জীবন-জীবিকা রক্ষায় আত্মপ্রকাশ করেছে সম্পূর্ণ বাংলা ভাষায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘আবহাওয়া’ (https://www.abohawa.com) এবং এর বিশেষ মোবাইল অ্যাপ আবহাওয়াবিদ। এটি কেবল সাধারণ কোনো আবহাওয়া অ্যাপ নয়, আবহাওয়াভিত্তিক সিদ্ধান্ত সহায়তা তথ্যব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে।
প্ল্যাটফর্মটির মূল উদ্ভাবক ও প্রধান আবহাওয়াবিদ মোস্তফা কামাল বলেন, ‘প্রান্তিক কৃষক পরিবারের সন্তান হিসেবে ছোটবেলা থেকেই আবহাওয়ার অনিশ্চয়তার প্রভাব দেখেছি আমি। আমাদের অ্যাপটির মূল উদ্দেশ্য হলো আবহাওয়ার বৈজ্ঞানিক ডেটাকে মাঠপর্যায়ের মানুষের কাছে অত্যন্ত সহজবোধ্য ও কার্যকর নির্দেশনায় রূপান্তর করা। আগামীকাল বৃষ্টি হবে—শুধু এ তথ্য দিয়েই ক্ষান্ত না হয়ে অ্যাপটি ব্যবহারকারীকে বাতলে দেয় নির্দিষ্ট পদক্ষেপ। অ্যাপ থেকে মিলবে কৃষকের জন্য পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা সেচ বন্ধ রাখা বা অতিবৃষ্টির আগেই পাকা ধান কেটে ফেলা, কিংবা জেলেদের জন্য সমুদ্রে যাওয়ার ঝুঁকি–সম্পর্কিত তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা। বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ ক্ষুদ্র কৃষক প্রতিদিন আবহাওয়াসংক্রান্ত যে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েন, এই অ্যাপ তাঁদের ডেটাভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।’
মোস্তফা কামাল বর্তমানে কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে পিএইচডি গবেষণা করছেন এবং আবহাওয়া গবেষণায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একাধিক ফেলোশিপে ভূষিত হয়েছেন। আবহাওয়াবিদ অ্যাপ তৈরির মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে মোস্তফা কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশ চরম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। প্রতিবছর প্রতিকূল আবহাওয়ায় ফসল ও সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। প্রথাগত পূর্বাভাসে সীমাবদ্ধতা থাকায় কৃষক, জেলে ও সাধারণ মানুষ সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। সেই ঘাটতি মেটাতেই আমরা সহজবোধ্য ও কার্যোপযোগী আবহাওয়া তথ্য দিতে এই প্ল্যাটফর্ম ও অ্যাপ তৈরি করেছি। আমাদের অ্যাপ ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আমরা শুধু বৃষ্টি হবে—এমন তথ্য দেই না, একই সঙ্গে কী করণীয়, তা–ও জানাই। সেচ বন্ধ রাখা বা দুর্যোগের আগে ফসল কাটার মতো নানা বিষয়ের তথ্য দেই। ৫৫০টির বেশি উপজেলার জন্য সুনির্দিষ্ট কৃষি পরামর্শ, আগাম সতর্কতা ও নাগরিক অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে এতে। বিনা মূল্যে, বিজ্ঞাপনহীন ও সাধারণ স্মার্টফোনে ব্যবহারযোগ্য এই অ্যাপ সঠিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জীবন, জীবিকা ও কোটি কোটি টাকার সম্পদ রক্ষা করবে।’
আবহাওয়াবিদ অ্যাপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো অবস্থানভিত্তিক জরুরি আবহাওয়া সতর্কতা পাঠানোর সক্ষমতা। মোস্তফা কামাল বলেন, এর মাধ্যমে কোনো নির্দিষ্ট বিভাগ, জেলা বা উপজেলার মানুষের কাছে জীবনরক্ষাকারী গুরুত্বপূর্ণ আবহাওয়া পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা তাৎক্ষণিকভাবে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। যদি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার ওপর দিয়ে একটি কালবৈশাখী ঝড় বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার দিকে অগ্রসর হওয়ার আশঙ্কা দেখা যায়, তাহলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষকে বিরক্ত না করে শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ব্যবহারকারীদের মোবাইলে তাৎক্ষণিকভাবে কালবৈশাখী ঝড়, বজ্রপাত ও সম্ভাব্য শিলাবৃষ্টির জরুরি সতর্কবার্তা পাঠানো যাবে। পরবর্তীকালে যদি পূর্বাভাসে দেখা যায় যে একই ঝড় নওগাঁ ও বগুড়া জেলার দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে শুধু ওই দুই জেলার ব্যবহারকারীদের কাছেই নতুন জরুরি সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া হবে। এভাবে ঝড়ের গতিপথ অনুযায়ী ধাপে ধাপে সতর্কবার্তা পাঠানো সম্ভব হবে, যা মানুষের মধ্যে অপ্রয়োজনীয় আতঙ্ক সৃষ্টি না করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে সময়মতো প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ দেবে। এই প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে ২০২৭ সালের কালবৈশাখী মৌসুম থেকেই বজ্রপাত, কালবৈশাখী ঝড় ও অন্যান্য আকস্মিক আবহাওয়াজনিত দুর্যোগে প্রাণহানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে।
আন্তর্জাতিক অন্য অ্যাপগুলোর তুলনায় আবহাওয়াবিদ সম্পূর্ণ আলাদা এবং বাংলাদেশকেন্দ্রিক ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ুব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে তৈরি। মোস্তফা কামাল বলেন, এটি পর্যায়ক্রমে দেশের সব উপজেলার জন্য সুনির্দিষ্ট স্থানীয় পূর্বাভাস প্রদান করবে। এর মূল বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃষিভিত্তিক পরামর্শ, পরিবেশের বায়ুদূষণ সূচক, নদী ও উপকূলীয় পূর্বাভাস এবং ঝড়-বন্যা ও বজ্রপাতের আগাম সতর্কবার্তা। সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপনমুক্ত এবং বিনা মূল্যে ব্যবহারের উপযোগী এই অ্যাপের জন্য কোনো অ্যাকাউন্ট খোলারও প্রয়োজন নেই। বিশেষ করে স্বল্প মূল্যের কম শক্তিসম্পন্ন অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনে এবং ধীরগতির ইন্টারনেটেও এটি সাবলীলভাবে কাজ করতে সক্ষম, যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আমাদের অ্যাপটিতে যুক্ত আছে সিটিজেন সায়েন্স ও মাঠ প্রতিবেদন সুবিধা, যা বাংলাদেশের প্রচলিত অন্য কোনো আবহাওয়া অ্যাপে নেই। ব্যবহারকারীদের পাঠানো তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আজ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তৈরি হয়েছে দেশের বিভিন্ন জেলার রিয়েল-টাইম আবহাওয়াচিত্র। বিশেষ ফিচারের মাধ্যমে নাগরিকেরা বজ্রপাতে হতাহত, পাহাড়ধস বা উপকূলীয় জলোচ্ছ্বাসের তথ্য ও ছবি সরাসরি শেয়ার করতে পারবেন, যা অন্য ব্যবহারকারীরাও দেখতে পাবেন। তথ্যের সত্যতা নিশ্চিতে এতে রয়েছে ভুয়া রিপোর্ট চিহ্নিত করার সুবিধা। এ ছাড়া আবহাওয়া অধিদপ্তর যেখানে শিলাবৃষ্টির তথ্য সংরক্ষণ করে না, সেখানে আগামী কালবৈশাখী মৌসুম থেকে এই অ্যাপের মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো শিলাবৃষ্টির উপাত্ত সংগৃহীত ও গবেষণায় ব্যবহৃত হবে।
অ্যাপটি নামানো যাবে এই ঠিকানার ওয়েবসাইট থেকে।